আমার খুব খারাপ লাগে যখন দেখি কোনো বাড়িওয়ালা ইঞ্জিনিয়ারদের থেকে অদক্ষ শ্রমিককে বেশি বিশ্বাস করে। আপনি যার কনসাল্ট নিচ্ছেন সে যদি সত্যিকারের পক্ষে শিক্ষিত না হয়, এক্সপার্ট না হয়, তাহলে অনেক কিছুই হতে পারে। হতে পারে আপনার অবকাঠামোটি আন্ডার ওয়েট কিংবা ওভার ওয়েট, যা মোটেও কাম্য নয়। ধরুন আপনি কোনো ভালো ডাক্তারের কাছে গেছেন, ডাক্তার প্রথমেই আপনার ওজন নেবে এবং হাইট পরিমাপ করবে; যাতে রোগীর বিএমআই বা বডি ম্যাস ইনডেক্স পরীক্ষা করে নিতে পারেন। রোগীর বিএম আই যদি ১৯ থেকে ২৫-এর মধ্যে হয় তাহলে আদর্শ স্বাস্থ্যের অধিকারী হবেন; অন্যদিকে বিএমআই ১৯-এর নিচে হলে আন্ডার ওয়েট এবং ২৫-এর ওপরে হলে ওভার ওয়েট, যা খারাপ স্বাস্থ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। মানব শরীর যেমন অবকাঠামোর শরীরও তেমন। একটু অন্যরকম শোনা গেলেও, বিবেচনা করলে মানব শরীরের সঙ্গে অবকাঠামো বা ভবনের শরীরের যথেষ্ট সাদৃশ্যতা দেখা যায়। মানুষের সক্ষমতা মূলত নির্ভর করে তার স্কালটন ফ্রেমের ওপর, অন্যদিকে কোনো অবকাঠামোর সক্ষমতা নির্ভর করে তার স্ট্রাইকারের অ্যানালাইসিসের ওপরে; যা একজন স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ার ডিজাইনের মাধ্যমে সেটি সম্পন্ন করেন। গ্রামীণ অঞ্চলে কোনো ভবন নির্মাণে স্টেইকহোল্ডাররা ইঞ্জিনিয়ারদের শরণাপন্ন কম হন, তারা নির্ভর করেন অদক্ষ শ্রমিকের কনসালটেন্সের ওপর, যা একটি ভবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা শৈশবে কিছু স্মৃতি হাতড়ালেই চোখের সামনে ভেসে আছে কিছু দৃশ্য। কিছুদিন আগেও আমাদের গ্রামগুলোয় স্বাস্থ্যসেবার পরিষেবাটি খুবই সংকীর্ণ ছিল। যার কারণে কেউ অসুস্থ হলে গ্রামের মানুষকে নির্ভর করতে হতো কিছু অদক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে। আশার কথা যে, আজ সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না, বরং স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে মানুষ ভালো ডাক্তারদের পরামর্শ নিচ্ছেন; যার কারণে আগের সেই হাতুড়ি ডাক্তারের পেশা হুমকির মুখে, এখন তারা পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। আমাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণ, যা বাসস্থানের জন্য জরুরি। এক্ষেত্রে আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি সচেতনতার অভাবে। আর আশপাশে ভালো কোনো ইঞ্জিনিয়ার না থাকাটা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অন্তরায়। মানুষ প্রকৌশলী হয়ে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে গ্রামে থাকতে চান না বা সেরকম মূল্যায়ন না পাওয়ার ভয়ই গ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করা থেকে বিরত রাখেন। এখন আমরা যারা প্রকৌশলী তাদের এগিয়ে আসতে হবে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে, প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে কতটা মিতব্যয়ীর সঙ্গে একটা ভবন তৈরি করা যায়; যা অদক্ষ শ্রমিকের জানার কথা না।
যাইহোক আমার পেশাগত জীবনে অনেক সফলতা থাকলেও ভেতরে ভেতরে আমি অন্তর জ্বালায় জ্বলি, কীভাবে সাধারণ মানুষের বোঝানো যায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রযুক্তিগত বিষয়টা। যেহেতু আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের অনাবিল প্রকৃতির মাঝে, সেহেতু আমাকে অনেক বিষয়ের মধ্যেই পার হতে হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ অসুস্থ হলে সেটার করণীয় বিষয়টাই আমাকে বেশি ভাবিয়ে তুলত। সেই ভাবনা থেকে অবকাঠামোর জীবন চক্র ঘেঁটে এই সিদ্ধান্তে আমি উপনীত হই যে, মানব শরীরের মতোই অবকাঠামোর শরীর আছে। এই ভাবনার ফসল আমার তৈরি প্রতিষ্ঠান ‘হেলদি কংক্রিট’।
সততার সঙ্গে আমার এই প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার ব্যাপারে দৃঢ় বদ্ধপরিকর। গ্রাম থেকে দূরে থেকে তাদের উন্নয়নে শামিল হওয়া কঠিন বিষয়। তাই লোভনীয় সব চাকরি ছেড়ে মন স্থির করেছি যে, এখন থেকে গ্রামেই থাকব এবং গ্রামীণ অবকাঠামোতে অবদান রাখব। জানি কাজটা অনেক চ্যালেঞ্জিং এবং স্রোতের বিপরীতে আমাকে টিকে থাকতে হবে। আমি বিশ্বাস করি যদি মেধা, সততা আর সাহসের ত্রিমাত্রিক তিন বিন্দু যখন একই বিন্দুতে মিলিত হয় তখন সবকিছুই সহজ হয়ে যায় স্রষ্টার অবারিত নেয়ামতের কারণে। আপনাদের পাশে থাকার নিমিত্তে কুষ্টিয়ার মিরপুরে নিমতলা নামক মফস্বল বাজারে গড়ে তোলা হচ্ছে হেলদি কংক্রিটের হেড অফিস, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘হেলদি হাউস’। এখন এখান থেকে লোকাল স্টেকহোল্ডাররা তাদের ভবন নির্মাণের যাবতীয় কনসালটেন্সি, ভালো মানের ম্যাটেরিয়াল এবং কনস্ট্রাকশনের সব সুবিধা পাবেন এই হেলদি হাউস থেকে। গবেষণাধর্মী এই প্রতিষ্ঠান গ্রামের অবকাঠামোর উন্নয়নে কাজ করবে। অবকাঠামোর সৌন্দর্য, মিতব্যয়িতা এবং সাসটেইনেবলের লক্ষ্যে হেলদি কংক্রিট টিম কাজ করে যাবে। ইট অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম একটি ম্যাটেরিয়াল। ইটের ভাটা বন্ধে সরকারি অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে সেটা পূরণে অসম্ভব হতে দেখা যায়। রাজনৈতিক দলীয়করণের কারণে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। নতুন দিনের ডাকে সাড়া দিয়ে সব ছাত্র-ছাত্রী আজ দেশ সংস্কারের কাজে লেগেছে। নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এখনই সম্ভব ভালো কিছু করার। সে লক্ষ্যে হেলদি কংক্রিট তার দায়বদ্ধতা থেকে পরিবেশবান্ধব একটি ব্লক নিয়ে কাজ শুরু করেছে যার নাম ‘হেলদি ব্লক’। শিগগিরই আপনাদের আশপাশে পরিবেশবান্ধব হেলদি ব্লক পাওয়া যাবে। ইটের তুলনায় ব্লকটির অনেক সুবিধা বিদ্যমান। প্রথমত হেলদি ব্লক দিয়ে বাড়ি করলে খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে। হেলদি ব্লক দিয়ে তৈরি করা ঘরের মধ্যে গরমের দিনে প্রবেশ করলে তাপমাত্রা কম অনুভূত হয়। অন্যদিকে শীতকালে উষ্ণ অনুভব হয়। ইটের তুলনায় ব্লকটি সাসটেইনেবল, আগুন প্রতিরোধী এবং শব্দ নিরোধক।
খুব হালকা হওয়ায় এই ব্লক ভূমিকম্প সহনশীল। ড্যাম্প, লোনা ধরাসহ প্রচলিত কিছু রোগ ইট বহন করে, যেখানে হেলদি ব্লক দিয়ে বাড়ি করলে এসব রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। মজবুত এবং গ্রিন প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এই ম্যাটেরিয়াল গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আমি আশা করি। সচেতনতার অভাবে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। সচেতন হোন। নিরাপদে থাকুন। নিরাপদ স্থাপনায় বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে পাশে পাবেন হেলদি কংক্রিট টিমকে। আসুন সবার প্রচেষ্টায় আমরা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখি।
লেখক: প্রকৌশলী, হেলদি কংক্রিট, সিইও