সুয়েজ খাল যদি মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন ঘটায় আর ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটে, তাহলে হরমুজ ইঙ্গিত দিচ্ছে, মার্কিন সাম্রাজ্যের প্রতিস্থাপন নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকবে।...

সামরিক বিস্তার যখন রাজনৈতিক কৌশল ছাড়িয়ে যায়, তখন সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। কোনো সাম্রাজ্য যদি সামরিকভাবে খুব বেশি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তারা যাদের দমন করতে চায় সেই মানুষগুলো প্রচণ্ড শক্তির বিরুদ্ধেও দীর্ঘকাল টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে ফেলে।
১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালের জাতীয়করণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য তেমনই নাজুক সন্ধিক্ষণ ছিল। সেই সংকট তখন ব্রিটেনের আর্থিক ভঙ্গুরতাকে উন্মোচিত করে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ব্রিটিশ স্টার্লিংয়ের ওপর এমন টান পড়ে, যা মুদ্রার বৈশ্বিক রিজার্ভের পতন ডেকে আনে। সাম্রাজ্যবাদীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। সত্তর বছর পর, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ঘটে চলা এখনকার ক্রমবর্ধমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠিক সেই সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই মিলটা অগভীর বা কথার কথা নয়। উভয় ক্ষেত্রেই একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা এমন একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আঞ্চলিক শক্তির (ইরান) মুখোমুখি হয়েছে, যারা নতি স্বীকার করতে নারাজ।
সত্তর বছর আগে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাজ্য যা করেছিল, এখন সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র একইভাবে তার অবস্থান ধরে রাখতে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফলাফল কেবল যুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে না, বরং গভীর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দ্বারা নির্ধারিত হতে চলেছে। ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে যখন মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন তিনি শুধু মিসরের সার্বভৌমত্বই ঘোষণা করেননি, তার কর্তৃত্বেরও জানান দিয়েছিলেন।
তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। সুয়েজ খাল কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট ছিল না; এটি ছিল ব্রিটেনের সঙ্গে তার অবশিষ্ট ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোকে সংযুক্ত করার কৌশলগত ধমনী এবং সাম্রাজ্যের মর্যাদার প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখন ফ্রান্স এবং ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে মিসর আক্রমণ করে। নিজের শক্তিতে নয়, অন্যের শক্তিতে যুদ্ধ করার কারণে সেই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
ত্রিপক্ষীয় সেই আগ্রাসনের লক্ষ্য ছিল জাতীয়করণকে পাল্টে দেওয়া, নাসেরকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা। সামরিকভাবে, অভিযানটি প্রাথমিক সাফল্য পায়। ব্রিটিশ-ফরাসি বাহিনী দ্রুত এগিয়ে যায় এবং ইসরায়েল সিনাই দখল করে। তবুও এই অর্জনগুলো রাজনৈতিক বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়। শুধু মিসরের সামরিক এবং জনগণের প্রতিরোধ নয়, যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপের ফলে এই দুই পরাশক্তি দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার সূচনা ঘটায়।
যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে কোণঠাসা করার সুযোগ নেয় এবং তাতে সফলও হয়। ওয়াশিংটন আর্থিক প্রতিশোধের হুমকি দিয়ে ব্রিটিশ পাউন্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) সংকুচিত করে ফেলে। ব্রিটেন তার আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং মুদ্রার মান ধরে রাখতে হিমশিম খেতে থাকে আর সেই চাপ ব্রিটেনের আধিপত্য চূড়ান্তভাবে খর্ব করে। ব্রিটেন অপমানিত অবস্থায় পিছু হটতে বাধ্য হয়, আক্রমণটি ভেস্তে যায় এবং নাসের রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হন।
এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে বাইরের প্রধান শক্তি হিসেবে ব্রিটিশ আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটায়। ব্রিটেনের জায়গা দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক আধিপত্যবাদীর ভূমিকা গ্রহণ করে।
সুয়েজ সংকট প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে একটি সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখা যায় না। যুদ্ধক্ষেত্রে স্পষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং কৌশলগত অতি-বিস্তার শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরাজয় ঘটাতে পারে। তখন ছিল ব্রিটেন, এখন আমেরিকা। ১৯৫৬ সালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং আজকের যুক্তরাষ্ট্র-উভয়েই আঞ্চলিক শক্তির তুলনায় সামরিক দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তবু অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণে তাদের ক্ষমতা বেশ সীমিত।
যুদ্ধ-পরবর্তী ঋণের ভারে জর্জরিত ব্রিটেন অর্থনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র এখন অনুরূপ সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং ক্রমাগত ঘাটতির কারণে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ডলারভিত্তিক দুর্বল অর্থনীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। কমছে ডলারের ওপর আস্থা। সেই সময়ের ব্রিটেনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা থাকলেও তারা বর্তমানে নিজেদের শক্তির চাইতে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, যা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, কয়েক দশকের বাহুল্য ব্যয় এবং বেশ কয়েকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর এখন একটি রণাঙ্গনে এসে ঠেকেছে, সেটা ইরান। তবু মনোযোগ এবং সম্পদ বিভাজনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণের সক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে ব্রিটেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান বুঝতে ভুল করেছিল এবং ফলাফল নির্ধারণ করার ক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল। আজকে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের সংঘাতের ফলে বদলে যাওয়া একটি দেশের (ইরান) মুখোমুখি, যেখানে রাষ্ট্র-বহির্ভূত পক্ষ, আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্কগুলো দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করার সনাতন কাঠামো নষ্ট করে দিয়েছে।
সুয়েজ সংকট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতন ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পথকে সুগম করেছিল। আইজেনহাওয়ারের ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরোধিতা করার কোনো কারণে ছিল না; বরং তা ছিল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। তিনি তার ইউরোপীয় মিত্রদের অকার্যকর করে যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলের অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ওয়াশিংটন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করে, যার মধ্যে ছিল সামরিক ঘাঁটির সম্প্রসারণ, মিত্র জোটকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে গভীরতর করা। এই লক্ষ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রীয় বহিরাগত শক্তিতে পরিণত হয়। সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা, অস্ত্র বিক্রি, তেলের ইজারা, পেট্রোডলার ব্যবস্থা এবং ধনী উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে আধিপত্য বজায় রাখাই হচ্ছে তার মূল লক্ষ্য। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সাহায্য, ক্রমবর্ধমান ঋণ সহায়তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং স্বৈরাচারী শাসনকে সমর্থনের মাধ্যমে মিসর, জর্ডান ও মরক্কোর মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের বলয়ে যুক্ত হতে বাধ্য করে।
যুক্তরাষ্ট্র আরব জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীভুক্ত দেশ–যেমন ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান এবং লিবিয়াকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে এবং অস্থিতিশীল করতে ভূমিকা রেখেছে। এতে ওই রাষ্ট্রগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বা ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেনি।
সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নিজেকে খুব একটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। নতুন আধিপত্যবাদী কাঠামোর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটে। তবে বর্তমান মুহূর্তটি আগের মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ব্রিটেনের ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, সেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করার মতো একক কোনো শক্তির উত্থান এখনো দেখা যাচ্ছে না। এর পরিবর্তে বরং দেখা যাচ্ছে উদীয়মান ব্যবস্থার মধ্যে ঐক্য নেই আর তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। হরমুজ নিয়েই এখন যত বিপদ ঘনিয়ে উঠেছে। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হয়। এতে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।
হরমুজ প্রণালিকে ইরান কতটা হুমকির মুখে ফেলতে পারবে, তা নির্ভর করছে ইরানের ক্ষমতা, বিশেষ করে তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা, কৌশল এবং রাজনৈতিক সংকল্পের ওপর।
১৯৫৬ সালে মিসর জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধজনিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে চেয়েছিল। সেই তুলনায় ইরান সমরাস্ত্রে সজ্জিত। তার অস্ত্র ভান্ডারে রয়েছে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি প্রবাহকে বিঘ্নিত করার ক্ষমতা। এই অঞ্চলটি বুঝতে পারছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র-জায়নবাদী অক্ষ’ তাদের ইচ্ছামতো যুদ্ধের মাধ্যমে এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে রেখেছে। ইরান বর্তমান সংঘাত বন্ধের সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করে নিয়েছে। তাদের ঘোষিত শর্তের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের অবসান ঘটাতে হবে। স্বীকার করতে হবে যুদ্ধের দায়। ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। বন্ধ করে দিতে হবে এই অঞ্চলে থাকা আমেরিকান ঘাঁটি। দিতে হবে ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
তারা হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য একটি নতুন কাঠামোরও দাবি জানিয়েছে, যা তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে। এর পাশাপাশি গাজা, লেবানন, ইয়েমেন এবং সিরিয়ায় যুদ্ধের অবসান ঘটানো ও যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহিসহ বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের কথা বলছে দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যে এখনো ইসরায়েলের পারমাণবিক একাধিপত্য রয়ে গেছে, গাজায় তাদের যুদ্ধ তৃতীয় বছরে পা দিচ্ছে। এই সংকটেরও অবসান চায় ইরান। ইসরায়েল বারবার সব সীমা অতিক্রম করছে এবং আন্তর্জাতিক আইন বা রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে লক্ষ্য অর্জনে প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করছে।
কৌশলগত এই সাফল্য ইরানের পুরোপুরি অর্জন করার প্রয়োজন নেই। যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করত, শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে বা তাদের চূড়ান্তভাবে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরানের যে মূল লক্ষ্য–অর্থাৎ টিকে থাকা-ইতোমধ্যে অর্জিত হয়ে গেছে। মার্কিন সীমাবদ্ধতা আসলে লক্ষ্য করার মতো। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ১৯৫৬ সালের ব্রিটেনের মতো দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি, যদিও বর্তমান পরিবেশটি আরও অনেক বেশি জটিল। সংঘাতের বিস্তার ঘটানোয় বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা বা জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করবে, জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে এবং মার্কিন মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
একই সঙ্গে লক্ষ্য অর্জন না করে উত্তেজনা প্রশমন করা হলে তা মার্কিন দমনমূলক শক্তির সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করবে। এটি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে এই সংকেত দেবে যে, ধৈর্য ও সহনশীলতা সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীকেও অকার্যকর করে দিতে পারে। এই উত্তেজনা মূলত ‘ইম্পেরিয়াল ওভারস্ট্রেচ’ বা সাম্রাজ্যবাদী অতিবিস্তারের বিরাট সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ সমর্থন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি একাধিক অঞ্চলে তার প্রতিশ্রুতিগুলো সামাল দিতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এই তিনটি বিষয়কে চাপের মুখে ফেলেছে।
মার্কিন-জায়নবাদী অক্ষ ইরানি রাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করতে চায়। অন্যদিকে ইরান চায় টিকে থাকতে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এই দ্বন্দ্বে যে পক্ষের লক্ষ্য কম বা অধিক পরিমিত তারাই জয়ী হবে। তবে একটি যুগের অবসান ঘটার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মার্কিন আধিপত্য খর্ব হলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন চর্চার সুযোগ পাবে। এটি চীন ও রাশিয়ার মতো বহিরাগত শক্তির সংশ্লিষ্টতাকেও ত্বরান্বিত করবে, যদিও তারা সরাসরি আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত না-ও হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা শক্তি হিসেবে ইরানের টিকে থাকা এবং ইরানের শক্তিশালী অবস্থান এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে। ইসরায়েলি সামরিক আধিপত্য যে অজেয় নয়, এই ধারণাটি ক্রমশ প্রশ্নের মুখে পড়বে। মার্কিন নিরাপত্তা কতটা কার্যকর তা পুনর্বিবেচনা করা হবে এবং নতুন মেরূকরণ তৈরি হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনের ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
মার্কিন আধিপত্যের দুর্বলতা মানেই ইসরায়েলের কৌশলগত গুরুত্ব সংকুচিত হওয়া। ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্য দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। যখন সেই সমর্থন আরও ব্যয়বহুল এবং বিতর্কিত হয়ে পড়বে, তখন সেই শক্তির কাঠামোগত ভিত্তি ক্ষয়ে যেতে শুরু করবে। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে দেশটির ঠিক পতন হবে না, তবে তার বর্ণবাদী কাঠামো এবং এর টিকে থাকার ব্যবস্থা ধীরে ধীর নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়বে সামরিক প্রতিরোধের ক্ষমতা, দেশটির রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো তীব্রতর হবে। এই প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিনি সংগ্রাম আবারও আঞ্চলিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাম্রাজ্যবাদী সমর্থন উঠে গেলে ঔপনিবেশিক বসতি বা স্থাপনা আর টিকে থাকে না। জায়নবাদী কাঠামোর বিলুপ্তি এখন আর ‘যদি’র প্রশ্ন নয়, বরং ‘কখন’ তা ঘটবে, সেই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। সুয়েজ খাল যদি মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন ঘটায় আর ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটে, তাহলে হরমুজ ইঙ্গিত দিচ্ছে, মার্কিন সাম্রাজ্যের প্রতিস্থাপন নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকবে। এরকম উত্থানের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের শিক্ষা বদলায় না। সাম্রাজ্যগুলো নির্দিষ্ট কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধে ধ্বংস হয় না, বরং তখনই ধ্বংস হয় যখন তারা তাদের শক্তিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হয়। সেই অর্থে, এই সংঘাতের ফলাফল হয়তো ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে।
লেখক: ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র ও বইয়ের লেখক।
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান
.jpg)
.jpg)
