পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় হচ্ছে ভোট গ্রহণ। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল (উত্তরবঙ্গ) এবং পরের দফায় ২৯ এপ্রিল (দক্ষিণবঙ্গ)। ভোটের ফল প্রকাশ হবে ৪ মে। স্বভাবতই ভোট-উত্তাপ যে একেবারে তুঙ্গে পৌঁছেছে, তা বলাই বাহুল্য। সব রাজনৈতিক দলই ময়দানে চরম ব্যস্ততায় প্রচারপর্ব এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এ পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক, এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোট একটু ভিন্নধর্মী। তৃণমূল চাইছে, পরপর তিনবার, এবারও ক্ষমতা ধরে রাখতে। বিজেপি চাইছে, এবার যেভাবেই হোক, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করতে। কারণ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০৩১-এ। সে সময় কেন্দ্রীয় বিজেপির অবস্থান ও ক্ষমতা কী অবস্থায় থাকবে তা কেউ জানে না। নেতৃত্বে নরেন্দ্র মোদিই হয়তো থাকবেন না। ফলে মোদি-ম্যাজিক বলে কিছু নাও থাকতে পারে। তাই এবারই যা করার করে নিতে হবে।...
.jpg)
পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় হচ্ছে ভোট গ্রহণ। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল (উত্তরবঙ্গ) এবং পরের দফায় ২৯ এপ্রিল (দক্ষিণবঙ্গ)। ভোটের ফল প্রকাশ হবে ৪ মে।
স্বভাবতই ভোট-উত্তাপ যে একেবারে তুঙ্গে পৌঁছেছে, তা বলাই বাহুল্য। সব রাজনৈতিক দলই ময়দানে চরম ব্যস্ততায় প্রচারপর্ব এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এ পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক, এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোট একটু ভিন্নধর্মী। তৃণমূল চাইছে, পরপর তিনবার, এবারও ক্ষমতা ধরে রাখতে। বিজেপি চাইছে, এবার যেভাবেই হোক, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করতে। কারণ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০৩১-এ। সে সময় কেন্দ্রীয় বিজেপির অবস্থান ও ক্ষমতা কী অবস্থায় থাকবে তা কেউ জানে না। নেতৃত্বে নরেন্দ্র মোদিই হয়তো থাকবেন না। ফলে মোদি-ম্যাজিক বলে কিছু নাও থাকতে পারে। তাই এবারই যা করার করে নিতে হবে। অন্যদিকে বাম এবং কংগ্রেস চাইছে, মানুষ তৃণমূল ও বিজেপি উভয়েরই দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে বিরক্ত। ফলে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার এটাই বড় সুযোগ। যে কারণে ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার লড়াই হচ্ছে আড়াআড়ি, চতুর্মুখী। সেই অর্থে কোনো সমঝোতা বা জোট এবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটে নেই। আর এখানেই ভোট ময়দানে উঠে এসেছে ভিন্নধর্মী প্রচারের বিষয়টিও। তৃণমূলের বক্তব্য- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪টি আসনে দলের মুখ একটিই- তা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থাৎ সবাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেই ভোট দিন। আর বিজেপির বক্তব্য, রাজ্যের ২৯৪টি আসনেই প্রার্থী হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। তাকে দেখেই মানুষ ভোট দিন।
প্রচারে এসে বিজেপির অন্যতম দুই শীর্ষ নেতা নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ দুটো প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। এক, তৃণমূলের আকাশছোঁয়া দুর্নীতি এবং দুই, অনুপ্রবেশ ইস্যু, এসআইআর ইত্যাদি। দুর্নীতি প্রসঙ্গে অমিত শাহর বক্তব্য, ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের নানা স্তরের দুর্নীতিবাজদের উল্টো করে ঝুলিয়ে সোজা করবে বিজেপি। এ কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রায়শই ভাষার সংযম রাখতে পারছেন না। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ‘উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটাব’ শুনে ভোটাররা মনে মনে কী ভাবছেন, তা জানা যাবে ৪ মে। ভোটের ফল প্রকাশ হলে। এ কুকথা, আক্রমণের জবাব দিতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পিছিয়ে থাকছেন না। কখনো নির্বাচন কমিশনকে ‘দালাল’ বলে সম্বোধন করছেন, কখনো আবার ক্ষমতায় এলে বিজেপির নেতা-কর্মীদের ‘আদার মতো থেঁতলানো হবে’, তাদের হাত-পা-হাড়-মাথা ভেঙে দাও, বহিরাগতদের (বিজেপি) দূর করো ইত্যাদি বলেও হুঙ্কার ছাড়ছেন।
বাঙালির নববর্ষের প্রভাতে শুভেচ্ছা আর উৎসবের আবহের মধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বেজেছে চাপানউতোরের সুর। রাজভবনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাজ্যের অতীত গৌরবের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টেনে তরুণ প্রজন্মকে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্যপাল আরএন রবি। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে পরিসংখ্যান, উঠে এল ‘হারানো অবস্থান’-এর আক্ষেপ। উল্লেখ্য, রাজ্যপাল সাংবিধানিক প্রধান। তার মুখে সরাসরি রাজনীতির কথা শুধু অবাঞ্ছিতই নয়, সাংবিধানিক শিষ্টাচারেরও বিরোধী। তার সেই মন্তব্যের পরেই পাল্টা আক্রমণে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নববর্ষের দিনেই কার্যত স্পষ্ট হয়ে গেছে, সৌজন্যের আবরণ সরিয়ে আবারও মুখোমুখি রাজভবন ও নবান্ন।
রাজ্যপালের এ বক্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের সভা থেকে পাল্টা জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সরাসরি নাম না করলেও তার নিশানায় যে রাজ্যপাল, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি রাজনৈতিক মহলের। তিনি বলেন, বাংলার লাটসাহেব, যিনি সবচেয়ে বড় বাড়িতে থাকেন, তিনি নববর্ষে শুভেচ্ছা জানানোর বদলে আমাকে আক্রমণ করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গেও রাজ্যপালের ইঙ্গিতের জবাব দিতে ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী। তার যুক্তি, বর্তমানে নির্বাচন চলায় প্রশাসনিক অনেক ক্ষমতাই নির্বাচন কমিশনের অধীনে, ফলে আইনশৃঙ্খলার দায় পুরোপুরি রাজ্যের নয়। এ বক্তব্য কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েনের সুরও স্পষ্ট। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজ্যপাল ও রাজ্য সরকারের সম্পর্ক প্রথমে সৌজন্যমূলক থাকলেও নববর্ষের এ মন্তব্য সে সমীকরণে নতুন করে ফাটল ধরাল। ২১ মার্চ রাজভবনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ যেন এখন অতীত। নতুন করে শুরু হলো সংঘাতের রাজনীতি।
তবে এই কার্ড বিলি নিয়েই আপত্তি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। ইসলামপুরের সভা থেকে তিনি নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবি করে বলেন, ভোটের মুখে এ ধরনের কর্মসূচি মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। তার প্রশ্ন, নির্বাচন ঘোষণার আগে কেন এ উদ্যোগ নেওয়া হলো না। রাজ্যের মাটিতে রাজনৈতিক উত্তেজনার আরেক ছবি দেখা গেছে হাওড়ার বালিতে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর রোড শো ঘিরে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে বচসা বেঁধে যায়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ঘিরে শুরু হওয়া সেই উত্তেজনা পরে তীব্র আকার নেয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছে।
নির্বাচনি উত্তাপের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি তল্লাশি প্রসঙ্গও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে কেন্দ্রীয় বাহিনী তার গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির চেষ্টা করে। যদিও নির্বাচন কমিশনের তরফে এমন ঘটনার স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি বলে জানানো হয়েছে। তবু এ অভিযোগ ঘিরে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে; আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর থাকা অবস্থায় এমন ঘটনা ঘটল কীভাবে?
কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, ইসিএল-এর খনি থেকে চুরি হওয়া কয়লার কোটি কোটি টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে পৌঁছেছে আইপ্যাক-ঘনিষ্ঠ সংস্থায়। আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এ অর্থ লেনদেনের নেপথ্যে রয়েছে সেই একই চক্র, যারা দিল্লির আবগারি দুর্নীতির টাকা পাচারেও অভিযুক্ত। আদালতে ইডি জানিয়েছে, আইপ্যাকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংশ্লিষ্ট সংস্থার ৩০ শতাংশের অংশীদার। অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন (পিএমএলএ)-এর অধীনে একটি মামলায় তিনি তদন্তাধীন রয়েছেন। দিল্লি পুলিশের দায়ের করা একটি এফআইআর থেকে এ মামলার সূত্রপাত।
বাংলার হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে বড়সড় ধাক্কা খেল শাসক দলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক। সোমবার রাতে দিল্লি থেকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) গ্রেপ্তার করল সংস্থার অন্যতম পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা বিনেশকে চান্দেলকে। কয়লা পাচার কাণ্ডের তদন্তে আর্থিক তছরুপের অভিযোগে তাকে হেফাজতে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। ভোটের মুখে এ গ্রেপ্তারি ঘিরে শোরগোল পড়ে গেছে রাজনৈতিক মহলে। দিল্লিতে ‘বেআইনি আর্থিক লেনদেন প্রতিরোধ আইন’ (পিএমএলএ)-এ চান্দেলকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ২ এপ্রিল ইডি দিল্লিতে চান্দেলের বাসভবন ছাড়াও বেঙ্গালুরুতে আই-প্যাকের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ঋষি রাজ সিংহের এবং মুম্বাইয়ে আম আদমি পার্টির (এএপি) প্রাক্তন যোগাযোগ দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজয় নায়ারের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। সে তদন্তের সূত্র ধরেই এ গ্রেপ্তারি। ইডি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, আসানসোল ও তৎসংলগ্ন খনি এলাকা থেকে হওয়া কয়লা পাচারের কোটি কোটি টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে আইপ্যাকের নিবন্ধিত সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান পিএসি কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড’-এ পৌঁছেছে। প্রায় ২০ কোটি টাকার এ লেনদেনের নেপথ্যে দিল্লির আবগারি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত এক হাওয়ালা অপারেটরের নামও উঠে এসেছে। ইডি সূত্রে আরও দাবি, কয়লা পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ওই ‘হাওলা’ অপারেটর আই-প্যাকের নিবন্ধিত সংস্থা ইন্ডিয়ান পিএসি কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেডে কয়েক কোটি টাকার বেআইনি লেনদেন সহজতর করেছিল। গত ২ এপ্রিল দিল্লি, বেঙ্গালুরু ও মুম্বাইয়ের একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়। ইডির তরফে দাবি করা হয়েছে, ভিনেশের বাড়িতে তল্লাশির পরও তাদের তদন্ত প্রক্রিয়া চলছিল। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। সে তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই এ গ্রেপ্তারি বলে দাবি কেন্দ্রীয় এজেন্সির। ইডি সূত্রে খবর, আইপ্যাকের অন্যতম ডিরেক্টরের উত্তরে সন্তুষ্ট না হওয়ার কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার রাতে বিনেশকে পিএমএলএ আইনে গ্রেপ্তার করা হয়।
উল্লেখ্য, করলা পাচার মামলায় ইডির এ তদন্তের সূত্রপাত ২০২০ সালের নভেম্বরে সিবিআইয়ের করা একটি এফআইআর। যেখানে পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল-সংলগ্ন বুনস্তোরিয়া ও কাজোড়া এলাকায় ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ইসিএল)-এর খনি থেকে কয়েক কোটি টাকার কয়লা চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই সময় ইসিএলের বেশ কয়েকজন প্রাক্তন কর্তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। ইডির দাবি, এ কয়লা পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত এক হাওয়ালা অপারেটর আইপ্যাক ‘ঘনিষ্ঠ’ সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান পিএসি কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড’-এ কয়েক কোটি টাকার লেনদেন করেছিলেন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, পাচার হওয়া কয়লার প্রায় ২০ কোটি টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে আইপ্যাকের কাছে পৌঁছেছিল। ইডি সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, যে সংস্থার মাধ্যমে এ অর্থ লেনদেন হয়েছিল, সে সংস্থা দিল্লির বহুল আলোচিত আবগারি দুর্নীতির টাকা পাচারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক
.jpg)


