জুলাই আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরায় উজ্জীবিত করছে। স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস পুনঃপাঠের প্রয়োজনীয়তা এতে সামনে এসেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে স্বাধীনতা ও এর বিরোধী শক্তি চিহ্নিত হয়েছে। সাড়ে পাঁচ দশক পর চেনা গেছে প্রকৃত শত্রু-মিত্র। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন জরুরি ছিল। এটি মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত বাংলাদেশ নির্মাণে বড় পাথেয়।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অপশক্তির অপতৎপরতা বেড়েছে। তারা পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানছে। মব তৈরি করে বাউলদের ওপর হামলা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতাসহ মাজার-মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। অন্যদিকে কাওয়ালি গানের আড়ালে চলছে ভিন্ন সংস্কৃতি চর্চা। নিজেদের ‘বাংলাদেশপন্থি’ দাবি করলেও তারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করছে। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধকে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ বলে প্রচার করছে।
দীর্ঘদিন স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঘাপটি মেরে ছিল। কখনো জাতীয় পার্টি, কখনো ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আবার কখনো বিএনপির আশ্রয়ে তারা হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পর তারা প্রকাশ্যে আসে। গত সাড়ে পাঁচ দশক ছদ্মবেশে থাকায় এদের চেনা কঠিন ছিল। সাধারণ মানুষ তাদের কূটকৌশল ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে তারা এখন দৃশ্যমান। বর্তমানে কে বাংলাদেশপন্থি আর কে স্বাধীনতাবিরোধী, তা এখন স্পষ্ট। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণ এখন সচেতন। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছে। জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা ও বাংলাদেশের নাম পরিবর্তনের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। শহিদ ও বীরাঙ্গনার সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এই গোষ্ঠী বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ভাষা আন্দোলন ও দেশের সংস্কৃতি স্বীকার করে না। তারা সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চায়।
জুলাই আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী। ছাত্র-জনতার সঙ্গে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের শাসনের পতন ঘটে। এটি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের একার কৃতিত্ব নয়। আন্দোলনে বাম প্রগতিশীল দলসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বহু সংগঠন ও ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে এখন সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সব কৃতিত্ব ছিনতাইয়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা নতুন বয়ান সামনে এনেছে। দাবি তুলেছে, ‘জুলাই আন্দোলন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে’। এই সুযোগে তারা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করছে। জুলাইকে মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। তারা গণ-অভ্যুত্থানকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে প্রচার করছে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ওই হারানো আদর্শ পুনরুদ্ধারের লড়াই। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বিভেদ তৈরি করতে চাইলেও নতুন প্রজন্ম অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। তারা চায় বৈষম্যহীন সমাজ। এই রাষ্ট্রসংস্কার মূলত একাত্তরের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার মহৎ উদ্যোগ। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও চব্বিশের আকাঙ্ক্ষাকে এক সুতায় বাঁধতে হবে। অপশক্তির অপপ্রচার রুখতে কেবল আবেগ নয়। যুক্তিনির্ভর দেশপ্রেমই হোক আমাদের প্রধান হাতিয়ার।
গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দেড় সহস্রাধিক ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়। এসব নাশকতায় জড়িত ছিল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ মেনে নিতে পারে না। একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি থেকে তারা এর প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করে।
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্ব। এই ইতিহাস মুছে ফেলা অসম্ভব। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত আসায় তা আরও শানিত ও সংগঠিত হয়েছে। অস্তিত্ব রক্ষায় এই অপশক্তির বিরুদ্ধে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর দেশি আগাছা উপড়ে ফেলে সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পথে ফিরছেন। ইতিহাসের ওপর যত আঘাত আসবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তত শক্তিশালী হবে। জুলাই আন্দোলনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখছে। এতে নতুন প্রজন্ম উজ্জীবিত হচ্ছে। আবারও তৈরি হবে একাত্তরের চেতনার গণজাগরণ।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী