‘শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়’- এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ নৌবাহিনী কেবল দেশের তিন হাজার বর্গমাইলেরও বেশি সমুদ্রসীমা ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) অতন্দ্র প্রহরীই নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যেকোনো সংকটে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক পরম বিশ্বস্ত নাম। গত কয়েক দশকে দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নৌবাহিনী যে অবদান রেখেছে, তা এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সামরিক শৃঙ্খলার সঙ্গে মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে নৌবাহিনী আজ বেসামরিক স্বাস্থ্যসেবায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
গৌরবের উৎস:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নৌবাহিনীর চিকিৎসা সেবার সূচনা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মানবিক ও চিকিৎসাসেবার এই ঐতিহ্য হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি; এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে। ১৯৭১ সালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ধুলিসাৎ করে দিয়েছিলেন বীর নৌ-কমান্ডোরা।
মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ভারতের পলাশ ও পদ্মা নামের দুটি গানবোট এবং বিভিন্ন নদীভিত্তিক ক্যাম্পে নৌ-কমান্ডোদের পাশাপাশি সাধারণ বেসামরিক মানুষ ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো। সীমিত সম্পদ ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও নৌ-কমান্ডোদের চিকিৎসকরা যুদ্ধাহত ও স্থানীয় চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র দুটি গানবোট নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথম থেকেই উপকূলের অবহেলিত মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাকে তাদের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে।
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা:
চিকিৎসা খাতে নৌবাহিনীর পূর্ববর্তী অবদান বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের বিশাল উপকূলীয় জনগোষ্ঠী যখনই কোনো বড় স্বাস্থ্য সংকটে পড়েছে, নৌবাহিনী তখনই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়:
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও মেডিকেল টিম নিয়ে কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ ও মহেশখালীতে পৌঁছায়। কলেরা ও ডায়রিয়ার মহামারি থেকে লাখো মানুষকে রক্ষা করেছিল নৌবাহিনীর বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্পগুলো।
সিডর ও আইলার পর চিকিৎসা সহায়তা:
২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ এবং ২০০৯ সালের ‘আইলা’র পর বাগেরহাট, শরণখোলা ও সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাবে তীব্র স্বাস্থ্য সংকট দেখা দেয়। নৌবাহিনী যুদ্ধজাহাজে করে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নিয়ে গিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন সরবরাহ করে উপকূলবাসীর পাশে দাঁড়ায়।
চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন মাইলফলক:
চিকিৎসা খাতের এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং দেশের চিকিৎসা খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো নেভি মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম (এনএমসিসি)।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে এই বিশেষায়িত কলেজটি চিকিৎসা শিক্ষার মানচিত্রে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় সমুদ্রের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই আধুনিক ক্যাম্পাসে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি, আধুনিক মেডিকেল সিমুলেশন ল্যাব এবং সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। কলেজটির টিচিং হাসপাতাল হিসেবে কাজ করছে নৌবাহিনীর সুসজ্জিত হাসপাতাল ‘বানৌজা পতেঙ্গা’।
এখানে অধ্যয়ন শেষ করা চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতে বেসামরিক স্বাস্থ্য খাতে কাজ করবেন। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে, যেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই কলেজের স্নাতকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবতার দূত:
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চিকিৎসাসেবার পরিধি কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping Missions) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বেসামরিক নাগরিকদের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
লেবাননে (UNIFIL) সাড়া জাগানো অবদান:
ভূমধ্যসাগরে নিয়োজিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ (যেমন- বানৌজা সংগ্রাম বা আলী হায়দার) কেবল মেরিটাইম ইন্টারডিকশন অপারেশনই চালায় না, বরং লেবাননের স্থানীয় বেসামরিক জনগণের জন্য নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও জরুরি ফার্স্ট-এইড সহায়তা দিয়ে আসছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবানিজদের কাছে বাংলাদেশি নৌ-চিকিৎসকরা আজ এক পরম আশ্রয়ের নাম।
আফ্রিকান মিশনগুলোতে ফিল্ড হাসপাতাল:
দক্ষিণ সুদান বা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ও চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে নৌবাহিনীর মেডিকেল অফিসাররা অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সাথে মিলে লেভেল-২ ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করেন। সেখানে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জটিল অপারেশন, ম্যালেরিয়া ও ইবোলা প্রতিরোধ এবং প্রসূতি মায়েদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
দুর্যোগের দিনগুলোতে ত্রাতা
মাঠপর্যায়ের কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন স্থানীয় সিভিল প্রশাসন ও সাধারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন নৌবাহিনী স্পিডবোট, যুদ্ধজাহাজ এবং হেলিকপ্টার নিয়ে দুর্গমতম এলাকায় পৌঁছে যায়। বিগত বছরগুলোতে তাদের এমন কিছু অর্জন নিচে তুলে ধরা হলো:
ক) ঘূর্ণিঝড় মোখা-পরবর্তী সেন্ট মার্টিন উদ্ধার অভিযান
২০২৩ সালের মে মাসে ক্যাটাগরি-৫ সমতুল্য শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ যখন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন্সে আঘাত হানে, তখন দ্বীপের একমাত্র ১০ শয্যার সরকারি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি মেডিকেল টিম নিয়ে দ্বীপে পৌঁছায় এবং অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে টানা দুই সপ্তাহ ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা দেয়। সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে সরাসরি ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হয়, যার ফলে সেখানে কোনো মহামারি ছড়াতে পারেনি।
খ. খুলনার কয়রা ও দাকোপে মেডিকেল ক্যাম্প (২০২৬)
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে খুলনার উপকূলীয় এবং অত্যন্ত দুর্গম এলাকা কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে নৌবাহিনী একটি দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করে। নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দিনভর ওই অঞ্চলের তিন হাজারের বেশি প্রান্তিক মানুষকে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধসামগ্রী প্রদান করে। উপকূলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অনন্য সুযোগ, কারণ তীব্র লবণাক্ততার কারণে ওই অঞ্চলের নারীরা জরায়ু ও চর্মরোগে সবচেয়ে বেশি ভুগে থাকেন।
সংখ্যায় ও পরিসংখ্যানে নৌবাহিনীর বেসামরিক চিকিৎসাসেবা
নৌবাহিনীর অবদানের গভীরতা অনুধাবন করার জন্য তাদের বার্ষিক সেবামূলক কার্যক্রমের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| সেবার ক্ষেত্র | বার্ষিক বেসামরিক সুবিধাভোগী (গড়) | স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক প্রভাব |
| ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প | ৫০,০০০+ জন | প্রত্যন্ত চর ও দ্বীপাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ |
| বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ | ৬০,০০০+ জন | দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাস |
| মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা | ১৫,০০০+ জন | মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সহায়ক |
| জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স | ৫,০০০+ জন | মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর |
পরিসংখ্যানগত প্রভাব:
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ তাদের জীবনে অন্তত একবার নৌবাহিনীর স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প কিংবা জরুরি উদ্ধারকালীন চিকিৎসা সহায়তার সরাসরি সুফল ভোগ করেছেন।
সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) ও ঘাঁটি হাসপাতালগুলোর অবদান
চট্টগ্রামের বানৌজা ঈসা খান, খুলনার বানৌজা তিতুমীর বা ঢাকার নৌঘাঁটি-সংলগ্ন বিশেষায়িত সামরিক হাসপাতালগুলো কেবল নৌবাহিনীর নিজস্ব সদস্যদের জন্যই নয়, বরং প্রতিরক্ষা খাতের আওতাধীন বেসামরিক কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বিশেষ বিবেচনায় সাধারণ নাগরিকদেরও উন্নত চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে।
নৌবাহিনীর এই হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের পেশাদারত্ব, সুশৃঙ্খল পরিবেশ, নিয়মিত রাউন্ড এবং নিখুঁত ও নির্ভুল ডায়াগনস্টিক সুবিধার কারণে রোগীদের সন্তুষ্টির হার বেসামরিক হাসপাতালের তুলনায় অনেক বেশি লক্ষ্য করা যায়।
সমুদ্রের প্রহরী, মানবতার বন্ধু:
একটি দেশের নৌবাহিনী কেবল যুদ্ধজাহাজ আর কামান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং সংকটের সময়ে তারা সাধারণ জনগণের কতটা আপন হতে পারল, সেটাই তাদের আসল শক্তি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী- ‘বেসামরিক নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মহামারি মোকাবিলায় সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে সামরিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সুশৃঙ্খল সমন্বয় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে।’
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত- বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের সুশৃঙ্খল চিকিৎসা কাঠামো, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে অনন্য অবদান এবং নেভি মেডিকেল কলেজের মতো স্থায়ী ও দূরদর্শী শিক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এটি প্রমাণ করে চলেছে, তারা কেবল সমুদ্রসীমার দক্ষ রক্ষকই নন, বরং দেশে ও বিদেশে কোটি বেসামরিক মানুষের জীবন বাঁচানোর এক পরম ও নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।
জাতীয় বাজেটে নৌবাহিনীর এই স্বাস্থ্যসেবামূলক খাতকে আরও গতিশীল করতে পারলে উপকূলীয় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে।
লেখক: স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক
অমিয়/