ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় আহত ২ বাংলাদেশি শহরেই বেশি হামের প্রকোপ মিরসরাইয়ে ১৫ দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গে যমজ শিশুর মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি করে ভাঙারিতে বিক্রি, গ্রেপ্তার ২ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদক কারবারের অভিযোগে হাত-চোখ বেঁধে যুবককে নির্যাতন ঝিনাইদহে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বিশ্ব পরিবেশ দিবস: গ্রিন কনসার্ন’স ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ দিল্লিতে দগ্ধ ৮ বাংলাদেশির ৩ জনের অবস্থা গুরুতর রংপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে মারধরের অভিযোগে ওসি ক্লোজড চুয়াডাঙ্গায় বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা দুপক্ষের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র নান্দাইল, ১৪৪ ধারা জারি খলিলুর রহমান কীভাবে সামলাবেন দুই দায়িত্ব গাছ থেকে পড়ে প্রাণ গেল গৃহবধূর ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ৬ নবজাতকের মৃত্যু: আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শোকজ ঘুরতে গিয়ে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল দুই বন্ধুর চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে: নজরুল ইসলাম প্রতিবন্ধী শিশুদের সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে ৫ জনের মৃত্যু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে: জি এম কাদের যে বিশ্বাস মানুষের জীবনে এনে দেয় অভাবনীয় ৬টি পরিবর্তন? জনমুখী শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় জাতীয় সংসদ: স্পিকার চামড়া নৈরাজ্য অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত ৫ জুন পপ গুরু আজম খানের মৃত্যুবার্ষিকী গাজীপুরে বাসচাপায় অটোচালকসহ নিহত ২ আছিয়া থেকে রামিসা: বিচার কোথায়? প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ঈশ্বরগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় তরুণের মৃত্যু, চেয়ারম্যানসহ ৩১ জনের নামে মামলা
Nagad desktop

শিশুরদের স্মার্টফোন আসক্তি কতটা ভয়ংকর

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১১:১২ পিএম
শিশুরদের স্মার্টফোন আসক্তি কতটা ভয়ংকর
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার বাসিন্দা রুবেল (ছদ্মনাম)। পেশায় আয়কর আইনজীবী। প্রথম সন্তানের বয়স আট। পরেরজনের বয়স তিন। প্রথম সন্তান সবকিছু স্বাভাবিকভাবে করছে- পড়াশোনা, ড্রইং, খেলাধুলা সবই নিয়ম মেনে করে। কখনো কখনো আবার দুষ্টুমি করে মায়ের বকাও শোনে। সংকট হলো পরেরজনকে নিয়ে। তিন বছরের মেয়েটি কথা বলে খুব কম। প্রথমদিকে তারা একে সহজভাবে নিলেও ধীরে ধীরে তাদের দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই এটা নিয়ে ভাবেন, আলোচনা করেন, সমাধান খোঁজেন।

শেষে নিজেরা সমাধান খুঁজে না পেয়ে শরণাপন্ন হন চিকিৎসকের। চিকিৎসক সব দেখে-শুনে তাকে একজন থেরাপিস্ট এবং চাইল্ড স্পেশালিস্টের সঙ্গে আলাপ করতে বলেন। চাইল্ড স্পেশালিস্ট অনেকক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, শিশুর দেরিতে কথা বলা বা স্পিচ ডিলে আছে। এই কারণে শিশু খুব কম কথা বলে। সারাক্ষণ মোবাইল দেখে।

রুবেল যেভাবে সন্তানের সমস্যা বুঝতে পেরেছেন, বাকি অভিভাবকেরা কি তা পারছেন? বেশিরভাগই পারছেন না, কারণ তাদের জানার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আপনার সন্তান কি স্মার্টফোনে আসক্ত? প্রশ্নটা অবশ্য এভাবে না করে করা উচিত- আপনার সন্তান কেন স্মার্টফোনে আসক্ত?
স্মার্টফোনে আসক্তির বিষয়টি শুরুর দিকে আতঙ্কের পর্যায়ে থাকলেও এখন অনেকেই তা মেনে নিয়েছেন।

সুস্পষ্ট করে বললে, অভিভাবকেরা মানতে বাধ্য হয়েছেন। তার কারণ অবশ্য অঢেল।

প্রথমে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি: স্মার্টফোন এখন জীবনযাপনের অংশ। তা হুট করে সরানোর কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু সেই স্মার্টফোন আপনার গোটা সময় কেড়ে নেবে, এটা স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তা অস্বাভাবিক।

করোনার আগে শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের পরিসর ছিল ক্ষুদ্র, করোনার পর তা বেড়েছে। প্রয়োজনে বেড়েছে। এখন সেই প্রয়োজনই সহজ-স্বাভাবিক আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। এই সহজ-স্বাভাবিক রূপের আড়ালে রয়েছে ভয়াবহতা। এর প্রতিকার অবশ্য আছে। প্রতিকার সম্ভবও। তা নির্ভর করছে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও আগ্রহের ওপর। প্রশ্ন হলো, অভিভাবকেরা কি আসলে আগ্রহী?

২০২৪ সালে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। এদের মধ্যে ২৯ শতাংশের মারাত্মক স্মার্টফোন আসক্তি রয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। আরও দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন মায়ের ৪ জনই সন্তানের স্মার্টফোন আসক্তি সম্পর্কে অবগত নন।

জানতে চেয়েছিলাম, আপনার সন্তান কেন স্মার্টফোনে আসক্ত? এর উত্তর গবেষণার মধ্যেই আছে। গবেষণা বলছে, ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এই ১৪ শতাংশ শিশু বা তাদের অভিভাবকেরা পেরেছেন স্মার্টফোনকে শুধুমাত্র অধ্যয়ন বাদে অন্য কাজে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে।

তারা স্মার্টফোন ব্যবহারকে আসক্তির পর্যায়ে নিতে দেননি। নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন।

আবার যে ২৯ শতাংশ শিশুর স্মার্টফোনে আসক্তি মারাত্মক, তারা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তারা ধীরে ধীরে বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে এই আসক্তি দূর করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন শিশুদের মনোযোগ অন্যত্র স্থানান্তর করা। এটা সহজ কাজ নয়। কিন্তু সম্ভব। তা সময়, শ্রম ও ধৈর্যসাপেক্ষ।

প্রসঙ্গ হলো, এখনকার অভিভাবকেরা অনেক বেশি কর্মমুখর। যৌথ পরিবারের ধারণা ভেঙে একক পরিবার বেড়েছে। ফলে অভিভাবকদের বাড়তি কোনো লোক থাকছে না। অল্প মানুষ দিয়ে স্বল্প সময়ে তাদের অনেক কিছু করতে হয়। ইচ্ছা থাকলেও সবসময় তারা পেরে ওঠেন না। তখন শিশু বাধ্য হয়ে স্মার্টফোনকে আপন ভেবে নেয়।

এরপরের বিষয় হলো, অনিরাপদ পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। মোটাদাগে বলতে গেলে, শিশুরা অনিরাপদ। তারা পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, এমনকি দূরের আত্মীয় কারও কাছে নিরাপদ নয়। প্রতিদিনের গণমাধ্যমের অসংখ্য প্রতিবেদন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এর ফলে শিশু একাকী সময় কাটানোর জন্য স্মার্টফোনকে আপন ভাবছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খেলার পরিবেশ ক্ষীণ হওয়া এবং পার্ক ও খেলার মাঠের স্বল্পতা। নগরায়ন বা দ্রুত বর্ধনশীল আবাসনে খেলার মাঠ বা পার্ক অবহেলিত এক প্রকল্পের নাম। যারা নগরায়ন তৈরি করে, তাদের চোখে পার্ক বা মাঠ হলো অলাভজনক বিষয়। আবার পুরোনো যেসব মাঠ বা পার্ক আছে, তাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর করতলে। ফলে শিশুরা মাঠ বা পার্ক না পেয়ে স্মার্টফোনে আসক্ত হচ্ছে।

এই সংকটগুলোর সমাধান সম্ভব, যদি রাষ্ট্র চায়। এখন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাল আর চিন্তার মধ্যে তো আর শিশুদের ফেলে রাখা যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য বিভিন্ন কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি চালু রাখতে হবে।

শিশু যখন তার মনোযোগ অন্য কোনো কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটির মধ্যে দেবে, তখন স্মার্টফোন আসক্তি ধীরে ধীরে কমে আসবে। এখন প্রশ্ন হলো, কী ধরনের কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি তার সঙ্গে করা হবে, বা কী ধরনের কার্যকলাপের মধ্যে শিশুকে ব্যস্ত রাখা হবে?

শিশুর বয়স নির্ধারণ করে, সেই বয়স অনুযায়ী তার কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি নির্ধারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ড্রইং, খেলাধুলা, গান, নাচ, আবৃত্তি, যন্ত্রসংগীত, অভিনয়, সাইক্লিং, সুইমিং, আর্টওয়ার্ক, ভাষা শেখানো, মার্শাল আর্ট শেখা, পরিচয়পর্ব (গাছ, ফুল, পাখি, সবজি, ফলমূল চেনানো), মাটি বা ক্লে বা ডো দিয়ে বিভিন্ন কিছু তৈরি করা, শিশুপার্কে নিয়ে যাওয়া, চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া, গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটানোসহ অসংখ্য বিষয়ের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটানো সম্ভব।

এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তারা শত ব্যস্ততার মধ্যেও শিশুদের নিয়ে এইসব কাজ করাতে পারেন।

এছাড়া শহর বা নগরে বিভিন্ন ধরনের প্রি-স্কুল, কেয়ার সেন্টার চালু আছে। তা অবশ্য ব্যয়সাপেক্ষ। এসব প্রি-স্কুল বা কেয়ার সেন্টারে শিশুদের ব্যস্ত রাখতে অনেক ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অভিভাবকেরা প্রি-স্কুল বা কেয়ার সেন্টার যাচাই-বাছাই করে শিশুদের যুক্ত করতে পারেন।

সবার সামর্থ্য সমান নয়। যাদের সামর্থ্য স্বল্প, সেসব অভিভাবকেরা শিশুদের সময় দিয়ে তাদের বন্ধু হতে পারেন। তারা কী চায়, তা বুঝে সেই অনুযায়ী কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা সাজাতে পারেন।

এক্ষেত্রে প্যারেন্টিংয়ের গাইডলাইন ভালো সহযোগী হবে।

এর ফলে যা হবে, তা হলো স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুদের তাৎক্ষণিকভাবে আসক্তি থেকে দূরে সরানো সম্ভব নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তা দূর করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে সর্বক্ষণ যুক্ত থাকতে হবে। এতে করে শিশুরা অনেক বেশি কর্মমুখর বা প্লেফুল হয়ে উঠবে।

লেখা শেষ করছি একটা চলচ্চিত্রের ঘটনা বলে।

ভারতের বাংলা ভাষার একটি চলচ্চিত্র ‘হাবিজাবি’। এটি মুক্তি পায়২০২২ সালে। গল্পটা এরকম—স্বামী-স্ত্রী দুজনই ব্যস্ত। ছেলেকে সময় দেওয়ার সময় তারা পান না। ছেলে নিজের একাকীত্ব কাটানোর জন্য স্মার্টফোনকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। ধীরে ধীরে তার আসক্তি বাড়তে থাকে। সেই আসক্তি প্রবল আকার ধারণ করে। অনলাইনে গেম খেলতে খেলতে সে এমনভাবে নেশায় ডুবে যায় যে, সবসময় স্মার্টফোন হাতে বসে থাকে। তার হাত থেকে স্মার্টফোন সরানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

স্মার্টফোন হাত থেকে সরানো নিয়ে বাবার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধলে ছেলে অনলাইন গেমে বাবাকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে থাকে। একসময় স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারে, তাদের সন্তান আসলে অনেক বেশি মাত্রায় স্মার্টফোনে আসক্ত। এ থেকে তারা তাদের সন্তানকে বের করতে পারছে না। এভাবে স্মার্টফোন আসক্তির ভয়াবহ কুফল দেখানো হয়, দেখানো হয় সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন কতটা জরুরি।

চলচ্চিত্রে অনেক ছোট ছোট বিষয় দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এই বার্তা দেওয়া হয়েছে- শিশুদের পারিবারিক বন্ধন থেকে আলাদা করার সুযোগ নেই। এই বন্ধন আলগা হলেই শিশুর যেকোনো ক্ষতিকর বিষয়ের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি এবং খেয়াল রাখা জরুরি, যাতে করে তাদের শিশু অন্যত্র বা অন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয়ে আসক্ত না হয়।

বিনয় দত্ত: লেখক

বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস আজ

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস আজ
ছবি: সংগৃহীত

৩ জুন ‘বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস’ বা বিশ্ব মুগুর পা দিবস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের রূপকার, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন ড. ইগনাচিও পনসেটি-এর জন্মদিনকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ড. পনসেটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন, যা কোনো ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই মুগুর পা বা ক্লাবফুট সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলতে সক্ষম। বর্তমানে সারা বিশ্বে এই পদ্ধতিটি ‘পনসেটি মেথড’ বা পনসেটি পদ্ধতি নামে সমাদৃত।

এ দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো— ক্লাবফুট সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ভ্রান্ত ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিটি আক্রান্ত শিশুর জন্য সঠিক ও সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

২০২৬ সালের বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসের বৈশ্বিক চেতনার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদেরও মূল লক্ষ্য হলো— কোনো শিশু যেন চিকিৎসার অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ না করে এবং কোনো মাকে যেন এই জন্মগত ত্রুটির কারণে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা।

দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে, বিশেষ করে ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে সমাজের অনেক গভীর ও করুণ বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। জন্মগত মুগুর পা বা ক্লাবফুট নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম দেশে বহুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারকে বাস্তব জীবনে যে ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা আজও অত্যন্ত করুণ এবং হতাশার।

আমি আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি— ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুটির পরিবারের আর্থিক অবস্থা যদি বেশ সচ্ছল ও বিত্তশালী হয়, তবে এই শারীরিক ত্রুটিটি তাদের জীবনে তেমন কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। কারণ, তারা দ্রুত উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুটিকে সুস্থ করে তোলেন। কিন্তু এর বিপরীতে, পরিবারটি যদি আর্থিকভাবে অনটন আর অভাবের দুষ্টচক্র দ্বারা আবর্তিত থাকে, তবে তাদের কষ্ট আর বঞ্চনার কোনো সীমা থাকে না। দারিদ্র্যের কশাঘাতের সঙ্গে যখন সামাজিক কুসংস্কার যুক্ত হয়, তখন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।

সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের এবং ব্যথিত হওয়ার বিষয় হলো— আমাদের সমাজে শুধুমাত্র ক্লাবফুট আক্রান্ত বাচ্চা প্রসব করার অপরাধে (!) দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ নেমে আসে। একটি জন্মগত ত্রুটির জন্য সম্পূর্ণভাবে মাকে দোষারোপ করা হয় এবং তাকে কলঙ্কিত করা হয়।

আমরা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের কথা বলছি; আমরা মনে করি এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, ইন্টারনেটের যুগ। মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনেক প্রশ্নের সমাধান এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক ক্লিকেই জুটে যায়। অথচ, এত কিছুর পরও আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ অনেক কুসংস্কার আর বদ্ধমূল ধারণার দাস হয়ে আছে। এই তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগেও আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বুকের ভেতরের চাপা কান্নাগুলো যেন অনেকাংশেই অব্যক্ত থেকে যায়। পেশাগত কারণে যখন আমি তাদের মনের কষ্টের কথাগুলো জানতে চাই, তখন অনেকেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তারা জানান, সমাজের মানুষ, এমনকি তাদের নিজ পরিবারের সদস্যরাও আজও মনে করেন— এটি মায়ের কোনো পাপ বা বাবার কোনো খারাপ কাজের ফল!

মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় আমরা যখন ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বিভিন্ন চিকিৎসাতথ্য ও ইতিহাস সংগ্রহ করি, তখন এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে।

দেখা যায়, একজন মা তার গর্ভকালীন সময়ে অত্যন্ত নিয়ম মেনে চলেছেন। তিনি গর্ভকালীন পরিচর্যার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছেন, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেয়েছেন এবং তার গর্ভাবস্থায় কোনো ধরনের বড় জটিলতাও ছিল না। তারপরও তার গর্ভের সন্তানটি ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। আবার এমন ঘটনাও দেখেছি যে, একজন মায়ের তিনটি সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানটি ক্লাবফুট আক্রান্ত হয়ে জন্মেছে, দ্বিতীয় সন্তানটি সম্পূর্ণ সুস্থভাবে জন্মেছে, কিন্তু তৃতীয়বার যখন তিনি আবার সন্তান প্রসব করেছেন, তখন সেই সন্তানটিও আবার ক্লাবফুটে আক্রান্ত হয়েছে।

এ ঘটনাগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানাটা আমাদের সবার জন্যই জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ বলছে, মুগুর পা বা ক্লাবফুট মূলত একটি জন্মগত কাঠামোগত ত্রুটি (কনজেনিটাল ডিফরমিটি)। বিশ্বব্যাপী প্রতি এক হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে গড়ে এক থেকে দুজন শিশু এই ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর কয়েক হাজার শিশু এই সমস্যা নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখে। এর সুনির্দিষ্ট কোনো একক কারণ আজও বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ইডিওপ্যাথিক’।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত এবং গর্ভকালীন পরিবেশগত কিছু অজানা কারণের সংমিশ্রণে এ সমস্যাটি তৈরি হয়। পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে এটি হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। তাই প্রথম ও তৃতীয় সন্তানের ক্লাবফুট হওয়া এবং মাঝের সন্তানের সুস্থ থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ জিনগত বিন্যাসের একটি স্বাভাবিক গাণিতিক সম্ভাবনা মাত্র। এর সঙ্গে মায়ের খাদ্যাভ্যাস, তার কোনো কাজ বা কল্পিত কোনো ‘পাপ’-এর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু আমাদের সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা এই অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণাগুলোর সঙ্গে যখন পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপড়েন যুক্ত হয়, তখন ওই মা ও শিশুর দুর্দশার যেন কোনো শেষ থাকে না। এ অন্ধকার দূর করার লক্ষ্যেই আমরা ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে আধুনিক চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। 

শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করছি। সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে বদ্ধমূল ধারণা ও কুসংস্কারগুলো রয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে আমরা তথ্যভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ প্রদান করছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষের ভেতরের এই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিয়ে একটি সহানুভূতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।

তবে আজও আমাদের খুব আক্ষেপের সঙ্গে লক্ষ করতে হয় যে, ক্লাবফুটকে এখনও গ্রামাঞ্চলে একটি ‘অভিশাপ’ হিসেবেই দেখা হয়। আমরা নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি, একটি মাকে অকারণে কলঙ্কিত করার এই যে নিষ্ঠুর সামাজিক রীতি— তা যেন চিরতরে বদলে যায়। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই যে— ক্লাবফুট কোনো অভিশাপ নয়, এটি কেবলই একটি নিরাময়যোগ্য জন্মগত ত্রুটি।

এই ত্রুটি নিরাময়ে বর্তমানে ‘পনসেটি পদ্ধতি’ ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এটি একটি অত্যন্ত সহজ, নিরাপদ এবং শতভাগ কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে কোনো বড় সার্জারির প্রয়োজন হয় না; বরং ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি প্লাস্টার (কাস্টিং) এবং পরবর্তীতে একটি বিশেষ জুতো বা ব্রেস ব্যবহারের মাধ্যমে বাঁকা পা সম্পূর্ণ সোজা ও স্বাভাবিক করে তোলা যায়। তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি যেটি প্রয়োজন, সেটি হলো— সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা। জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব (সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে) শিশুকে নিকটস্থ ক্লাবফুট ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে ফলাফল সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়।

আর এ দ্রুত চিকিৎসার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা। সেই সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে যারা কাজ করছেন, সেসব স্বাস্থ্যকর্মীদের (যেমন: পরিবার কল্যাণ সহকারী, স্বাস্থ্য সহকারী ও কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোভাইডার) একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি। তারা যেহেতু সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের সঙ্গে কাজ করেন, তাই জন্মের পরপরই যদি তারা কোনো শিশুর পায়ের পাতায় সন্দেহজনক বাঁকাভাব বা ক্লাবফুটের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন, তবে যেন কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাকে সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করেন।

একটি সুস্থ, সুন্দর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আসুন, ৩ জুন বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসে আমরা এই শপথ নিই— বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের প্রসার ঘটিয়ে আমরা সমাজের সব কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে দেব। কোনো মা যেন আর অকারণে চোখের জল না ফেলেন এবং প্রতিটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু যেন সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনের অধিকারী হতে পারে, তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখক: সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক। ই-মেইল: [email protected]

শিশু পালনে জ্ঞানের পাশাপাশি কৌশলও দরকার

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
শিশু পালনে জ্ঞানের পাশাপাশি কৌশলও দরকার
ছবি: সংগৃহীত

নতুন শিশু একটি পরিবারে নিয়ে আসে আনন্দের স্রোত। ছোটমণিকে ঘিরে উৎসবের কমতি থাকে না। শিশু জন্মের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উচ্ছ্বাস ভাগাভাগি করতে দেখেও আমরা আনন্দ পাই। ঘুমিয়ে থাকা শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা-মা হয়তো স্বপ্ন দেখেন রঙিন ভবিষ্যতের।

যদিও স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অনেক বন্ধুর। আর সময়সাপেক্ষও বটে। কারণ একজন শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হতে প্রয়োজন দীর্ঘ সময় ও প্রস্তুতির। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই আসে শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা, তার লালন পালনের কথা। লালন-পালনও যে চাট্টিখানি  কথা নয় এ কথা আমরা সকলেই কমবেশি জানি। এই যেমন খাওয়ানোর ব্যপারেই ধরুন। ছোটবেলায় দুপুরে একটি একটি করে ছোট মাছ পাতে তুলে দিয়ে খেতে শেখানোর জন্য বাবা-মায়ের সে কি থাকে  নিদারুণ চেষ্টা, সে কথা কে না জানে। তবু দুই বছর বয়স পর্যন্ত একজন শিশুর সঠিক যত্ন কিভাবে নিতে হয় সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের  কাছ থেকে  জেনে নেয়াটা সবার জন্যই  দরকারি।

শিশুর ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিভাবে মেটাবেন:
শিশু জন্মের ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের  বুকের দুধই যথেষ্ট। ক্ষুধা মিটছে না ভেবে বাজারে পাওয়া কৌটার দুধ (ফর্মুলা মিল্ক) কিংবা গরুর দুধ  দেওয়ার মতো ভুল একদম করা যাবে না। এগুলো  শিশুর জন্য 
ক্ষতিকর। 

ঢাকা মেডিকেল  কলেজ ও হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. তাহসিনুল আমিন  জানালেন, ২৪ ঘন্টায় ৮-১০ বার দুধ পান করালে অন্তত ছয়বার শিশু  প্রস্রাব করলে, নিয়মিত ওজন বৃদ্ধি পেলে বুঝবেন শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ইফফাত আরা শামসাদ জানালেন, শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হলে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার দিন। একটু একটু  খাবারের পরিমাণ বাড়ান। শিশুকে সবার সাথে ঘরে তৈরি করা শক্ত(সেমি সলিড) খাবার দিতে পারেন। ভাত, মাছ, ডাল,শাকসবজি সব মাখিয়ে মজা করে খাইয়ে দিন ওকে। মুঠো ফোন বা টেলিভিশন দেখিয়ে নয়। শিশুকে খাওয়াতে  জোরাজুরি  করবেন না। সব কিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিয়ে ওকে বসিয়ে খাওয়ান। চাইলে আলাদা খাবার রান্না করতে পারেন, তবে অতিরিক্ত পাতলা করে নয়। প্রতিদিন ডিম ও ফল খেতে দিন। ডিম অবশ্যই তেলে ভালভাবে ভেজে নিন(রান্না করলে যেন পর্যাপ্ত সময় রান্না করা হয়)। না হলে জীবানু সংক্রমণ হতে পারে। দুই বেলা ভাত বা খিচুড়ি এবং সকালের নাস্তার পাশাপাশি আরো দুই বেলা পুষ্টিকর নাাস্তা দেওয়া ভাল(মোট পাঁচবার খাবার)। ছয় মাস বয়সের পর শিশুকে গ্লাসে করে পানি খেতে দিন, কোন মামপট বা ফিডারে নয়। কোমল পানীয়, চিপস, চানাচুরের অভ্যাস করাবেন না।

ভাবতে হবে  পোশাক নিয়ে।  বজায়  রাখতে হবে পরিচ্ছন্নতা। শীতকালে শিশুকে পরিচ্ছন্ন শীত পোশাকতো দেবেনই, অবশ্যই মাথা ঢেকে রাখুন। জন্মের অন্তত তিন দিন পার হলে গোসল করান। গোসল একদিন অন্তর করান (শীতের সময়)।  বয়স এক মাস পার হলে প্রতিদিন গোসল করান। কুসুম গরম পানি দিয়ে শিশুকে গোসল করাবেন। আর্দ্রতার জন্য গোসলের আগে তেল মালিশ করলে সমস্যা নেই। আর সর্ষের তেল ঝাঁঝালো, তাই মুখে ও মাথায় তা দেওয়ার দরকার নেই। যে কোন তেল অতিরিক্ত দেওয়া হলে মাথার ত্বকে প্রলেপ পড়তে পারে। শিশুর ত্বকের উপযোগী  কম ক্ষারের সাবান ব্যবহার করতে পারেন প্রতিদিন। সোনামণির চুলের উপযোগী শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। সপ্তাহে দুই দিনই যথেষ্ট শ্যাম্পুর করার জন্যে। গোসলের পর বেবি লোশন দিতে পারেন। তবে বয়স ১৫ দিনের আগে তেল, লোশন কিছুই দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শীতে ছোট শিশুর চুল না ফেলাই ভালো। নবজাতকের প্রথম চুল ফেলতে দেড়-দুই মাস অপেক্ষা করুন।

নিরাপদ ঘুমের  ব্যবস্থা করতে হবে
প্রচলিত নিয়মে  বিছানায় নবজাতকের মাথা রাখতে পাগড়ির মতো গোল করে কিছু তৈরি করা হয়, যার কোন প্রয়োজন নেই। নবজাতকের জন্য  এক ইঞ্চি উচ্চতার নরম ও পাতলা বালিশ ভালো, খেয়াল রাখুন যেন ঘাড়ে ভাঁজ না পড়ে। চাইলে  শিশুর জন্য চারকোণা কাপড় প্যাঁচানো ছাড়া ভাঁজ করে এক ইঞ্চি উচ্চতা করে নিতে পারেন। ছয় মাসের পর বয়স অনুযায়ী বালিশের উচ্চতা বাড়ানো যায়। দুই বছর বয়সে এই উচ্চতা দুই ইঞ্চি করতে পারেন। শিশু মায়ের কাছেই ঘুমাবে। তবে খেয়াল রাখুন, কম্বল, কাঁথা,  বিছানার চাদর, বালিশ এমনকি মায়ের শরীরের কোন না কোন অংশে যেন শিশুর নাক, মুখ চেপে না যায় কিংবা শিশু বিছানা থেেেক পড়ে না যায়।

যত্নবান হতে হবে শিশুর বেড়ে ওঠার বিষয়ে
প্রতিদিন শিশুকে অন্তত ৩০ মিনিট রোদ্দুরে রাখুন। সকাল নয়টার আগে কিংবা বিকেল চারটার পর রোদে রাখা ভাল। সঙ্গে থাকুন মা-ও। দু’জনের শরীরেই  ভিটামিন ডি তৈরি হবে।

তিন মাস পর্যন্ত খুবই সাবধানে কোলে নিন, যেন ঘাড়ের পেছনে শক্তভাবে ধরা থাকে। অর্থাৎ  কোনভাবেই  যেন শিশুর মাথা ঝুলে না পড়ে। হাত ধরে টেনে শিশুকে  কোলে নেওয়া উচিত নয়। কাঁধের  জয়েন্ট বা জোড়া আলগা হয়ে হাত ঝুলে পড়তে পারে।

হাঁটা শেখাতে ওয়াকার দেওয়া নিষেধ। প্রাকৃতিক নিয়মে  শিশু একেক ধাপে একেক কাজ শেখে। নিয়মের বাইরে গেলে উল্টো ফল হতে পারে(হাঁটা শিখতে দেরি হতে পারে)।

অনেক সময় মায়ের অফিসে শিশুকে নিয়ে দুধ পান করিয়ে আনার সুযোগ থাকে, শিশুকে রাখার ব্যবস্থাও থাকে। প্রয়োজনে শিশুকে বাইরে নিতে ক্ষতি নেই।

বুকের সামনে শিশুকে ঝুলিয়ে বহন করলেও ক্ষতি নেই। শুধু  সে যেন পুরোপুরি ‘সাপোর্ট’ পায়, মানে ওর শরীর যেন পুরোপুরিভাবে সমর্থিত থাকে।

সুপর্ণা দাশ গুপ্তা: লেখক

কেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব চাই?

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
আপডেট: ০২ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
কেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব চাই?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

খারাপ বা অন্যায় কাজ মুছে দিতে ভালো কিছু প্রয়োজন। এ জন্য ভালোর দিকে যেতে হবে। যে ভালো সমাজে পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটাবে। নতুনের ছায়াতলে আসবে মানুষ। আলোর পথ ধরে এগিয়ে যাবে সবাই।

দেশে সমাজ, সভ্যতায় যে পচন ধরেছে তা থেকে উত্তোরণের জন্য ভালো কিছু প্রয়োজন। পৃথিবীর যত দেশ সংকটের মুখে পড়েছে তাদের অনেকেই বিকল্প পরিবর্তনে উত্তোরণের উপায় খুজেছে। ভালো কিছুর চিন্তা করেছে, সেই ভালোটা আসলে কী? আমাদের সামাজিক অবক্ষয় এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে পচা শামুকে পা কাটার মতো। প্রথমে পচা শামুকে পা কাটল, তারপর সেফটি। যন্ত্রণায় ডাক্তার দেখানোর পর পায়ের কিছু অংশ কাটা হলো। রোগ সারেনি। এরপর একে একে পুরো পা কাটা হলো। তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এবার মৃত্যুর পথে জীবন!

সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে, এখন পুরো সমাজ সংকটাপন্ন। অবহেলায় পচা শামুখে পা কাটার গল্পের মতো। রাজনীতি নিজের মতো করে চলছে। নিজস্ব স্টাইলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক সংকট সমাধানে কোনো দলের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। গত ২৫ বছরে দেশের কোনো নেতা সামাজিক সংকট সমাধানে বিকল্প কোনো চিন্তার কথা বলেছেন বা ভেবেছেন বলে মনে পড়ে না।

সামাজিক সুরক্ষার জন্য রাজনীতির সংস্কৃতির বাইরে বিকল্প আর কী হতে পারে? সেই ভালো হলো সংস্কৃতির জাগরণ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এই ভাবনা রাষ্ট্রের মগজ থেকেও কেউ ভাবতে চান না! রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে বাস্তবতা আমরা দেখেছি তা হলো– কোন কোন ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অপকর্ম করে পার পাচ্ছে। কিংবা রাজনৈতিক শক্তির সাহস নিয়ে অনেকেই অপরাধ করছেন। রাজনীতিকে অনেকেই অপরাধ থেকে পার পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। বা অপরাধের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্রকে অনেক সময় ম্যানেজ করা যায়।

এই সুযোগে সংস্কৃতির বলয় থেকে আমরা দূরে সরে যাওয়ায় সমাজে অপরাধ দিন দিন ভয়ংকর রূপে মাথাচড়া দিচ্ছে। সংকট মহা-আয়োজনে ঘনীভূত হয়েছে। আমরা একটি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। অপরাধ কিংবা অপরাধীর এই মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের জন্য চলমান সমাজ ব্যবস্থার কী পরিবর্তন সম্ভব? যদি কার্যকর পথে হাঁটা যায় তবেই সম্ভব এই ক্ষত সারানো বা উপড়ে ফেলার।

বিশ্বে শান্তির দেশের তালিকায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অবস্থান কত? অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই)-২০২৫ শান্তি সূচকে ৩৩ ধাপ পিছিয়ে ১৬৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১২৩। সত্যিই এ খবর উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার।

বাংলাদেশ ছাড়াও শান্তির সূচকে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো হলো– ইউক্রেন, রাশিয়া, মায়ানমার, কঙ্গো। এসব দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা সবার জানা। এই ইনডেক্স চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, আমরা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছি। এর বড় প্রমাণ হলো সামাজিক বাস্তবতা। এই সূচকের কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে–এ নিয়ে কারও ভাবনা আছে?

শান্তির দেশের তালিকা তৈরির জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় দেখা হয়, সেগুলোর অন্যতম হলো– অপরাধের হার ও সহিংসতার মাত্রা, সমাজে অস্থিরতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, হত্যা ও অপরাধজনিত কারণে মৃত্যুর হার। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এবং তাদের কার্যকারিতা। কারাবন্দির সংখ্যা এবং শরণার্থীদের অবস্থা। এ সবকটি মানদণ্ডে আমরা পিছিয়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সামাজিক অপরাধ রাষ্ট্রের বড় মাথা ব্যথার কারণ কিনা জানিনা। বাস্তবতা হলো পুলিশ-প্রশাসন সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না, বা করছে না। দেশে মবের সংস্কৃতি চলছে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বদনাম। আইন ও সালিশকেন্দ্রের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে, ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবকটিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ২০৩ জন শিশু নিহত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট উদাহরণ। বাবা-মা সন্তানকে হত্যা করছে। সম্পতির বিরোধে ও বয়স্ক পিতা-মাতাকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে সন্তান। সামান্য ইস্যুতে দেশে খুনোখুনি হচ্ছে। বাড়ছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর বিরোধ। সব মিলিয়ে সমাজ রীতিমতো অশান্ত। আমরা অশান্ত সমাজের দাবানলে পুড়ছি।

নির্বিচারে শিশুদের ওপর পাশবিকতা, হত্যা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে শিশুদের বলাৎকারের মতো অসংখ্য ঘটনার পরও আমরা বলব সমাজ পরিবর্তনের জন্য ভাবনা ভাবা উচিত নয়? এই রোগের চিকিৎসার দরকার নেই। যে দেশে শিশুদের ওপর বর্বরতা চলে, সে জাতি-রাষ্ট্র অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। আমরা শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছি না। রামিসার মতো হয়ত আরও অনেক শিশু নীরবে ভয়ংকর পরিণতির শিকার হচ্ছে। সবকিছু গণমাধ্যমে আসছে না, লোক-লজ্জার কারণে অনেক পরিবার তা প্রকাশও করতে চান না। সমাজের এই অস্বাভাবিকতার চিকিৎসা অনিবার্য।

যে নিয়ম স্বাভাবিক পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারে না, তখন বোঝা উচিত এই অস্ত্র ভোতা হয়ে গেছে। বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। অর্থাৎ যে জাতি সংস্কৃতিতে যতটা সমৃদ্ধ, সে জাতি ততটা সভ্য ও উন্নত। সংস্কৃতি মানুষকে সভ্য করে তোলে। মনের মধ্যে থাকা দানবকে নিভৃত করে। খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। সুস্থ ধারার সংস্কৃতিকে সমাজ বদলের হাতিয়ার বলা হয়। তাই সময় এসেছে সংস্কৃতির বিকাশ, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও জাগরণের। যা রাজনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। সমাজ পরিবর্তন ও মানুষের মনোজগত বদলাতে সংস্কৃতির দিকে সবাইকে ধাবিত হতে হবে, এটা একটা বিরাট বড় ও কার্যকর ওষুধ।

৫০ বছরের বেশি সময় দেশে সংস্কৃতির স্থবিরতা চলছে। গোটা সাংস্কৃতির জগৎ অন্ধকার। একমুখী রাজনীতি আর মোবাইল সংস্কৃতির গ্রাসে আমরা সবাই। সংস্কৃতি এমন একটি উপাদান যা সমাজ চিন্তা, মানসিকতা ও সভ্যতা বদলানোর ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, অথচ তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। একে একে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা নামে মাত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক আয়োজন থামতে শুরু করেছে। গ্রামীণ যাত্রাপালা, নাটক, বিভিন্ন পালা গানের আয়োজন, কবিগান, খেলা, জারি-সারি, গানের আসর, গীত, ধামাইল সবকিছু এখন যেন কাগজের পাতায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন। শিশুদের খেলার মাঠ নেই, প্রয়োজনীয় পার্ক নেই। কমছে সুস্থ ধারার বিনোদন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট দিন দিন এককেন্দ্রিক ও কম হচ্ছে। বড় বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অর্থের অভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তাহলে মানুষের উন্নত মনোজগৎ ও মানসিকতার বদল কেমনে ঘটবে? অথচ এই উপমহাদেশ ছিল একসময় শিক্ষা সংস্কৃতির উর্বরকেন্দ্র। সংস্কৃতি বিমুখতা আমাদের মন ও চিন্তাকে শক্ত ও অমানবিক করে তুলছে। যেকোনো অপকর্ম করতে মন বাধা দেয় না। তাই অপরাধ বাড়ছে। নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা। 

সংস্কৃতির বিপ্লব নতুন কিছু নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পুরোনো প্রথা ভেঙে নতুন সমাজ বদলে সংস্কৃতির পথ ধরে হেঁটেছে। ৯০ দশকে বেলজিয়ামে সামাজিক অপরাধ ঠেকাতে পুরো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যে আলোড়ন তৈরি করেছিল, তার মূলকথা ছিল বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির আশ্রয়, ভাবের বিপরীতে বস্তুর প্রাধান্য। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় যে জাগরণ ঘটে, যার প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। ধর্ম-সংস্কৃতি-সাহিত্য-রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় আদর্শ-সব ক্ষেত্রেই নবীন ভারতে যে রূপান্তর ঘটল তার মূলে এক বড় শক্তিরূপে কাজ করেছে এই রেনেসাঁ। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের স্বদেশি আন্দোলনে এই জাগরণ নিজেকে জানান দেয় এক অসাধারণ বিক্রমে।

তাই সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত ও সভ্য সমাজের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সংস্কৃতির পথে হাঁটতে হবে। সাংস্কৃতিক বিল্পব পারে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে। সবাইকে নতুন পথ দেখাতে, নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে আরও বেশি সুরক্ষিত করতে। সেই সঙ্গে বিশ্বের কাছে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। সমাজের ক্ষত সারাতে সাংস্কৃতির বিপ্লব চাই-ই-চাই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]

জিয়াউর রহমান: অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১০:০৬ এএম
আপডেট: ৩১ মে ২০২৬, ১০:১৫ এএম
জিয়াউর রহমান: অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী
মো. হাবিবুর রহমান ও মামদুদুর রহমান

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান (১৯৩৬-১৯৮১) বাংলাদেশের ইতিহাসে ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যেখানে আছে নানা রোমাঞ্চকর ঘটনা এবং ইতিহাসের ঘটনাবহুল বর্ণনা। ইতিহাসে তিনি আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল ছিলেন। সৈনিক জীবন, যুদ্ধে বীরত্বগাথা এবং অল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার যে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাবে অভিষিক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রচলন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রচলন করার কারণে তার দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আজও রয়ে গেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে যেহেতু বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, তারা কী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেবে, এসব বিষয় নিয়ে যখন বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে দ্বিধা ও উত্তেজনা বিরাজমান ছিল, তখন তিনি দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। সুতরাং তার কর্ম (সৈনিক জীবন) এবং রাষ্ট্রীয় শাসন পর্যালোচনার মাধ্যমে তার দর্শন সম্পর্কে ধারণা লাভ করা বর্তমানে প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পূর্ববঙ্গে বাঙালিদের বিজয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অল্প বয়স তথা চাকরি জীবন থেকেই উদযাপন করতেন। যেমন- ‘একটি জাতির জন্ম’, এতে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টের বিজয় রথের চাকার নিচে পিষ্ট হলো মুসলিম লীগ। বাঙালিদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক যুক্তফ্রন্টের বিজয় কেতন উড়ল বাংলায়। আমি তখন দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্যাডেট। আমাদের মনেও জাগল তখন পুলকের শিহরণ। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি সাফল্যের আনন্দে উদ্বেলিত হলাম আমরা সবাই। পর্বত ঘেরা অ্যাবোটাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা বাঙালি ক্যাডেটরা আনন্দে হলাম আত্মহারা। খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করলাম সেই বাঁধভাঙা আনন্দের তরঙ্গমালা। একাডেমি ক্যাফেটরিয়াল নির্বাচনি বিজয় উৎসব করলাম আমরা। এ ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়। এ ছিল আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার জয়, এ ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের একটি বিরাট সাফল্য।’ সুতরাং এসব বিষয় থেকে তার দেশপ্রেম ও পূর্ববঙ্গে আলাদা জাতিসত্তার যে পরিচয় থাকা দরকার তা এখানে ফুটে উঠেছে।

শফিক রেহমান (২০২৫) তার লিখিত ‘রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ‘জিয়া সত্যিই ছিলেন এক মৃত্যুঞ্জয়ী ব্যক্তি। তার আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল বাস্তবমুখী। তাই জনতার কাছে বিএনপির আবেদন এখন আরও বেশি।’ বাংলাদেশে সর্বজনপরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে জিয়াউর রহমান অন্যতম। এখনও তার জনপ্রিয়তা এবং ব্যক্তিত্বের মোহ কাটেনি। গণভোট এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ‘গণতান্ত্রিক’ কর্মসূচির উন্মুক্তকরণ তার অন্যতম উদ্যোগ।

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এই দফাগুলো তিনি দেশের আর্থসামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে ঘোষণা করেছিলেন। ১৯ দফা যথাক্রমে: দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব; শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতির মধ্যে মূলত-সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্মক বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের অর্থে সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনে সর্বাত্মক প্রতিফলন; আত্মনির্ভরশীল জাতি; প্রশাসনের সর্বস্তরে শৃঙ্খলা, উন্নয়ন কার্যক্রমে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; কৃষিতে উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ, বিশেষত জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদারকরণ; খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং ক্ষুধা মোকাবিলা; দেশে কাপড়ের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কাপড়ের চাহিদা পূরণ; গৃহহীনদের গৃহায়ন; নিরক্ষরতা দূরীকরণ; চিকিৎসার সুব্যবস্থা; সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা ও যুবসমাজকে সুসংহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধকরণ; অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দেওয়া; শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন ও উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা; সরকারি চাকরিজীবীদের জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তি তৈরিতে উৎসাহ দেওয়া ও তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন; জনসংখ্যার বিস্ফোরণ রোধ; সব বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা; প্রশাসন ও উন্নয়নব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণসহ স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ; দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমসহ ধর্ম, গোত্র ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা। উপর্যুক্ত দফাগুলোর মধ্যে কয়েকটি দফার প্রাসঙ্গিকতা না থাকলেও কিছু দফার প্রাসঙ্গিকতা আজও রয়েছে। যা বর্তমান বিএনপি সরকার এবং জনগণের সদিচ্ছার ওপর ভবিষ্যৎনির্ভর করছে। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারকে জোরালো ভূমিকা নেওয়ার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। যা আগামীর বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নতিনির্ভর করছে।

সিপাহী বিপ্লব জিয়াউর রহমানের জীবনে এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক। তৎকালীন সময় ও অবস্থার কারণে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেন। যা ড. আবদুল লতিফ মাসুম (১৯৯৯) তার ‘জিয়াউর রহমান- আচ্ছাদিত ইতিহাস’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন- “একটি রাজনৈতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্য জনগণ মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটি শক্তিশালী সরকারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়বে এটাই ‘রাজনৈতিক ব্যাকরণের’ দাবি। আর মিলিটারি পলিটিক্স সম্পর্কে আধুনিক দুনিয়ার জনপ্রিয় লেখক এডওয়ার্ড ফিয়েট ঠিক, এই অবস্থাকে জনগণের জন্য ‘ওয়েলকাম রিলিফ’ বলে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট প্রক্রিয়ায় ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লব ছিল এমনি ধরনের একটি ওয়েলকাম রিলিফ। এই পরিবর্তন আকাঙক্ষা বা বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ অব্যাহত অনিশ্চয়তা, নৈরাজ্য এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকে সমূলে উৎপাটিত করে একজন শক্ত মানুষের হাতে শক্ত সরকার প্রতিষ্ঠার বৈধ কর্তৃত্ব অর্পণ করেছিল। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সিপাহী বিপ্লব ছিল সমসাময়িক পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা... জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠানকে জনগণ মিছিলের স্রোত আর উল্লাস দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে।... এই উপমহাদেশের সৈনিকরা সিপাহী বিপ্লব করেছিল ১৮৫৭ সালে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য, আর ১৯৭৫ সালে তারা আবার বিপ্লব করেছে তাদের ভাষায় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। সৈনিকরা ৭ নভেম্বর নির্দেশের পদসোপানকে অগ্রাহ্য করে, শৃঙ্খলার ব্যারিকেড ভঙ্গ করে, জীবনকে বাজি রেখে বিপ্লবকে যেভাবে সফল করেছিল- স্বাভাবিক সময়ে, স্বাভাবিক নিয়মে তা কল্পনাও করা যায় না। একটি পেশাগত সেনাবাহিনীর জন্য এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। এটি রাজনীতি বিজ্ঞানের তথাকথিত প্রথাগত গতানুগতিক অভ্যুত্থান।” সুতরাং উপর্যুক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ৭৫ পরবর্তী ইতিহাস এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ঘটনা নতুনভাবে পর্যালোচনা করা খুবই প্রয়োজন।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধান পরিবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মসূচি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, চাকরির বাজার সৃষ্টি, শহরের বাসিন্দাদের জন্য নানামুখী ইতিবাচক কর্মসূচি, শ্রমজীবীদের অধিকার, ইসলামি মূল্যবোধের প্রসার, জাতীয়করণ, মিশ্র অর্থনীতির প্রণয়ন, গণতন্ত্রের প্রসার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পররাষ্ট্রনীতিসহ বহুমুখী নীতির কারণে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অনেক পরিবর্তন এসেছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। যদিও তার হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। যা নিয়ে আরও বিচার-বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। জিয়ার হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি পূরণের জন্য তার দর্শন এবং বাংলাদেশ নিয়ে তার যে পরিকল্পনা রয়েছে- তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ এবং আজও মানুষের হৃদয়ে তার জন্য ভালোবাসা প্রমাণ করে যে, জিয়াউর রহমান অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী।

লেখক: মো. হাবিবুর রহমান (কবি, লেখক ও গবেষক) এবং মামদুদুর রহমান (লেখক ও তথ্যবিজ্ঞানী)

জলসীমার অতন্দ্র প্রহরী থেকে মানবতার বাতিঘর: বেসামরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
আপডেট: ৩০ মে ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
জলসীমার অতন্দ্র প্রহরী থেকে মানবতার বাতিঘর: বেসামরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী
ড. হাসান মাহমুদ

‘শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়’- এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ নৌবাহিনী কেবল দেশের তিন হাজার বর্গমাইলেরও বেশি সমুদ্রসীমা ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) অতন্দ্র প্রহরীই নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যেকোনো সংকটে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক পরম বিশ্বস্ত নাম। গত কয়েক দশকে দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নৌবাহিনী যে অবদান রেখেছে, তা এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সামরিক শৃঙ্খলার সঙ্গে মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে নৌবাহিনী আজ বেসামরিক স্বাস্থ্যসেবায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।

গৌরবের উৎস:

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নৌবাহিনীর চিকিৎসা সেবার সূচনা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মানবিক ও চিকিৎসাসেবার এই ঐতিহ্য হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি; এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে। ১৯৭১ সালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ধুলিসাৎ করে দিয়েছিলেন বীর নৌ-কমান্ডোরা।

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ভারতের পলাশ ও পদ্মা নামের দুটি গানবোট এবং বিভিন্ন নদীভিত্তিক ক্যাম্পে নৌ-কমান্ডোদের পাশাপাশি সাধারণ বেসামরিক মানুষ ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো। সীমিত সম্পদ ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও নৌ-কমান্ডোদের চিকিৎসকরা যুদ্ধাহত ও স্থানীয় চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র দুটি গানবোট নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথম থেকেই উপকূলের অবহেলিত মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাকে তাদের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে।

ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা: 

চিকিৎসা খাতে নৌবাহিনীর পূর্ববর্তী অবদান বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের বিশাল উপকূলীয় জনগোষ্ঠী যখনই কোনো বড় স্বাস্থ্য সংকটে পড়েছে, নৌবাহিনী তখনই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়:

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও মেডিকেল টিম নিয়ে কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ ও মহেশখালীতে পৌঁছায়। কলেরা ও ডায়রিয়ার মহামারি থেকে লাখো মানুষকে রক্ষা করেছিল নৌবাহিনীর বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্পগুলো।

সিডর ও আইলার পর চিকিৎসা সহায়তা:

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ এবং ২০০৯ সালের ‘আইলা’র পর বাগেরহাট, শরণখোলা ও সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাবে তীব্র স্বাস্থ্য সংকট দেখা দেয়। নৌবাহিনী যুদ্ধজাহাজে করে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নিয়ে গিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন সরবরাহ করে উপকূলবাসীর পাশে দাঁড়ায়।

চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন মাইলফলক:

চিকিৎসা খাতের এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং দেশের চিকিৎসা খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো নেভি মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম (এনএমসিসি)।

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে এই বিশেষায়িত কলেজটি চিকিৎসা শিক্ষার মানচিত্রে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় সমুদ্রের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই আধুনিক ক্যাম্পাসে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি, আধুনিক মেডিকেল সিমুলেশন ল্যাব এবং সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। কলেজটির টিচিং হাসপাতাল হিসেবে কাজ করছে নৌবাহিনীর সুসজ্জিত হাসপাতাল ‘বানৌজা পতেঙ্গা’।

এখানে অধ্যয়ন শেষ করা চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতে বেসামরিক স্বাস্থ্য খাতে কাজ করবেন। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে, যেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই কলেজের স্নাতকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবতার দূত:

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চিকিৎসাসেবার পরিধি কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping Missions) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বেসামরিক নাগরিকদের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

লেবাননে (UNIFIL) সাড়া জাগানো অবদান:

ভূমধ্যসাগরে নিয়োজিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ (যেমন- বানৌজা সংগ্রাম বা আলী হায়দার) কেবল মেরিটাইম ইন্টারডিকশন অপারেশনই চালায় না, বরং লেবাননের স্থানীয় বেসামরিক জনগণের জন্য নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও জরুরি ফার্স্ট-এইড সহায়তা দিয়ে আসছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবানিজদের কাছে বাংলাদেশি নৌ-চিকিৎসকরা আজ এক পরম আশ্রয়ের নাম।

আফ্রিকান মিশনগুলোতে ফিল্ড হাসপাতাল:

দক্ষিণ সুদান বা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ও চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে নৌবাহিনীর মেডিকেল অফিসাররা অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সাথে মিলে লেভেল-২ ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করেন। সেখানে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জটিল অপারেশন, ম্যালেরিয়া ও ইবোলা প্রতিরোধ এবং প্রসূতি মায়েদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

দুর্যোগের দিনগুলোতে ত্রাতা

মাঠপর্যায়ের কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন স্থানীয় সিভিল প্রশাসন ও সাধারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন নৌবাহিনী স্পিডবোট, যুদ্ধজাহাজ এবং হেলিকপ্টার নিয়ে দুর্গমতম এলাকায় পৌঁছে যায়। বিগত বছরগুলোতে তাদের এমন কিছু অর্জন নিচে তুলে ধরা হলো:

ক) ঘূর্ণিঝড় মোখা-পরবর্তী সেন্ট মার্টিন উদ্ধার অভিযান

২০২৩ সালের মে মাসে ক্যাটাগরি-৫ সমতুল্য শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ যখন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন্সে আঘাত হানে, তখন দ্বীপের একমাত্র ১০ শয্যার সরকারি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি মেডিকেল টিম নিয়ে দ্বীপে পৌঁছায় এবং অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে টানা দুই সপ্তাহ ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা দেয়। সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে সরাসরি ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হয়, যার ফলে সেখানে কোনো মহামারি ছড়াতে পারেনি।

খ. খুলনার কয়রা ও দাকোপে মেডিকেল ক্যাম্প (২০২৬)

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে খুলনার উপকূলীয় এবং অত্যন্ত দুর্গম এলাকা কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে নৌবাহিনী একটি দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করে। নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দিনভর ওই অঞ্চলের তিন হাজারের বেশি প্রান্তিক মানুষকে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধসামগ্রী প্রদান করে। উপকূলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অনন্য সুযোগ, কারণ তীব্র লবণাক্ততার কারণে ওই অঞ্চলের নারীরা জরায়ু ও চর্মরোগে সবচেয়ে বেশি ভুগে থাকেন।

সংখ্যায় ও পরিসংখ্যানে নৌবাহিনীর বেসামরিক চিকিৎসাসেবা

নৌবাহিনীর অবদানের গভীরতা অনুধাবন করার জন্য তাদের বার্ষিক সেবামূলক কার্যক্রমের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

সেবার ক্ষেত্র বার্ষিক বেসামরিক সুবিধাভোগী (গড়) স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক প্রভাব 
ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ৫০,০০০+ জন প্রত্যন্ত চর ও দ্বীপাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ
বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ ৬০,০০০+ জন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাস
মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা ১৫,০০০+ জন মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সহায়ক
জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ৫,০০০+ জন মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর

পরিসংখ্যানগত প্রভাব: 

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ তাদের জীবনে অন্তত একবার নৌবাহিনীর স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প কিংবা জরুরি উদ্ধারকালীন চিকিৎসা সহায়তার সরাসরি সুফল ভোগ করেছেন।

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) ও ঘাঁটি হাসপাতালগুলোর অবদান

চট্টগ্রামের বানৌজা ঈসা খান, খুলনার বানৌজা তিতুমীর বা ঢাকার নৌঘাঁটি-সংলগ্ন বিশেষায়িত সামরিক হাসপাতালগুলো কেবল নৌবাহিনীর নিজস্ব সদস্যদের জন্যই নয়, বরং প্রতিরক্ষা খাতের আওতাধীন বেসামরিক কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বিশেষ বিবেচনায় সাধারণ নাগরিকদেরও উন্নত চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে।

নৌবাহিনীর এই হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের পেশাদারত্ব, সুশৃঙ্খল পরিবেশ, নিয়মিত রাউন্ড এবং নিখুঁত ও নির্ভুল ডায়াগনস্টিক সুবিধার কারণে রোগীদের সন্তুষ্টির হার বেসামরিক হাসপাতালের তুলনায় অনেক বেশি লক্ষ্য করা যায়।

সমুদ্রের প্রহরী, মানবতার বন্ধু:

একটি দেশের নৌবাহিনী কেবল যুদ্ধজাহাজ আর কামান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং সংকটের সময়ে তারা সাধারণ জনগণের কতটা আপন হতে পারল, সেটাই তাদের আসল শক্তি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী- ‘বেসামরিক নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মহামারি মোকাবিলায় সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে সামরিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সুশৃঙ্খল সমন্বয় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত- বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের সুশৃঙ্খল চিকিৎসা কাঠামো, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে অনন্য অবদান এবং নেভি মেডিকেল কলেজের মতো স্থায়ী ও দূরদর্শী শিক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এটি প্রমাণ করে চলেছে, তারা কেবল সমুদ্রসীমার দক্ষ রক্ষকই নন, বরং দেশে ও বিদেশে কোটি বেসামরিক মানুষের জীবন বাঁচানোর এক পরম ও নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।

জাতীয় বাজেটে নৌবাহিনীর এই স্বাস্থ্যসেবামূলক খাতকে আরও গতিশীল করতে পারলে উপকূলীয় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে।

লেখক: স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক

অমিয়/