আরবি প্রথম মাস মুহাররম। মুহাররম অর্থ সম্মানিত। আল্লাহতায়ালার কাছে সম্মানিত চার মাসের একটি মুহাররম। এ মাসের দশ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ। যুগে যুগে বহু স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে এই দিনে। প্রথম মানুষ ও নবি আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয় এই দিনে। এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। আবার জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। বহু ইতিহাস রচিত হয়েছে আশুরার দিনে। এই যেমন—ইবরাহিম (আ.)-এর জন্ম। নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তিলাভ। প্লাবন শেষে নুহ (আ.)-এর নৌকা যুদি পাহাড়ে অবস্থান। এই আশুরাতেই মুসা (আ.) আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ লাভ করেন। ফেরাউন ও তার দলবল নীল দরিয়ায় ডুবে মরেছিল। (বুখারি, ৩৩৯৭, মুসলিম, ১১৩৯)।
পবিত্র আশুরার অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো রাসুল (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা)-এর কারবালায় সপরিবারে শাহাদাতবরণ। হুসাইন (রা.) মহানবি (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্রই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর আদর্শের প্রতীক। আল্লাহতায়ালার রহমতে সিক্ত ও বিজয়ের রঙে রঙিন এই আশুরা মুমিনদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনে রয়েছে বিশেষ আমল।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মহানবি (সা.) যখন হিজরত করে মদিনায় পৌঁছেন, তখন তিনি দেখলেন মদিনার ইহুদি সম্প্রদায় আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আশুরার দিনে তোমরা রোজা রেখেছ কেন? তারা উত্তর দিল, এই দিনটি অনেক বড়। এই পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। আর ফেরাউন ও তার বাহিনীকে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন। তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করি। তাদের উত্তর শুনে নবি (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি হকদার। অতঃপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং উম্মতকে তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।’ (বুখারি, ৩৩৯৭)
আশুরার রোজার দ্বারা বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজার দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে বিগত বছরের গুনাহ মাফের আশা রাখি।’ (ইবনে মাজাহ, ১৭৩৮)
দশই মুহাররম বা আশুরার দিন ইহুদিরাও রোজা রাখে। তাই নবিজি আশুরার রোজার সঙ্গে আরও একটি রোজা রাখতে বলেছেন। ইমাম শাফি ও তাঁর সাথিরা, ইমাম আহমাদ, ইমাম ইসহাক প্রমুখ বলেছেন, ‘আশুরার রোজার ক্ষেত্রে দশম ও নবম উভয় দিনের রোজাই মুস্তাহাব। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) দশ তারিখ রোজা রেখেছেন এবং নয় তারিখ রোজা রাখার নিয়ত করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তোমরা ৯ ও ১০ (এই দুই দিন) রোজা পালন করো এবং (এক্ষেত্রে) ইহুদিদের বিপরীত করো।’ (তিরমিজি, ৭৫৫)
অনেকে কারবালার ঘটনাকে স্মরণ করে মর্সিয়ায় ডুবে থাকে। ‘হায় হোসাইন, হায় হোসাইন’ বলে মাতম করে। নিজেকে রক্তাক্ত করে। এতে কোনো উপকার নেই; বরং গুনাহ হয়। শোকে বিলাপ করা, কাপড় ছেঁড়া, শরীর ক্ষত-বিক্ষত করা, আনুষ্ঠানিক শোক মিছিল ও শোক দিবস পালন করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আমাদের করণীয় হলো নফল রোজা ও নামাজের মাধ্যমে দোয়া করা। নিজের ও পুরো মুসলিম জাহানের কল্যাণ কামনা করা। (বুখারি, ১২৯৬)।
এছাড়া এ দিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক ভিত্তিহীন কথারও প্রচলন রয়েছে। যেমন—এদিন ইউসুফ (আ.) জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, ইয়াকুব (আ.) চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন, ঈসাকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অনেকে বলে থাকেন, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। (আল আসারুল মারফুয়া, ৬৪/১০০)
লেখক: ইমাম ও খতিব, কসবা জামে মসজিদ