৩ জুন ‘বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস’ বা বিশ্ব মুগুর পা দিবস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের রূপকার, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন ড. ইগনাচিও পনসেটি-এর জন্মদিনকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ড. পনসেটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন, যা কোনো ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই মুগুর পা বা ক্লাবফুট সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলতে সক্ষম। বর্তমানে সারা বিশ্বে এই পদ্ধতিটি ‘পনসেটি মেথড’ বা পনসেটি পদ্ধতি নামে সমাদৃত।
এ দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো— ক্লাবফুট সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ভ্রান্ত ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিটি আক্রান্ত শিশুর জন্য সঠিক ও সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
২০২৬ সালের বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসের বৈশ্বিক চেতনার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদেরও মূল লক্ষ্য হলো— কোনো শিশু যেন চিকিৎসার অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ না করে এবং কোনো মাকে যেন এই জন্মগত ত্রুটির কারণে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা।
দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে, বিশেষ করে ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে সমাজের অনেক গভীর ও করুণ বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। জন্মগত মুগুর পা বা ক্লাবফুট নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম দেশে বহুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারকে বাস্তব জীবনে যে ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা আজও অত্যন্ত করুণ এবং হতাশার।
আমি আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি— ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুটির পরিবারের আর্থিক অবস্থা যদি বেশ সচ্ছল ও বিত্তশালী হয়, তবে এই শারীরিক ত্রুটিটি তাদের জীবনে তেমন কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। কারণ, তারা দ্রুত উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুটিকে সুস্থ করে তোলেন। কিন্তু এর বিপরীতে, পরিবারটি যদি আর্থিকভাবে অনটন আর অভাবের দুষ্টচক্র দ্বারা আবর্তিত থাকে, তবে তাদের কষ্ট আর বঞ্চনার কোনো সীমা থাকে না। দারিদ্র্যের কশাঘাতের সঙ্গে যখন সামাজিক কুসংস্কার যুক্ত হয়, তখন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।
সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের এবং ব্যথিত হওয়ার বিষয় হলো— আমাদের সমাজে শুধুমাত্র ক্লাবফুট আক্রান্ত বাচ্চা প্রসব করার অপরাধে (!) দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ নেমে আসে। একটি জন্মগত ত্রুটির জন্য সম্পূর্ণভাবে মাকে দোষারোপ করা হয় এবং তাকে কলঙ্কিত করা হয়।
আমরা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের কথা বলছি; আমরা মনে করি এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, ইন্টারনেটের যুগ। মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনেক প্রশ্নের সমাধান এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক ক্লিকেই জুটে যায়। অথচ, এত কিছুর পরও আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ অনেক কুসংস্কার আর বদ্ধমূল ধারণার দাস হয়ে আছে। এই তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগেও আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বুকের ভেতরের চাপা কান্নাগুলো যেন অনেকাংশেই অব্যক্ত থেকে যায়। পেশাগত কারণে যখন আমি তাদের মনের কষ্টের কথাগুলো জানতে চাই, তখন অনেকেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তারা জানান, সমাজের মানুষ, এমনকি তাদের নিজ পরিবারের সদস্যরাও আজও মনে করেন— এটি মায়ের কোনো পাপ বা বাবার কোনো খারাপ কাজের ফল!
মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় আমরা যখন ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বিভিন্ন চিকিৎসাতথ্য ও ইতিহাস সংগ্রহ করি, তখন এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে।
দেখা যায়, একজন মা তার গর্ভকালীন সময়ে অত্যন্ত নিয়ম মেনে চলেছেন। তিনি গর্ভকালীন পরিচর্যার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছেন, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেয়েছেন এবং তার গর্ভাবস্থায় কোনো ধরনের বড় জটিলতাও ছিল না। তারপরও তার গর্ভের সন্তানটি ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। আবার এমন ঘটনাও দেখেছি যে, একজন মায়ের তিনটি সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানটি ক্লাবফুট আক্রান্ত হয়ে জন্মেছে, দ্বিতীয় সন্তানটি সম্পূর্ণ সুস্থভাবে জন্মেছে, কিন্তু তৃতীয়বার যখন তিনি আবার সন্তান প্রসব করেছেন, তখন সেই সন্তানটিও আবার ক্লাবফুটে আক্রান্ত হয়েছে।
এ ঘটনাগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানাটা আমাদের সবার জন্যই জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ বলছে, মুগুর পা বা ক্লাবফুট মূলত একটি জন্মগত কাঠামোগত ত্রুটি (কনজেনিটাল ডিফরমিটি)। বিশ্বব্যাপী প্রতি এক হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে গড়ে এক থেকে দুজন শিশু এই ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর কয়েক হাজার শিশু এই সমস্যা নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখে। এর সুনির্দিষ্ট কোনো একক কারণ আজও বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ইডিওপ্যাথিক’।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত এবং গর্ভকালীন পরিবেশগত কিছু অজানা কারণের সংমিশ্রণে এ সমস্যাটি তৈরি হয়। পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে এটি হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। তাই প্রথম ও তৃতীয় সন্তানের ক্লাবফুট হওয়া এবং মাঝের সন্তানের সুস্থ থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ জিনগত বিন্যাসের একটি স্বাভাবিক গাণিতিক সম্ভাবনা মাত্র। এর সঙ্গে মায়ের খাদ্যাভ্যাস, তার কোনো কাজ বা কল্পিত কোনো ‘পাপ’-এর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু আমাদের সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা এই অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণাগুলোর সঙ্গে যখন পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপড়েন যুক্ত হয়, তখন ওই মা ও শিশুর দুর্দশার যেন কোনো শেষ থাকে না। এ অন্ধকার দূর করার লক্ষ্যেই আমরা ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে আধুনিক চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করছি। সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে বদ্ধমূল ধারণা ও কুসংস্কারগুলো রয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে আমরা তথ্যভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ প্রদান করছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষের ভেতরের এই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিয়ে একটি সহানুভূতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।
তবে আজও আমাদের খুব আক্ষেপের সঙ্গে লক্ষ করতে হয় যে, ক্লাবফুটকে এখনও গ্রামাঞ্চলে একটি ‘অভিশাপ’ হিসেবেই দেখা হয়। আমরা নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি, একটি মাকে অকারণে কলঙ্কিত করার এই যে নিষ্ঠুর সামাজিক রীতি— তা যেন চিরতরে বদলে যায়। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই যে— ক্লাবফুট কোনো অভিশাপ নয়, এটি কেবলই একটি নিরাময়যোগ্য জন্মগত ত্রুটি।
এই ত্রুটি নিরাময়ে বর্তমানে ‘পনসেটি পদ্ধতি’ ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এটি একটি অত্যন্ত সহজ, নিরাপদ এবং শতভাগ কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে কোনো বড় সার্জারির প্রয়োজন হয় না; বরং ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি প্লাস্টার (কাস্টিং) এবং পরবর্তীতে একটি বিশেষ জুতো বা ব্রেস ব্যবহারের মাধ্যমে বাঁকা পা সম্পূর্ণ সোজা ও স্বাভাবিক করে তোলা যায়। তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি যেটি প্রয়োজন, সেটি হলো— সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা। জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব (সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে) শিশুকে নিকটস্থ ক্লাবফুট ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে ফলাফল সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়।
আর এ দ্রুত চিকিৎসার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা। সেই সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে যারা কাজ করছেন, সেসব স্বাস্থ্যকর্মীদের (যেমন: পরিবার কল্যাণ সহকারী, স্বাস্থ্য সহকারী ও কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোভাইডার) একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি। তারা যেহেতু সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের সঙ্গে কাজ করেন, তাই জন্মের পরপরই যদি তারা কোনো শিশুর পায়ের পাতায় সন্দেহজনক বাঁকাভাব বা ক্লাবফুটের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন, তবে যেন কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাকে সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করেন।
একটি সুস্থ, সুন্দর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আসুন, ৩ জুন বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসে আমরা এই শপথ নিই— বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের প্রসার ঘটিয়ে আমরা সমাজের সব কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে দেব। কোনো মা যেন আর অকারণে চোখের জল না ফেলেন এবং প্রতিটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু যেন সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনের অধিকারী হতে পারে, তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
লেখক: সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক। ই-মেইল: [email protected]