হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষক শিক্ষাদান করেন তারা প্রায় সবাই নির্ভর করেন নোট ও গাইডের ওপর। কারণ, অনেকের সে ধরনের পড়াশোনা নেই যার দ্বার তারা শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী পাঠদান করতে পারেন। নোট-গাইড যারা লেখেন তারা দেখেশুনে এবং সাধারণ শিক্ষকদের চাইতে একটু জানাশোনা শিক্ষক এবং মেধাবী শিক্ষার্থীরাও জড়িত। নোট-গাইড আর কোচিং একেবারেই খোলামেলা বিষয়। সব ধরনের শিক্ষার্থী ও অভিভাবক নোট-গাইড আর কোচিংয়ের সুবিধা নেয়। কিন্তু কথা বলার সময় সবাই এমনভাবে বলেন যে, এ দুটা মহাঅপরাধ, মহাপাপ।...
১৭ এপ্রিল (২০২৬) দিনাজপুর অঞ্চলের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘ধরুন আমি কোচিং সেন্টার বন্ধ করার আইন করে দিলাম। কিন্তু আপনারা যদি ঠিক করে না পড়ান তখন? তখন তো অভিভাবকরা আমাকে ধরবে। আপনারাই পারেন কোচিং বন্ধ করতে। আপনারা পড়ানোর মান বাড়ান।’ এই কয়টি বাক্যের মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে, যেগুলো অত্যন্ত বাস্তব! অনেকে মনে করেন সরকার আইন করে দিলেই দেশের কোচিং ও নোট-গাইড বন্ধ হয়ে যাবে। কিছু শিক্ষাবিদ শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথম কথাই বলেন কোচিং আর নোট-গাইড বন্ধ করা নিয়ে। তাদের উত্তরও মন্ত্রী মহোদয় দিয়ে দিয়েছেন। আমি যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে এসেছি (ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ) সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তথাকথিত নোট-গাইড না পড়লেও এবং কোচিং না করলেও তারা সেরা ফল করেছে এবং করবে। কিন্তু আমি তার পরও কোনোদিন এভাবে বলিনি যে, নোট-গাইড বন্ধ করে দিলেই শিক্ষার মান আকাশে উঠে যাবে।
শিক্ষার্থীরা বাজারের নোট ও গাইড বই পড়ে কেন? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন-চার দিন আগে এক আত্মীয়ের বাসায় যাই, তার মেধাবী সন্তান চিন্তিত যে, ইংরেজি ভার্সনের রসায়নের গাইড বই তখনো বাজারে পাওয়া যাচ্ছিল না, বাংলা ভার্সনেরটা পাওয়া যাচ্ছে। কথায় কথায় প্রশ্ন এল গাইড কেন পড়তে হবে, তারা তো ব্রিলিয়্যান্ট শিক্ষার্থী। উত্তর হলো- ওরা তো শুধু গাইড বই পড়ে না, কয়েক ধরনের বই পড়ে, নিজের মতো করে লেখে। গাইড থেকে ধারণা নেয়। আমি বললাম, তা তো ক্লাসের পড়ার মাধ্যমেই নিতে পারে। বলল, ক্লাসে সেভাবে সব কাভার করা যায় না এবং সঙ্গে আরেকটি কথা বলল যে, এখন সে ধরনের শিক্ষকও নেই। যাচাই-বাছাই করে শিক্ষক নেওয়া হয় ছেলেটি যেখানে পড়ে, তার পরও মেধাবীদের পড়ানোর মতো শিক্ষক সবাই নয়। কাজেই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের বই থেকে বিশেষত বাজারের গাইড থেকে অনেক কিছু পড়তে হয়। মন্ত্রী মহোদয় শিক্ষকদের যে উপদেশটি দিলেন তার প্রতিফলন কিন্তু অভিভাবকের কথায় পেয়ে গেলাম। এটি একটি খোলামেলা বিষয়। শিক্ষার উপাদান শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উৎস থেকে গ্রহণ করতে পারে কিন্তু প্রশ্ন করার সময় এমনভাবে প্রশ্ন করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয়ের মূল ধারণাগুলো অর্জন করেছে কি না তা যাচাই করা যায় কিন্তু সেই বিষয়টিই আমাদের শিক্ষায় ঘটে না।
একটি ক্লাসে সাধারণত ৬০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী যেখানে একজন শিক্ষক ইচ্ছে করলেও সব শিক্ষার্থীকে মূল ধারণা দিতে পারেন না, সবার খাতা চেক করতে পারেন না, সবাইকে শ্রেণিকাজে সমানভাবে অংশগ্রহণ করাতে পারেন না। এসব শিক্ষার্থীকে নোট ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষক শিক্ষাদান করেন তারা প্রায় সবাই নির্ভর করেন নোট ও গাইডের ওপর। কারণ, অনেকের সে ধরনের পড়াশোনা নেই যার দ্বার তারা শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী পাঠদান করতে পারেন। নোট-গাইড যারা লেখেন তারা দেখেশুনে এবং সাধারণ শিক্ষকদের চাইতে একটু জানাশোনা শিক্ষক এবং মেধাবী শিক্ষার্থীরাও জড়িত। দেশে নন-এমপিও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর শিক্ষকরা কোনো ধরনের বেতন পান না, তারা কোনো সাইড ব্যবসা কিংবা প্রাইভেট টিউশন করে সংসার নির্বাহ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ ও পরীক্ষামুখী উপকরণ অনেক কাঙ্ক্ষিত এবং উপকারী। তারা সহজে পাস করার পথ খোঁজেন। মেইনস্ট্রিম বা নিয়মিত টিচিং লার্নিং সিচুয়েশনের সঙ্গে তাদের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। তারা এই নোট ও গাইড দিয়েই পরীক্ষা দেন কারণ সেখানে সংক্ষিপ্ত ও সহজ সমাধান দেওয়া থাকে। এগুলো সমাজের রূঢ় বাস্তবতা।
বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের সাহায্যকারী বই যা আমরা নোট ও গাইড বই হিসেবেই চিনি ও জানি সেগুলো কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মার্কেটের মধ্যদিয়ে যায়। ফলে, কে কত ভালো কাগজ, কে কত নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারে কোন একটি বিষয়, কে কত তাড়াতাড়ি এবং কে কত শিক্ষার্থীবান্ধব করতে পারে, সে প্রতিযোগিতা একে অপরের মধ্যে থাকে। ফলে, অনেকটাই ভালোমানের বই বিশেষ করে একটু উন্নতমানের পাবলিকেশন্স থেকে পাওয়া যায়। আমাদের মূল বই কিন্তু কোনো প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে যায় না। ফলে, প্রতি বছর প্রচুর ভুল, নিম্নমানের কাগজ, এলোমেলো পৃষ্ঠা ইত্যাদিসহ বই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায়। এগুলো শিক্ষার্থীবান্ধব হয় না।
নোট-গাইড আর কোচিং একেবারেই খোলামেলা বিষয়। সব ধরনের শিক্ষার্থী ও অভিভাবক নোট-গাইড আর কোচিংয়ের সুবিধা নেয়। কিন্তু কথা বলার সময় সবাই এমনভাবে বলেন যে, এ দুটা মহাঅপরাধ, মহাপাপ। দেশের সব শিক্ষিত, তথাকথিত উচ্চশিক্ষিতরাই দেশের সব কি পয়েন্টে বসে আছেন আর তারাই দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পুরোপুরি সরিয়েছেন। দেশের জনগণের পবিত্র আমানত! এদের মধ্যে অনেকেই বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তথাকথিত উচ্চতর গ্রেড নিয়ে বের হওয়া মেধাবী শিক্ষাক্ষী ছিলেন। তাদের মধ্যে যারাই রাষ্ট্রীয় যে যে দায়িত্বে আছেন সবাই ঘুষ সংস্কৃতি চমৎকারভাবে টিকিয়ে রেখেছেন। দেশ থেকে এসব চিরতরে দূর করা দরকার। এগুলো নিয়ে খুব একটা কথা শুনি না অথচ নোট-গাইড, কোচিং আর শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো নিয়ে সব তোলপাড়! মনে হয়, দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা এগুলো। এগুলো থেকে উদ্ধার হলেই দেশ যেন উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছে যাবে। এগুলো সমাজের বাস্তবতা। বিশ্বের অনেক দেশে উচ্চশিক্ষারত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে কিছু উপার্জন করে, তা দিয়ে তারা পড়াশোনার খরচ চালায়। আমাদের দেশে কোচিংয়ের সঙ্গে এ ধরনের লাখ লাখ শিক্ষার্থী জড়িত, যারা অতিরিক্ত কিছু উপার্জন করে অভিভাবকদের কাছ থেকে খরচ নেন না, বরং তাদের আরও দেন।
যে দেশে শিক্ষার্থীরা মোটে পড়তে চায় না, ক্লাসে আসতে চায় না, কিছু জেনে পরীক্ষায় বসতে চায় না, সবকিছুতে চায় অটো-পাস, অটো-প্রমোশন আর অটোজানা। সেখানে আমরা প্রতিযোগিতা শব্দটি বাদ দিতে চাই! এ যেন নাচনে বুড়ির কানে ঢোলের বারি দেওয়া! আমি যখন কর্তাব্যক্তিদের প্রশ্ন করলাম যে, প্রতিযোগিতা থাকবে না তাহলে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় কীভাবে ভর্তি হবে। তাদের কোনো উত্তর ছিল না। শুধু বলেছিল তখন দেখা যাবে। তার অর্থ তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল না। তাদের গ্রেডিং ছিল খুব ভালো, ভালো, মধ্যম আর উন্নতি প্রয়োজন ইত্যাদি শব্দ দ্বারা একাডেমিক ফল প্রকাশ করার নিয়ম ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশ ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থায় যদি দিনরাত কোচিং থাকে তার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান আহরণ করা বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে এবং একটি সুস্থ প্রতিযোগিতাও প্রয়োজন। যে খেলায় কোনো প্রতিযোগিতা নেই, তা কোনো খেলা নয়, সে খেলা কেউ খেলতে চায় না। আমাদের লেখাপড়া একটি বড় খেলা, এর চেয়ে বড় কোনো খেলা নেই। সে খেলায় আমরা প্রতিযোগিতা বাদ দেওয়ার সব আয়োজন করেছিলাম, এখন থেকে থেকে বলা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা শুধু আনন্দের মাধ্যমে শিখবে, সেখানে থাকবে না কোনো প্রতিযোগিতা। খেলাধুলায় প্রতিযোগিতা আছে, পরিশ্রম আছে এবং আনন্দও আছে। প্রতিযোগিতা না থাকলে যে আনন্দ থাকবে না তা নয়। কিন্তু আমরা কেনো জানি, একটি ভুল ব্যাখ্যা এবং ভুল ধারণায় বন্দি হয়ে যেতে চাই।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

