যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর থেকে ফিরে আসার পর যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে–এমন আশঙ্কা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইরান ক্রমাগত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামরিক শক্তির বাইরেও তাদের হাতে শক্তিশালী আরও অনেক অস্ত্র রয়েছে।...

হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক যুদ্ধের সফল অবরোধে উৎসাহিত হয়ে ইরান এখন বৈশ্বিকভাবে গড়ে ওঠা সাবমেরিন কেবলের দিকে নজর দিয়েছে। এই কেবল দিয়েই ইউরোপ, এশিয়া ও পারস্য অঞ্চলের ইন্টারনেটব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
ইরান এখন হরমুজ প্রণালির তলদেশে স্থাপিত সাবমেরিন কেবল ব্যবহারের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ফি আদায় করতে চায়। ইরান প্রচ্ছন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে, কোম্পানিগুলো অর্থ প্রদান না করলে ইন্টারনেট ট্রাফিকব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে। তেহরানের আইনপ্রণেতারা গত সপ্তাহে এ রকম একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত সাবমেরিন কেবলগুলো।
‘আমরা ইন্টারনেট কেবলের ওপর ফি আরোপ করব,’ গত সপ্তাহে এক্স হ্যান্ডেলে (টুইটার) এই ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, রাজস্ব আদায়ের এই পরিকল্পনার আওতায় গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা এবং আমাজনের মতো কোম্পানিগুলোকে ইরানি আইন মেনে ফি দিতে হবে। পাশাপাশি সাবমেরিন কেবল কোম্পানিগুলোকে কেবল নিয়ে যাওয়ার জন্য দিতে হবে লাইসেন্স ফি। তবে এর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একচ্ছত্র অধিকার থাকবে ইরানের।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রযুক্তি জায়ান্টরা ইরানকে কোনো অর্থ দিতে পারে না। ফলে ইরান কীভাবে এই কোম্পানিগুলোকে নিয়ম মানতে বাধ্য করবে, তা-ও স্পষ্ট নয়। এ কারণে কোম্পানিগুলো ইরানের এই বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে একধরনের রাজনৈতিক আস্ফালন হিসেবে দেখতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইরানের দিক থেকে হুমকি আসছে। এই হুমকি বৈশ্বিক ডেটা স্থানান্তরের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসার ওপর আঘাত হানতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগকে ব্যাহত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর থেকে ফিরে আসার পর যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে–এমন আশঙ্কা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইরান ক্রমাগত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামরিক শক্তির বাইরেও তাদের হাতে শক্তিশালী আরও অনেক অস্ত্র রয়েছে। এই কেবল-যুদ্ধ এখন জ্বালানি রপ্তানির সমস্যা ছাড়াও হরমুজ প্রণালির গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসছে। তেহরান আসলে তার ভৌগোলিক সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চাইছে।
সাবমেরিন কেবল হচ্ছে বৈশ্বিক সংযোগের মেরুদণ্ড। এই কেবল পৃথিবীজুড়ে বিশ্বের সিংহভাগ ইন্টারনেট এবং ডেটা বহন করে। এই ব্যবস্থায় আঘাত হানলে তা শুধু ইন্টারনেটের গতিকেই প্রভাবিত করবে না, বরং ব্যাংকিংব্যবস্থা, সামরিক যোগাযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অবকাঠামো থেকে শুরু করে দূরবর্তী যোগাযোগ, অনলাইন গেমিং এবং স্ট্রিমিং পরিষেবা–সবকিছু হুমকির মুখে পড়বে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফানডিয়ারি বলেছেন, ইরানের এই হুমকি যুদ্ধে তাদের টিকে থাকার কৌশলের অংশ। তিনি বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এমনভাবে চেপে বসা, যাতে কেউ আর ইরানকে আক্রমণ করার সাহস না পায়।’
ডিজিটাল বিপর্যয়
বেশ কয়েকটি বড় আন্তর্মহাদেশীয় সাবমেরিন কেবল হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক হাবতুর রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র গবেষক মোস্তফা আহমেদ বলেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক অপারেটররা ইচ্ছা করেই ইরানের জলসীমা এড়িয়ে চলছে। তবে টেলিকম গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিয়োগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মলডিন জানিয়েছেন, এই কেবলগুলোর মধ্যে দুটি–ফ্যালকন এবং গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে।
ইরান সরাসরি কেবলগুলো কেটে ফেলার কথা বলেনি। তবে ইরানি কর্মকর্তা, আইনপ্রণেতা এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের সহযোগীদের শাস্তি দেওয়ার কথা বারবার বলা হচ্ছে। প্রতিবেশীদের আক্রমণ করার এ হচ্ছে ইরানি সরকারের সর্বশেষ উদ্ভাবিত যুদ্ধকৌশল।
আহমেদ বলেন, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের যুদ্ধে নিযুক্ত ডুবুরি, ছোট সাবমেরিন এবং পানির নিচের ড্রোনগুলো পানির নিচের কেবলগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। আহমেদ আরও বলেন, সাবমেরিন কেবলের ওপর যেকোনো আক্রমণ বেশ কয়েকটি মহাদেশজুড়ে ‘ডিজিটাল বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে।
এতে ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ইন্টারনেট সংযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে, যা তাদের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস রপ্তানির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে ভারতের ইন্টারনেট ট্রাফিকের একটি বড় অংশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। এতে ভারতের বিশাল আউটসোর্সিং শিল্প শতকোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়বে বলে জানান আহমেদ।
আহমেদ আরও বলেন, এই প্রণালিটি সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ান ডেটা হাব এবং ইউরোপের কিছু কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের মধ্যে প্রধান ডিজিটাল করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ইরান বাধা দিলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে আর্থিক লেনদেন এবং আন্তসীমান্ত লেনদেন শ্লথ হয়ে পড়তে পারে। আবার পূর্ব আফ্রিকার কিছু অংশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের আশঙ্কা রয়েছে। যদি ইরানের প্রক্সি বা মিত্ররা লোহিত সাগরে একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে, তাহলে ক্ষতি আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সাবমেরিন কেবলযুদ্ধ নতুন কিছু নয়
১৮৫৮ সালে সমুদ্র তলদেশের কেবলের মাধ্যমে প্রথম আটলান্টিকের ওপারে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল। ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়া সেই টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস বুকাননের কাছে। টেলিগ্রামটি ৯৮ শব্দের একটি অভিনন্দন বার্তা বহন করেছিল। বার্তাটি পৌঁছাতে সময় লেগেছিল ১৬ ঘণ্টারও বেশি। এরপর সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে কেবল ব্যবহারের গুরুত্ব জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল কেবল প্রটেকশন কমিটির মতে, বর্তমানে আধুনিক সাবমেরিন কেবলের একটিমাত্র অপটিক্যাল ফাইবার আলোর গতিতে একসঙ্গে প্রায় ১৫ কোটি ফোন কলের সমপরিমাণ ডেটা বহন করতে পারে।
পানির নিচের যোগাযোগ কেবল বিঘ্নিত করার ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো। এটা শুরু হয়েছিল ১৮৫০ সালে ইংলিশ চ্যানেলে প্রথম টেলিগ্রাফ কেবল স্থাপনের মাধ্যমে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে ব্রিটেন জার্মানির প্রধান টেলিগ্রাফ কেবলগুলো কেটে দেয়। ফলে জার্মান বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আধুনিক কেবলের ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি হয় না। কারণ অপারেটররা দ্রুত অন্য বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগব্যবস্থাকে সচল করতে পারেন। তবু এই কেবলগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের ডেটা প্রবাহের পুরোপুরি নির্ভরশীলতার কারণে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হলে তার পরিণতি টেলিগ্রাফ যুগের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।
সুয়েজ খালের অনুকরণ
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের জলসীমা অতিক্রম করা কেবলের জন্য ফি নেওয়ার এই প্রস্তাবকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করছে। এ জন্য তারা ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনের কথা উল্লেখ করে বলছে, সাবমেরিন কেবল পরিচালনা করার বিধান তাতে রয়েছে। কনভেনশনের ৭৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের ভূখণ্ড বা আঞ্চলিক সমুদ্রে প্রবেশ করা কেবল বা পাইপলাইনের জন্য শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো উদাহরণ হিসেবে মিসরের দিকে ইঙ্গিত করছে। কায়রো সুয়েজ খালের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপ ও এশিয়াকে সংযুক্ত করার বহু কেবল স্থাপন করতে দিয়েছে, যা থেকে ট্রানজিট এবং লাইসেন্স ফি বাবদ প্রতিবছর দেশটি শতকোটি ডলার আয় করে।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, সুয়েজ খাল হলো একটি কৃত্রিম জলপথ, যা মিসরের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে খনন করা হয়েছে। পক্ষান্তরে হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক প্রণালি, যা ভিন্ন আইনে পরিচালিত হয়।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইরিনি পাপানিকোলপুলু সিএনএনকে বলেন, ‘কেবল স্থাপনের সময় যে আইন করা হয়েছিল, ইরানকে অবশ্যই সেই চুক্তি মেনে চলতে হবে। তবে নতুন কেবলগুলোর ক্ষেত্রে ইরানসহ যেকোনো রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কোন শর্তে তার আঞ্চলিক সমুদ্রে তারা কেবল স্থাপন করতে দেবে, সেটা নির্ধারণ করার এখতিয়ার ইরানের রয়েছে।’
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের এসফানডিয়ারি বলেন, ইরান ‘তাত্ত্বিকভাবে জানত’ যে এই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে তারা এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে এর প্রভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা নিয়ে নিশ্চিত ছিল না। এখন তেহরান সেটা আবিষ্কার করেছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
লেখক: সিএনএন-এর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।
সিএনএন থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান
.jpg)


