ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পারিক সম্মান ও শ্রদ্ধার জায়গায় প্রতিনিয়ত ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার উন্নতির জন্য সেন্টার স্থাপনের জন্য জোর সুপারিশ প্রদান করা হয়। যদিও কিছু প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সেবামুখী সেন্টার স্থাপিত হয়েছে কিন্তু কার্যত কতটুকু একটিভ সেটি বিবেচনার দাবি রাখে।...

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীদের অপরাধপ্রবণতায় অংশগ্রহণ এক গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে। কিশোর অপরাধের ভয়াবহতায় অভিভাবক ও সচেতন মহল অত্যন্ত উদগ্রীব। কিশোর অপরাধের চিত্র দেশের সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছুকাল আগেও গ্রামীণ সমাজে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা ততটা গুরুতর ছিল না। কিন্তু শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রামীণ সমাজেও কিশোর অপরাধের সংখ্যা ও ঘটনা বেড়েই চলছে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে যা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার ও ভয়াবহতার। আগামী দিনের রাষ্ট্র বিনির্মাণে বর্তমানের কিশোরদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সঙ্গত কারণেই কিশোরদের প্রতি সরকার ও সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। কিশোরদের অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ার নিমিত্তে অসংখ্য কারণ রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও লেখাপড়ার প্রতি অনীহা তথা অনাগ্রহতা সৃষ্টি হওয়া। অপরাধ সংঘটনের নানা ধরনের সুযোগ সমাজে বিদ্যমান থাকায় উঠতি বয়সী তরুণরা অপরাধকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে। মাদকসেবন, মাদক পাচার, মাদক বাজারজাতকরণ ইত্যাদিতে তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। সে কারণেই তরুণদের যদি সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় তাহলে তাদের মেধা ও মননে ইতিবাচক চিন্তাধারার আবির্ভাব ঘটবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি ক্রমাগত তারা দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।
পঠন-পাঠন প্রক্রিয়ায় শ্রেণিকক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়ায় পাঠদান উপভোগ্য হয়ে ওঠে। কেবলমাত্র তাই নয়, নবতর চিন্তার স্ফূরণ ও সৃজনশীল কর্মের অনুসন্ধান শ্রেণিকক্ষ থেকেই পেয়ে থাকে শিক্ষার্থীরা। সে কারণেই শ্রেণিকক্ষকে পঠন-পাঠনের অবশ্যম্ভাবী মাধ্যমে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে। এর পেছনের অন্যতম কারণ হচ্ছে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিক্ষকের সাহচর্য পায় এবং শ্রেণিকক্ষে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়কে বিভিন্নভাবে বোঝার সুযোগ পায়। ক্লাসরুমকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে শিক্ষক শিক্ষার্থী উভয়ের যথেচ্ছ ভূমিকা রয়েছে। এখানে কোনো পক্ষ যদি যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে তাহলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের যে উদ্দেশ্য তা ব্যর্থ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার অবারিত সুযোগ থাকতে হবে এবং শিক্ষকদের সেসবের উত্তর নিশ্চিতে ধৈর্য ও সামর্থ্য রাখতে হবে।
ইদানীং ক্লাসরুমে শিক্ষকের আলোচনা মনোযোগ দিয়ে না শুনে শিক্ষকের বক্তব্যকে রেকর্ড করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষকের আলোচনা খাতায় লিপিবদ্ধ না করে ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা মোবাইল ফোনে ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকে। যেসব ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০-৪০ জন সে সব ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও যেসব ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২০-এর ওপর সেখানে পুরো ক্লাসরুমে শিক্ষকের পক্ষে সবার মনোযোগ ধরে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়ে। অর্থাৎ উপযুক্ত ক্লাস পরিচালনার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
তাছাড়া অনেক শিক্ষক ক্লাস পরিচালনার সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে পাওয়ার পয়েন্ট দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করে তড়িঘড়ি কোর্স সম্পাদন করে থাকে। আবার প্রেজেন্টশনে ব্যবহৃত স্লাইডগুলো এআই জেনারেটেড হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসের প্রতি তেমন আগ্রহ থাকছে না। গুগল থেকে ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা হলে শিক্ষার্থীদের মনে ওই শিক্ষক সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়। ক্লাসরুমে মৌলিক আলোচনা উপস্থাপন করা আবশ্যিক যেখানে শিক্ষার্থীরা নোটপত্রের বাইরে উপস্থিত বুদ্ধি তথা সৃজনশীল ধারণার আলোকপাতের মাধ্যমে নতুন ধারার সূত্রপাত করবে। অর্থাৎ যা পড়ানো হচ্ছে তা যদি অনলাইন সরাসরি পাওয়া যায় তাহলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের প্রয়োজনীয়তা পর্যায়ক্রমে কমে আসবে। সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আই কন্টাক্ট না হলে শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান প্রদান করা সম্ভব নয়। পাওয়ার পয়েন্টে পাঠদানকৃত ক্লাসে ছাত্রদের সঙ্গে আই কন্টাক্ট ধরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না।
‘পড়াতে হলে পড়তে হয়’ এ বাণীর বিষয়ে সবাই অবগত থাকলেও শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের পূর্বে খুব বেশি শিক্ষক এ নিয়মটি মেনে চলেন না। একজন শিক্ষকের পাঠদানের পূর্বে প্রস্তুতি নিয়েই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করা উচিত। শুধু তাই নয় পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে কারিকুলাম আধুনিক ও নতুন করে শিক্ষার্থীদের পাঠ উপযোগী করে তুলতে হয়। এর ব্যত্যয় হলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। শুধু তাই নয়, কারিকুলামের বাইরেও সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন বিষয়ের উদ্ভাবনও শ্রেণিকক্ষে আলোচনার মধ্যে রাখতে হয়।
শিক্ষকের মূল কাজই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অন্বেষণে আগ্রহী হিসেবে তৈরি করা। সাম্প্রতিক কালে নানাবিধ কারণেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ দূরত্ব মোচনে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পারস্পারিক সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করতে না পারলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশে বিঘ্ন ঘটে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকের অনুশাসন মানার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষককে ছোট করার মানসিকতা রয়েছে অনেকের মধ্যে। এ ধরনের আচরণও পঠন-পাঠন অনুশীলনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। দুই পক্ষের সঠিক সমন্বয় ও সহযোগিতাসম্পন্ন পরিবেশ বজায় রাখা ব্যতীত শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আমরা শিক্ষার্থীদের যে কারিকুলামে পাঠদান করছি, পাঠদান পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে এর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু রয়েছে সেসব হিসাব-নিকাশ করেই শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণে মনোযোগী হয়ে ওঠে। সে কারণেই কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে কারিকুলাম প্রণয়ন করা উচিত এবং শ্রেণিকক্ষে হাতে-কলমে পাঠদানের পরিবেশ সৃষ্টি করে পঠন-পাঠনচর্চায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
অনলাইনে অতিমাত্রায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে। দিনের বেশির ভাগ সময় শিক্ষার্থীরা অনলাইনে থাকায় সুনির্দিষ্ট কারিকুলামের ভিত্তিতে পাঠ গ্রহণে তারা অপারগ হয়ে উঠছে এবং শ্রেণিকক্ষে তারা মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, অতিমাত্রায় অনলাইনে আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ দেখানো হয়েছে, ঘুম থেকে উঠেই শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইমেইল ব্যবহার করায় প্রতিনিয়ত বিপরীতধর্মী খবরের মুখোমুখি হচ্ছে। এ ধরনের সংবাদ তাদের দিনের অন্যান্য সময় সঠিকভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। কেননা সকালের একটি খারাপ খবর সারা দিন তার অন্যান্য কাজে প্রভাব বিস্তার করে। এ ছাড়া অধিক রাত জেগে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সঠিকসময়ে ক্লাসে যোগদান করতে পারছে না। এ ধরনের বিষয়ের নিয়মিত চর্চা একসময় তাকে ক্লাস বিমুখ করে তুলছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে শিক্ষকদের যেভাবে নজরদারি করা দরকার সে ব্যাপারে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের মেন্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু শিক্ষকরা নানাবিধ কারণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাসরুমের বাইরে কোনো ধরনের যোগাযোগ থেকে বিরত থাকছেন। ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পারিক সম্মান ও শ্রদ্ধার জায়গায় প্রতিনিয়ত ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের বিষয় কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ বিষয়গুলো শিক্ষাঙ্গনের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এ কারণেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার উন্নতির জন্য সেন্টার স্থাপনের জন্য জোর সুপারিশ প্রদান করা হয়। যদিও কিছু প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সেবামুখী সেন্টার স্থাপিত হয়েছে কিন্তু কার্যত কতটুকু একটিভ সেটি বিবেচনার দাবি রাখে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
.jpg)


