বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যা শুধু চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রিক নয়; এটি পুনরাব্যবস্থাপনা, জনবলসংকট, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, বণ্টনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বাজেটের সুষ্ঠু ব্যবহার- এসব একযোগে সমাধান না হলে স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জিত হবে না।...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) অব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, হাসপাতালটির আইসিইউ অব্যবস্থাপনার কারণে ১৮ দিনে ৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক সেবা পেলে এই শিশুদের অনেকেই হয়তো এখনো পৃথিবীর আলো দেখত। এই ৫১ শিশু মারা গেছে মার্চের ১০ তারিখ-পরবর্তী ১৮ দিনে। তারা প্রত্যেকেই আইসিইউ শয্যার জন্য ‘অপেক্ষমাণ তালিকায়’ ছিল। কিন্তু কয়েক শিশুর সিরিয়াল মিলেছে মৃত্যুর পর। হতভাগ্য এই শিশুদের বেশির ভাগই রামেক হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। পরিস্থিতির অবনতি হলে চিকিৎসকরা আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু সময়মতো আইসিইউ শয্যা না পাওয়ায় শিশুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। রামেক হাসপাতালে ৬০ শয্যা থাকা সত্ত্বেও অনুমোদনের জটিলতায় এ ভয়াবহ মৃত্যুর খবর এসেছে বলে বিভন্ন সংদ মাধ্যম থেকে জেনেছি। এতে বোঝ যায় যে, এটি শুধুই অবকাঠামোর অভাব নয়, বরং এটি পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিচয়। এ অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার শুধু এবারই প্রথম নয়। ক্রমাগতভাবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এ চিত্র দীর্ঘদিন থেকে আমরা লক্ষ করে আসছি। এমনকি এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমরা লেখালেখি করেও আসছি। এ কারণে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে লেখা মানে অনেক ক্ষেত্রে সেটি চর্বিতচর্বণের মতো।
স্বাস্থ্য খাত দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হওয়া সত্ত্বেও নানা কারণে আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল অবস্থা। স্বাস্থ্য খাতের এ বেহাল পরিস্থতির উদাহরণ পাই সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে। গত ২৯ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিষয়কমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতে বর্তমানে উন্নয়নমূলক কাজে যাওয়ার মতো কোনো তহবিল নেই বলে উল্লেখ করেছেন। এমনকি জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে গজ, ব্যান্ডেজ, সিরিঞ্জ কেনার পর্যাপ্ত টাকাও নেই। এমন পরিস্থিতির খবর যদি স্বয়ং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে পাওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি প্রকৃত অর্থে আরও কত ভয়াবহ।
স্বাস্থ্য খাতে এমন নানা ধরনের দুঃসংবাদের মধ্যে আরও একটি সংবাদ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সম্প্রতি সারা দেশে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে বড় ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড চালু করেছে সরকার। যার আওতায় দেশজুড়ে ১ কোটি ৯৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে টিকা দেশে পৌঁছেছে। আর এ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে এপ্রিলে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। এ ক্ষেত্রেও সঠিক ব্যবস্থাপনা হবে কি না তা নিয়ে সংশয় ও উৎকণ্ঠা রয়েছে। কারণ স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম, অবস্থাপনার কারণে কোনোভাবেই আস্থার জায়গা তৈরি হচ্ছে না। সর্বশেষ ২০২০ সালে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালিত হলেও করোনা মহামারির কারণে ৩১ শতাংশ শিশু সঠিক সময়ে টিকা নিতে পারেনি। এ ছাড়া গত বছরও টিকা সংকট দেখা দেয়। অনেক শিশু টিকার বাইরে ছিল। এ কারণেও হাম বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগে WHO এর পরীক্ষা অনুযায়ী নমুনাগুলোর প্রায় ২৯ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া গেছে- যা একটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, বিগত প্রায় সাড়ে ৮ বছর দেশে টিকা পূর্ণ সরবরাহ হয়নি এবং এ কারণে রোগ প্রতিরোধ বরাবরের মতো কার্যকরভাবে চালানো যায়নি।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সূচকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি বিস্তার- এসবকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী টাইফয়েড টিকাদানে প্রায় ৯৭ শতাংশ শিশু কভারেজ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। তবে এ সাফল্যগুলো অবকাঠামো ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংযুক্ত না হলে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সাম্প্রতিক শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো প্রমাণ করে- সাফল্য কেবল সংখ্যা ও প্রতিবেদনে সীমিত থাকলে তা বাস্তব জীবনে প্রাণ বাঁচাতে ব্যর্থ হয়।
শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর। যুক্তরাজ্যের NHS, জাপান ও সুইডেনের কমিউনিটি ক্লিনিক মডেল দেখিয়েছে, রোগী tertiary hospital-এ পৌঁছানোর আগে চিহ্নিত ও চিকিৎসা করা হয়। টিকা ফলোআপ, শিশু পুষ্টি, risk assessment এবং timely referral বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও সেখানে দক্ষ চিকিৎসক, ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম বা প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। ফলে নিউমোনিয়া, হাম বা ডায়রিয়ার মতো সাধারণ রোগ দ্রুত জটিল হয়ে হাসপাতালে পৌঁছায়। প্রাথমিক স্তরে রোগ থামানো না গেলে মৃত্যুর সংখ্যা অবশ্যম্ভাবী।
শিশু আইসিইউ বা critical care capacity অপ্রতুল উন্নত দেশগুলো surge capacity planning অনুসরণ করে। কোভিড-১৯ পরবর্তী দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরে অতিরিক্ত আইসিইউ শয্যা, অক্সিজেন ও প্রশিক্ষিত জনবল তাৎক্ষণিক মোতায়েনের ব্যবস্থা আছে। কানাডা শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় regional pediatric intensive care network চালু করেছে, যেখানে কোন হাসপাতালে কত শয্যা খালি আছে, তা real-time দেখা যায়। বাংলাদেশেও তথ্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন সীমিত। উন্নত দেশগুলোতে disease surveillance, real-time dashboard, এবং regional outbreak response unit আছে। বাংলাদেশে সবকিছুই ধীরগতি।
স্বাস্থ্য খাতের মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। চিকিৎসা অবহেলা, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাণিজ্যিক প্রভাব, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব- সব মিলিয়ে মানুষ মনে করে হাসপাতাল মানেই নিরাপত্তা নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে আমরা যেসব অর্জন করেছি, তা সত্ত্বেও সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যেখানে রোগীর প্রায় ৫০ ভাগের বেশি চিকিৎসা সম্ভব। সে পর্যায়ে যথেষ্ট চিকিৎসক, নার্স ও জনবল নেই, ফলে রোগীরা বড় জেলা ও মেডিকেল কলেজ পর্যায়ে ভিড় করেন এবং সেখানে চাপ বাড়ে। অনেকে সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও টেকনিশিয়ানের অভাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে অনেক প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যাচ্ছে।
স্বচ্ছতা, সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ, দুর্নীতি মুক্তি এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যা শুধু চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রিক নয়; এটি পুনরাব্যবস্থাপনা, জনবলসংকট, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, বণ্টনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বাজেটের সুষ্ঠু ব্যবহার- এসব একযোগে সমাধান না হলে স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জিত হবে না।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

