ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করবেন যেভাবে

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ২৫ মে ২০২৪, ১২:০৬ পিএম
মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করবেন যেভাবে
মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করার ছবি

মুসাফাহা আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো করমর্দন বা হাতে হাত মেলানো। কারও সঙ্গে সাক্ষাৎকালের প্রথম কাজ হলো সালাম আদান-প্রদান করা। এরপর দুই হাত মিলিয়ে মুসাফাহা করার মাধ্যমে সালামকে পরিপূর্ণ করা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সালামের পরিপূর্ণতা হলো মুসাফাহা।’ (তিরমিজি, ২৭৩০) আতা ইবনে আবি মুসলিম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে (একে অপরের সাথে) মুসাফাহা করো, এর দ্বারা তোমাদের প্রতিহিংসা দূর হয়ে যাবে।’ (মুয়াত্তা মালেক, ১৬১৭) 

মুসাফাহা করার দ্বারা গুনাহ মাফ হয়। বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেছেন, ‘পরস্পর সাক্ষাতে দুই মুসলমান যখন মুসাফাহা করে, পৃথক হওয়ার আগেই তাদের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (তিরমিজি, ২৭২৭)

মুসাফাহা করার সুন্নাহ পদ্ধতি: উভয় হাত দিয়ে মুসাফাহা করা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘(মুসাফাহার সময়) আমার হাতটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই হাতের মধ্যে ছিল।’ (বুখারি, ৫/২৩১১)

অপর ব্যক্তি হাত না ছাড়া পর্যন্ত হাত না ছাড়া: ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)  যখন কাউকে বিদায় দিতেন, তখন তার হাত ধরে মুসাফাহা করতেন এবং ওই ব্যক্তি হাত সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত তিনি (নবিজি) নিজের হাত সরিয়ে নিতেন না।’ (তিরমিজি, ৩৪৪২)

আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদসহ মাগফিরাতের দোয়া পাঠ করা: বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেছেন, ‘যখন দুইজন মুসলিমের সাক্ষাৎ হয় এবং তারা একে অপরের সঙ্গে মুসাফাহা করার সময় আল্লাহতায়ালার প্রশংসা করে এবং আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করে—আল্লাহতায়ালা উভয়কে মাগফিরাত দান করেন।’ (আবু দাউদ, ৫১৬৯) সুতরাং মুসাফাহা করার সময় প্রশংসা ও দরুদ পাঠের পাশাপাশি ক্ষমা দোয়া কামনা করা উচিত। এই দোয়াটি পাঠ করা যেতে পারে—বাংলা উচ্চারণ: ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম। বাংলা অর্থ: আল্লাহতায়ালা আমাদের সকলকে ক্ষমা করুন।

মুসাফাহার সময় ক্ষমার দোয়া করার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। উল্লিখিত যে দোয়াটি পাঠের প্রচলন রয়েছে, হুবহু সেটা রাসুলুল্লাহ (সা.)  পাঠ করতেন—এমনটা প্রমাণিত নয়। তবে এই দোয়াটি যেহেতু হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ক্ষমা কামনায় প্রতিনিধিত্ব করে, সুতরাং এই দোয়াটি মুসাফাহা করার সময় পাঠ করায় কোনো অসুবিধা নেই। তবে মুসাফাহা করার সময় হাতে ঝাঁকি দেওয়া এবং মুসাফাহা শেষে বুকের সঙ্গে হাত মেলানোর প্রয়োজন নেই।

নারীদের সঙ্গে মুসাফাহা না করা: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তবে তিনি কথার মাধ্যমে নারীদের বাইয়াত গ্রহণ করতেন।’ (বুখারি, ৬৭৮৮; মুসলিম, ১৮৬৬)

আনাজা গোত্রের এক ব্যক্তি আবু জর (রা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আপনাদের দেখা হলে তিনি কি আপনাদের সঙ্গে মুসাফাহা করতেন? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, যখনই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আমার দেখা হতো; তিনি আমার সঙ্গে মুসাফাহা করতেন। একদিন তিনি আমার কাছে লোক পাঠালেন। আমি তখন বাড়িতে ছিলাম না। আমি ফিরে এলে জানানো হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)  আমার কাছে লোক পাঠিয়েছেন। এরপর আমি যখন তাঁর কাছে হাজির হলাম। তখন তিনি গদির ওপর ছিলেন। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তা ছিল খুবই উত্তম ও মনোরম।’ (আবু দাউদ, ৫২১৪) 
মুয়ানাকাও আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো কোলাকুলি করা। অপরের গর্দানের সঙ্গে গর্দান লাগিয়ে জড়িয়ে ধরা। গর্দানের সঙ্গে গর্দান লাগিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরাকে ইসলামি পরিভাষায় মুয়ানাকা বলা হয়। (লিসানুল আরাব, ১০/২৭২)
দীর্ঘদিন পর একে অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে পরস্পরে মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করা সুন্নত। দীর্ঘদিন পর কেউ সফর থেকে এলে দেখা-সাক্ষাতে সাহাবারা মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) যখন মদিনায় এলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  তখন আমার ঘরে ছিলেন। জায়েদ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আমার ঘরে এলেন এবং দরজায় টোকা দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)  তার পরিধেয় কাপড় ঠিক করতে করতে উঠে গিয়ে জায়েদের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন এবং আদর করে চুমু খেলেন। (তিরমিজি, ২৭৩২)

মুয়ানাকা করার সুন্নাহ পদ্ধতি: একবার মুয়ানাকা করা; তিনবার নয়। মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করার সুন্নত পদ্ধতি হলো, একে অপরের ডান দিকের ঘাড়ের সঙ্গে ঘাড় মেলানো এবং বুকের সঙ্গে বুক মিলানো। মুয়ানাকা শুধু একবার করতে হয়। তিনবার করার কোনো বর্ণনা হাদিস বা ফিকহের কোনো কিতাবে উল্লেখ নেই। (আহসানুল ফাতাওয়া, ৯/৭৭) 

মুয়ানাকার দোয়া পড়া: মুয়ানাকা করার সময় নিচের দোয়াটি পড়া সুন্নত। বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা জিদ মুহাব্বাতি লিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি।  বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আল্লাহ এবং রাসুলের খাতিরে আমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করে দিন। (জামেউস সুনান, ১৫৯)
মুয়ানাকা বা কোলাকুলি শেষে আদর বা স্নেহ করে চুমু খাওয়া: কপালে চুমু খাওয়ার কথা এসেছে। যেমনটা জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) কথা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন। তবে  এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো, কপালে বা গালে অথবা হাতে চুমু খাওয়া ওই ব্যক্তির জন্য জায়েজ, যিনি মনের কামনা-বাসনার আশঙ্কা থেকে পবিত্র। যাকে চুমু খাবেন বা আদর করবেন, তিনিও এমন আশঙ্কা না থাকবেন। (রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৪৬; মাবসুত, ১০/ ১৪৯)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

কোরবানির দিন নিয়ে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ০৭:৩২ পিএম
কোরবানির দিন নিয়ে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে
কোরবানির পশু ও ইংরেজিতে ঈদুল আজহা লেখা ছবি। ফ্রিপিক

কোরবানির দিনের এক নাম শ্রেষ্ঠ হজের দিন। যে দিনে হাজিরা তাদের পশু জবাই করে হজকে পূর্ণ করেন। ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির দিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কোন দিন?’ সাহাবিরা উত্তর দিলেন, ‘কোরবানির দিন।’ তিনি বললেন, ‘এটা হলো শ্রেষ্ঠ হজের দিন।’ (আবু দাউদ, হাদিস, ১৯৪৫)

কোরবানির দিন বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দিবসসমূহের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো কোরবানির দিন। এরপর এর পরের তিনদিন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৭৬৫)
 
কোরবানির দিন ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ। কেননা এ দিনটি বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনে ঈদের নামাজ ও কোরবানি একসঙ্গে আদায় করা হয়। যা ঈদুল ফিতরের নামাজ ও সদকাতুল ফিতরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাওসার দান করেছেন। এর শুকরিয়া আদায়ে তিনি তাঁকে এ দিনে কোরবানি ও নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। 

ঈদুল আজহার দিনে অন্যতম ফজিলতপূর্ণ কাজ হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কোরবানি করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহতায়ালার কাছে অধিক প্রিয় নয়। কেয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহতায়ালার কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩)

তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না, তার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর ধমকি এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১২৩)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

হাসিল ছাড়া পশু কিনলে কোরবানি আদায় হবে?

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ০৯:১৯ এএম
হাসিল ছাড়া পশু কিনলে কোরবানি আদায় হবে?
গরুর হাটের ছবি। ইন্টারনেট

কোরবানি ত্যাগ ও প্রেমময় এক ইবাদত। ইসলামের নিদর্শন। সামর্থ্যবান নারী-পুরুষের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানির অন্যতম শর্ত হালাল উপার্জন থেকে কোরবানি করতে হবে। আল্লাহ হারাম গ্রহণ করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বৈধ ও হালাল জীবিকার ইবাদত ছাড়া কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে উঠানো হয় না।’ (বুখারি, হাদিস: ১৩৪৪)

ইসলামের এই বিশেষ ইবাদতের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ঈদের বেশ কিছু দিন আগেই বিভিন্ন স্থানে জমে পশুর হাট। হাট যারা পরিচালনা করেন, তারা হাটের ভাড়া হিসেবে বিক্রীত পশুপ্রতি কিছু অর্থ নির্ধারণ করেন—যাকে হাসিল বলা হয়। হাসিল মূলত হাট আয়োজকদের হক। হাসিল না দিলে কোরবানি হবে না; এ ধরনের কথা সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এ কথা সঠিক নয়। 

কোরবানি হাককুল্লাহ তথা আল্লাহর হক। পশুর নির্ধারিত মূল্য বিক্রেতাকে পরিশোধ করার পর এর সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে হয়ে যায়। আর হাসিল হচ্ছে হাককুল ইবাদ তথা বান্দার হক। কোরবানি কবুল হওয়া না হওয়ার সাথে এর সম্পর্ক নেই। তবে হাসিল পরিশোধ করা জরুরি।  

কারও কারও মধ্যে এই হাসিল আদায়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদাসীনতা দেখা যায়। কেউ যদি হাসিল আদায় না করে তা হলে সে গুনাহগার হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করেছে সে যেন তার থেকে আজই ক্ষমা চেয়ে নেয়, তার ভাইয়ের জন্য তার কাছ থেকে নেকি কাটার আগে। কেননা সেখানে (হাশরের ময়দানে) কোনো দিনার বা দিরহাম পাওয়া যাবে না। তার কাছে যদি নেকি না থাকে, তবে তার (মাজলুম) ভাইয়ের গুনাহ এনে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫৩৪)

লেখক: আলেম ও মাদরাসা শিক্ষক

 

কোরবানির পশুতে শরিকের বিধান

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১২ জুন ২০২৪, ০৭:২৪ পিএম
কোরবানির পশুতে শরিকের বিধান
গরুর ছবি। ইন্টারনেট

কোরবানি শুধু আল্লাহর জন্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য নিয়তে কোরবানি করলে আল্লাহর কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। একটি পশু একজনে কোরবানি দেওয়া যাবে, গরু, মহিষ ও উটে শরিকে দেওয়া যাবে। তবে শরিকি কোরবানির ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।

কোন পশু ক’জন মিলে কোরবানি দিতে পারবে?
ছাগল, ভেড়া, দুম্বা শুধু একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যাবে। এমন একটি পশু দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে কোরবানি করলে কারও কোরবানিই হবে না। উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক শরিক হলে কারও কোরবানিই হবে না। (ফতোয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৪৯; বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২০৭-২০৮)

জাবের (রা.) বলেন, ‘আমরা হজের ইহরাম বেঁধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বের হলাম। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে একটি গরু এবং একটি উটে সাতজন করে শরিক হওয়ার নির্দেশ করলেন।’ (মুসলিম, ১৩১৮/৩৫১)

শরিকানায় অংশ ও শরিকদের যেমন হওয়া চাই
সাতজনে মিলে কোরবানি করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। (যেমন, কারও আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ)। এমন হলে কোনো শরিকের কোরবানি সঠিক হবে না। তেমনিভাবে কোরবানি করতে হবে সম্পূর্ণ হালাল সম্পদ থেকে। হারাম টাকা দিয়ে কোরবানি করা সঠিক নয় এবং এক্ষেত্রে অন্য শরিকদের কোরবানিও আদায় হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২০৭)

শরিক নির্বাচনে সতর্কতা জরুরি 
সব অংশীদারের নিয়ত কোরবানির জন্য হতে হবে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; কিন্তু পৌঁছায় তোমাদের অন্তরের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭) তাই যদি কেউ আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে নিছক গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করে, তা হলে তার কোরবানি সহিহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরিকদের কারোরই কোরবানি আদায় হবে না। সুতরাং খুব সতর্কতার সঙ্গে শরিক নির্বাচন করা চাই। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২০৮)

একা কোরবানির নিয়তে পশু কিনে পরে শরিক করার বিধান
যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কোরবানি দেওয়ার নিয়তে ক্রয় করে আর সে ধনী হয়, তা হলে তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরিক করা জায়েজ। তবে এতে কাউকে শরিক না করে তার একা কোরবানি করাই উত্তম। শরিক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরিব হয়, যার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়, তা হলে যেহেতু কোরবানির নিয়তে পশুটি ক্রয় করার মাধ্যমে লোকটি তার পুরোটাই আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তাই তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরিক করা জায়েজ নয়। যদি শরিক করে, তা হলে ওই টাকা সদকা করে দেওয়া জরুরি। আর কোরবানির পশুতে কাউকে শরিক করতে চাইলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিতে হবে। (ফতোয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৫০-৩৫১; বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২১০)

জবাইয়ের আগে শরিকের মৃত্যু হলে করণীয় 
জবাইয়ের আগে কোনো শরিকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি করার অনুমতি দেয়, তা হলে তা জায়েজ হবে। নইলে ওই শরিকের টাকা ফেরত দিতে হবে। সেক্ষেত্রে তার স্থলে অন্যকে শরিক করা যাবে। (আদ্দুররুল মুখতার, ৬/৩২৬)

কোরবানির পশুতে আকিকা ও হজের নিয়ত 
কোরবানির পশুতেই আকিকা ও হজের কোরবানির নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় হয়ে যাবে। এমন পশু হারাম এলাকায় জবাই করতে হবে। অন্যথায় হজের কোরবানি আদায় হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২০৯)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত দেওয়া যাবে?

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ১২ জুন ২০২৪, ০৯:৩৪ এএম
পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত দেওয়া যাবে?
গোশতের ছবি। ইন্টারনেট

কোরবানি মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি। সামর্থ্যবানদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘অতএব আপনি আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩)

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ১০ বছর অবস্থানকালে প্রতিবছরই কোরবানি করতেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৫০৭)

কোরবানি করতে হয় আল্লাহর জন্য। আল্লাহকে খুশি করার জন্য। আল্লাহতে পূর্ণাঙ্গ সমর্পণের দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ ফুটে ওঠে। কোরবানিতে গোশত খাওয়া কিংবা লোক দেখানোর নিয়ত করা যাবে না। এগুলো করলে কোরবানি হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘কোরবানির গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; বরং কোরবানির মধ্য দিয়ে তোমাদের তাকওয়া-পরহেজগারী বা আল্লাহভীতিই তাঁর কাছে পৌঁছায়।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৯)

কোরবানির পশু জবাই বা কোরবানির পশুর গোশত ছাড়িয়ে এর বিনিময় বা পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ আছে। তবে কোরবানির পশুর কোনো অংশ, অর্থাৎ পশুর গোশত, চর্বি বা অন্য কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে নেওয়া বা দেওয়া জায়েজ হবে না। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ৪/৪৫৪; বাদায়েউস সানায়ে ৪/৩২)

কোরবানির পশুর যেকোনো অংশ—গোশত, চর্বি, হাড্ডি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েজ নয়। তবে বিক্রি করলে সেই অর্থ নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৮১)

আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে তাঁর (কোরবানির উটের) আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। তিনি কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া ও আচ্ছাদনের কাপড় সদকা করতে আদেশ করেন এবং এর কোনো অংশ কসাইকে দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে (তার পারিশ্রমিক) নিজের পক্ষ থেকে দেব।’ (বুখারি, ১/২৩২)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

 

কোরবানির সঙ্গে আকিকা দেওয়া যাবে?

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৪, ০৭:৫৪ পিএম
কোরবানির সঙ্গে আকিকা দেওয়া যাবে?
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত একজন শিশু ও একটি ছাগলের ছবি।

সন্তান মানুষের জন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নেয়ামত। সন্তান জন্মের পর পশু জবাই দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা হয়। এটাকে আকিকা বলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নাতিদের আকিকা করেছেন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে আকিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি সন্তানের আকিকা করার ইচ্ছা করে, সে যেন তা পালন করে। ছেলের জন্য সমমানের দুটি ছাগল। আর মেয়ের জন্য একটি।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৯৬১)

অন্য হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সন্তানের সঙ্গে আকিকার বিধান রয়েছে। তোমরা তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত করো (অর্থাৎ পশু যবাই করো) এবং সন্তানের শরীর থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (চুল) দূর করে দাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৪৭২)

সন্তান ভূমিষ্ঠের সপ্তম দিন আকিকা করা উত্তম। তবে যদি কেউ কারণবশত সপ্তম দিন না করতে পারে, তবে পরবর্তী সময়ে যেকোনো দিন আদায় করতে পারবে। সন্তানের বাবা বা তার অনুপস্থিতিতে অন্য যে থাকেন, তিনিই আকিকা করবেন। উম্মে কুরজ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ছেলের জন্য এক ধরনের দুটি বকরি এবং মেয়ের জন্য একটি বকরি আকিকা করবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ২৮৩৪)

মালেকি ও শাফি মাজহাবের মতে, কোরবানির পশুর সঙ্গে আকিকা দেওয়া জায়েজ নয়। তারা বলেন, আকিকা ও কোরবানি উভয়টি সত্তাগতভাবে উদ্দিষ্ট। দুটির কারণও আলাদা। এ কারণে একটি অপরটির পক্ষ থেকে জায়েজ হবে না। যেভাবে ফিদিয়ার দম (পশু) তামাত্তু’র দমের (পশু) স্থলাভিষিক্ত হয় না। হাইতামি বলেন, আমাদের মাজহাবের আলেমদের কথা হলো, যদি একটি ভেড়া দিয়ে কোরবানি ও আকিকার নিয়ত করা হয়, তা হলে দুইটার কোনোটায় আদায় হবে না। যেহেতু এ দুটির প্রত্যেকটি উদ্দিষ্ট সুন্নত।’ (তুহফাতুল মুহতাজ শারহুল মিনহাজ, ৯/৩৭১)

হানাফি মাজহাব ও ইমাম আহমদের একটি মত অনুযায়ী, কোরবানির সঙ্গে আকিকা করা বৈধ। এই ফতোয়াই আমাদের দেশে প্রচলিত। তারা বলেন, পশু জবাই করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা উদ্দেশ্য। তাই একটি অপরটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যেমনিভাবে তাহিইয়াতুল মসজিদ (মসিজদে প্রবেশের নামাজ) ফরজ নামাজের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৬; হাশিয়াতুত তহতাভি আলাদ্দুর, ৪/১১৬)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক