রাজনীতি যেন শিক্ষার সহায়ক না হয়ে শিক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার- প্রতিটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ছাত্রসমাজ সামনের সারিতে ছিল। ছাত্ররাজনীতি একসময় ছিল নেতৃত্ব গড়ার পাঠশালা, সমাজ পরিবর্তনের শক্তি এবং জাতীয় চেতনার অন্যতম উৎস।...
একটি সুস্থ ছাত্ররাজনীতি সমাজকে দেয় সচেতন নাগরিক, যুক্তিনিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। কিন্তু অসুস্থ ছাত্ররাজনীতি জন্ম দেয় ভয়, বিভাজন এবং অস্থিরতা। গত ২১ এপ্রিল দেয়ালে গুপ্ত লেখাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েক দফা সংঘর্ষের পর সারা দেশে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যেই রাজধানীর শাহবাগসহ দেশের তিন স্থানে এই দুই ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সংঘর্ষ, হুমকি, দখল, সন্ত্রাস এবং সহিংসতার সংবাদ শিরোনাম হয়, তখন সেখানে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ স্বাভাবিক থাকতে পারে না। গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, দেশে একটি সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতির বিকাশ ঘটবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখেছি ছাত্ররাজনীতি চর্চার নামে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ধরনের মবের রাজত্ব। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর নতুন একটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তারপর থেকেই রাজনীতির চিত্র কিছুটা পাল্টাতে শুরু করেছে। তবে সেটি আধিপত্যবাদের চিত্র। আমরা বিগত তিন দশক ধরেই ছাত্ররাজনীতিতে আধিপত্য চর্চা, লড়াই, বড়াই এসব দেখে চলেছি। নতুন করে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে যে ধরনের প্রত্যাশা সবার মনে ছিল, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের ভ্রম।
দুঃখজনকভাবে বর্তমান বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির চিত্র কোনোভাবেই আদর্শভিত্তিক নয়। বরং এটিকে বলা যায় ক্ষমতাকেন্দ্রিক। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোই বীরে পরিণত হয়ে যায়। আর ক্ষমতা থেকে চলে গেলে ইঁদুরের গর্তেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। এটাই হলো চিত্র।
বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘাত, পাল্টাপাল্টি মিছিল, উত্তেজনা এবং শক্তির প্রদর্শন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও শিক্ষাঙ্গন যেন রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যেতে ভয় পাচ্ছে, অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন, শিক্ষকরা অস্বস্তিতে, আর প্রশাসন অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, রাজনীতি যেন শিক্ষার সহায়ক না হয়ে শিক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে উল্লেখ না করলেই নয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার- প্রতিটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ছাত্রসমাজ সামনের সারিতে ছিল। ছাত্ররাজনীতি একসময় ছিল নেতৃত্ব গড়ার পাঠশালা, সমাজ পরিবর্তনের শক্তি এবং জাতীয় চেতনার অন্যতম উৎস। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চিন্তার কেন্দ্র, আর ছাত্রসমাজ ছিল সেই চিন্তার চালিকাশক্তি। কিন্তু আজ বাস্তবতা ভিন্ন। প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান ছাত্ররাজনীতি কি সেই ঐতিহ্য বহন করছে, নাকি তা পরিণত হয়েছে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, দলীয় আধিপত্য এবং শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতার কেন্দ্রে? ছাত্ররাজনীতি কি দেশকে স্থিতিশীল করছে, নাকি রাষ্ট্রের ভেতরেই নতুন অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে?
ছাত্ররাজনীতি কেবল দলীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি জাতীয় চেতনা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অধিকার আদায় এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির শক্তিশালী ভিত্তি। অনেকে মনে করেন উন্নত দেশগুলোতে ছাত্ররাজনীতি নেই। এটি ভুল ধারণা। বরং সেখানে ছাত্ররাজনীতি আছে, তবে তার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা।
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র ইউনিয়ন অত্যন্ত শক্তিশালী। যেমন- ‘ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ট স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ কিংবা ‘ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’-এ শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, বৈষম্যবিরোধী নীতি এবং একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে আন্দোলন করে। কিন্তু সেখানে হল দখল, অস্ত্রের মহড়া বা দলীয় সহিংসতা সাধারণ বিষয় নয়।
স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এ বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন বহুবার জাতীয় নীতিতে প্রভাব ফেলেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, জলবায়ু আন্দোলন- সবখানেই ছাত্রদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু এসব আন্দোলন মূলত ইস্যুভিত্তিক; দলীয় পেশিশক্তির নয়। জার্মানিতে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অংশ। শিক্ষার্থীরা নীতিনির্ধারণে অংশ নেয়, কিন্তু ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সন্ত্রাস নেই। সেখানে মতবিরোধ আছে, কিন্তু সহিংস আধিপত্য নেই। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্কে ছাত্ররাজনীতি মূলত কল্যাণনীতি, শিক্ষার মান, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে। রাজনীতি সেখানে ক্যারিয়ার ধ্বংসের কারণ নয়; বরং নাগরিক দায়িত্ববোধের অংশ।
আজ আমাদের দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি যেন মূল রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারিত শাখা। কেন্দ্রীয় রাজনীতির উত্তাপ সরাসরি ক্যাম্পাসে নেমে আসে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বার্থের চেয়ে বড় দলের কৌশলের অংশ হয়ে যায়। সম্প্রতি ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের দ্বন্দ্ব, সংগঠনভিত্তিক বিভাজন, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে মিছিল, পাল্টা অবস্থান এবং শক্তি প্রদর্শন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। অনেক শিক্ষার্থী আশঙ্কা করছে, আবারও সেশন জট তৈরি হবে, ক্লাস বন্ধ হবে, পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে। অভিভাবকরা ভাবছেন, সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঝুঁকিতে প্রবেশ করছে?
এই প্রশ্ন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা সমাধান নয়; বরং তাকে সুস্থ, নীতিনিষ্ঠ এবং শিক্ষাবান্ধব করতে হবে। প্রথমত, ছাত্রসংগঠনগুলোকে দলীয় সন্ত্রাসের হাতিয়ার নয়, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিরপেক্ষ, দৃঢ় এবং জবাবদিহিমূলক হতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করতে হবে যাতে প্রতিনিধিত্ব বৈধ ও গণতান্ত্রিক হয়। চতুর্থত, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে একাডেমিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ষষ্ঠত, জাতীয় রাজনীতির অন্ধ প্রভাব থেকে ক্যাম্পাসকে মুক্ত রাখতে হবে।
ছাত্ররাজনীতি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে, যদি তা আদর্শ, জবাবদিহি, যুক্তিবাদ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ভিত্তিতে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি তা কেবল ক্ষমতার দখলদারত্ব, সহিংসতা এবং ভয়ের সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়, তবে সেটি জাতির জন্য আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটিকে নেতৃত্বের পাঠশালা হিসেবে ফিরিয়ে আনা যাবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ শিক্ষাঙ্গন যদি অস্থির হয়, তবে রাষ্ট্র কখনোই স্থিতিশীল হতে পারে না। আর বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভয়ের জায়গা হয়ে যায়, তবে গণতন্ত্রও নিরাপদ থাকে না।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
