ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ভয়ভীতি দেখিয়ে নারী-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ: ভারতের মানবাধিকার সংগঠন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পুশইন করছে: জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি হবিগঞ্জে বজ্রপাতে ৩ জনের মৃত্যু, আহত ৩ নিয়মের তোয়াক্কা নেই, সড়কে বেপরোয়া ডিএসসিসির ডাম্পট্রাক চার দিনের সফরে বেইজিং গেছেন তথ্যমন্ত্রী কক্সবাজারে মানবপাচার চক্রের মূলহোতা ছৈয়দুল হক আটক ডিক্যাব ও বাংলাদেশ চীন আপন মিডিয়া ক্লাবের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই শরীয়তপুরে মব করে প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলা এনসিটিবিসহ চার শিক্ষা বোর্ডে নতুন নেতৃত্ব স্বপ্নে গান শোনা আসলে কীসের ইঙ্গিত? ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে ছিনতাই, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জেট ফুয়েলের দাম লিটারে কমল ১৫ টাকা চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চালক-এনসিপি কর্মীদের মারামারি গ্রীন চট্টগ্রাম গড়তে লাগানো হচ্ছে ১০ লাখ গাছ চসিকের সড়ক ও ফুটপাত থেকে দেড় শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ মনপুরায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখা নিয়ে উত্তেজনা জ্বালানির মজুদ সম্প্রসারণ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণসহ ১২ দফা সুপারিশ সংসদীয় কমিটির ঢামেক ও চমেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি, ৬ দফা দাবি ভোলায় মিতু হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক, ওসিকে তলব বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল কুমিল্লায়  ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে ৪৫ জন আটক; ৫ বাস-মাইক্রো জব্দ গোয়েন্দারা কেন প্রকাশ্যে আসছেন? শিশুদের নাটক ‘ডাকাত হালুম চিৎপটাং’ মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে দুরবস্থা জন্মদিনে এল লাকী আখান্দের অপ্রকাশিত গান নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ কিয়ামতের ময়দানে রাসুল (সা.)-এর পাশে থাকার উপায় সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: টিআইবি
Nagad desktop

দোহাজারী-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেল প্রকল্প: পরিকল্পনাতেই ব্যাপক গলদ

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:০০ পিএম
আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:১৩ পিএম
দোহাজারী-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেল প্রকল্প: পরিকল্পনাতেই ব্যাপক গলদ

কক্সবাজারে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনটি পঞ্চম তলা নির্মাণ করা হলেও পরিকল্পনায় গলদ রয়ে গেছে। দ্বিতীয় তলা থেকে একে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই রামু থেকে সীমান্তবর্তী ঘুমধুম পর্যন্ত প্রায় ২৯ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন শেষ পর্যায়ে সংশোধন করে বাদ দেওয়া হয়েছে এই অংশকে। এই হচ্ছে ‘দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ’ মেগা প্রকল্পের বাস্তব চিত্র। 

প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তার পরও ১৭টি অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়েছে। বিভিন্ন স্টেশনের নির্মাণকাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। এসব স্টেশন ও সার্ভিস এরিয়া ভবনে নিম্নমানের টাইলস, কাঠ, গ্রিল, কমোড, বেসিন ব্যবহার করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

পরিকল্পনা ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অন্য ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের মতো দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। চতুর্থ বার সংশোধনের মাধ্যমে গত ৩০ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হলেও শেষ হয়নি। এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন রেলপথ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনায় আরও ২৯ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করে রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত প্রসারিত করার কথা ছিল। কিন্তু মায়ানমারের সঙ্গে কোনো ধরনের এমওইউ করা হয়নি। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই অংশের কাজ বাতিল করা হয়েছে।

আইএমইডির সচিব মো. আবুল কাশেম মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা প্রকল্প পরিদর্শন করার সময় সবকিছু তুলে ধরার চেষ্টা করি। এটা আমাদের কাজ। সতর্কতার সঙ্গে টাকা খরচ না করলে প্রকল্পে কিছু ত্রুটি থেকে যায়। এই প্রকল্পে তেমন কোনো ত্রুটি ধরা পড়েনি। তবে অনেক অডিট আপত্তি ধরা পড়েছে। প্রতিবেদনে তা আছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় এসবের জবাব দেবে। লক্ষ্য থাকবে যাতে নিয়মের ব্যত্যয় না ঘটে।’ 

পরিদর্শনকারী (আইএমইডির) পরিচালক ও উপসচিব মো. মুমিতুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন পঞ্চম তলা নির্মাণ করা হলেও পরিকল্পনায় গলদ রয়ে গেছে। কারণ দ্বিতীয় তলা থেকে একে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি। তাই ট্রেন চলাচল করলেও এই স্টেশনের ওপরের ফ্লোরগুলো খালি পড়ে আছে। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই রামু থেকে সীমান্তবর্তী ঘুমধুম পর্যন্ত প্রায় ২৯ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন শেষ পর্যায়ে এই অংশকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যখন এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, তখনই প্রশ্ন উঠেছিল। কারণ সেখানে কোনো ব্যবসার উৎস ছিল না। তার পরও ঘুমধুম পর্যন্ত বাড়িয়ে বেশি টাকা খরচ করা হয়েছে। আমরা অর্থনীতির শ্বেতপত্রে এ ধরনের অর্থ তছরুপের কথা বলেছি। পাঁচতলা কক্সবাজার রেলস্টেশনটি কর্ণফুলী টানেলে বিলাসী হোটেলের মতো অবস্থা। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বিলাসী ভ্রমণের জন্যই এটা করেছেন। এ ধরনের অপরিকল্পিত পরিকল্পনায় যারা জড়িত তাদের ধরা দরকার। কারণ জনগণের করের টাকা ও ঋণ করে এই প্রকল্প করা হয়েছে।’

প্রকল্প পরিচালক সুবক্তগীন বলেন, ‘গত ৩০ জুন প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টুকটাক কিছু কাজ বাকি আছে। বড় কোনো কাজ বাকি নেই। নভেম্বর পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৯৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। যে কাজ বাকি আছে, তা ডিফেক্ট ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের মধ্যে শেষ হবে। এ জন্য এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছে।’

দেশের অন্যতম পর্যটন শহর কক্সবাজারকে রেললাইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য সাবেক সরকার উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে ২০১০ সালের ৬ জুলাই দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় তৎকালীন সরকার। খরচ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং বিদেশি ঋণ হিসেবে ধরা হয়েছিল ৮১৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বেঁধে দেওয়া হয় ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ডুয়েল গেজ লাইন করার জন্য প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা উন্নয়ন সহযোগী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ হিসেবে ধরা হয়। বাকি ৪ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত হয়। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পের প্রধান কাজ ধরা হয় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন রেলপথ নির্মাণ। এ জন্য ৩৯টি মেজর ব্রিজ, ২৩০টি মাইনর ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণ, হাতি চলাচলের জন্য আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ এবং দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়ার হারবাং, ডুলাহাজারা, ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামাবাদ, রামু উপজেলাসহ ৯টি স্থানে নতুন করে স্টেশন নির্মাণ এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। ১ হাজার ৩৯১ একর জমি অধিগ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয় প্রকল্পে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্য ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের মতো এটিকেও এর আওতাভুক্ত করেন এবং গভীরভাবে মনিটর করার নির্দেশ দেন। তার পরও ঠিকমতো কাজে গতি আসেনি। ২০২২ সালের ৬ জুন চতুর্থবারের মতো সংশোধন করে ২০২৪ সালের জুনে শেষ করার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্যাকেজে ভাগ করে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রথম ধাপে দোহাজারী-কক্সবাজারের ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

গত ১১ ও ১২ অক্টোবর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করার পর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটি আসলে ৩০ জুনে শেষ হবে কি না তা দেখার জন্য আইএমইডির মহাপরিচালক গত ১৭ মে পর্যবেক্ষণ (মনিটরিং) করেন। তিনি অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করাসহ সার্বিক দিক পরিদর্শন করে এক বছর সময় অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেন। সেটা আমলে নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন গত ২৯ সেপ্টেম্বর এক বছর সময় বাড়ানোর সুপারিশ করে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে দাঁড়াল ১২ বছর। তবে বাতিল করা হয়েছে রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের কাজ। এতে ৩৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণ এবং উখিয়া ও ঘুমধুম স্টেশন নির্মাণ, হাতি চলাচলের জন্য আন্ডারপাস-ওভারপাসসহ অন্যান্য কাজও বাতিল করা হয়েছে। এসব কাজের জন্য ৬ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকার বরাদ্দও বাদ গেছে। এসব বাদ দিয়ে প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা এবং সরকারি খরচ ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, লট-১-এর আওতায় নতুন করে বৃক্ষরোপণসহ আগে যেসব বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে সেসবের সুষ্ঠুভাবে পরিচর্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগকে লাভজনক করতে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেললাইনকে ব্রডগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া আইকনিক রেলস্টেশনসহ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নির্মিত স্থাপনা প্রতিদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয় তলা থেকে একে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি।

কষ্টকর হবে জীবন, সব জিনিসের দাম বাড়বে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম
কষ্টকর হবে জীবন, সব জিনিসের দাম বাড়বে
ছবি: এআই

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের মারপ্যাঁচে চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য থেকে পাউরুটি, চিপস, বিস্কুট ও জুসের মতো খাবারের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা মোবাইল, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার এবং এসব পণ্যের যন্ত্রাংশের দাম বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। জোরালো আবেদন সত্ত্বেও আগামীবারও কমবে না মোবাইল ফোন ব্যবহারের খরচ।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব জানা যায়। 

সূত্র আরও জানায়, বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন।

আগামী বাজেটে তামাক পণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত ঘড়ি ও চশমার দাম বাড়বে। অন্যদিকে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোয় বিদেশি ঘড়ি ও চশমার দামও বাড়বে। বিদেশি ব্র্যান্ড ও নন ব্র্যান্ড সব ধরনের প্রসাধনীর দাম বাড়বে। আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে। 

ব্যবসায়ীরা দাম কমানোর জোরালো আবেদন করলেও কমছে না মাছ ও পোলট্রি ফিডের দাম। মানবিক বিবেচনায় কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর পরামর্শ দিলেও আমলে আনা হচ্ছে না। কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় না দেওয়ায় কমছে না ওষুধের দাম। জমি রেজিস্ট্রির খরচ কমানো হচ্ছে না।  

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থ সংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি  ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই  অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সব কিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, আওতা বাড়িয়ে সরকার আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। অনেক নতুন খাত অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। এতে সরকারের আয় বাড়বে বলে আশা করছি।  

বাজেট প্রণয়নকালেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে দেশি কম্পিউটার শিল্পের বাজার সম্প্রসারণে দেশে কম্পিউটার সংযোজন ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে রাজস্ব ছাড়ের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার জন্য আবেদন করে। আগামী বাজেটে কম্পিউটার সংযোজনকারী শিল্প এবং কম্পিউটার আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে আমদানিকৃত কম্পিউটার ও ল্যাপটপের দাম বাড়বে। 

সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে। 

সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ফলে আসন্ন বাজেটে অটোরিকশার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে অটোরিকশা বানাতে খরচ বাড়বে। ফলে অটোরিকশার দাম বাড়বে।  

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সদস্য প্রায় ৩০ লাখ। এনবিআর থেকে এসব দোকানের তালিকা নিয়ে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব দোকানের মধ্যে লক্ষাধিক হস্ত ও কুটির শিল্পের দোকান আছে। এসব দোকানের বেশির ভাগই এসএমই খাতের (ক্ষুদ্র ও মাঝারি। আগামী বাজেটে ছোট দোকানের ওপর বছরে এক হাজার টাকা করে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।  

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ছোট ছোট দোকান সাধারণত পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে থাকে। এসব দোকানের আয় দিয়ে দোকান-মালিক সংসারের খরচ চালান। এসব লোকের বেশির ভাগই অল্প আয়ের মানুষ। এখান থেকে যারা কেনাকাটা করেন তারাও ধনী ব্যক্তি না। এসব দোকানকে ভ্যাটের আওতায় আনা হলে দোকান-মালিকের ওপর চাপ হয়ে যাবে। অনেক দোকান জিনিসপত্রের দামও বাড়াবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও উসকে দেবে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গণমাধ্যমে দেখেছি আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের  খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্টেডিয়ামের খেলা ও থিয়েটারে নাটক দেখতে হলে এখনকার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে টিকিট কাটতে হবে।

আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে ভারতসহ অনেক দেশ থেকে তুলা আমদানিতে খরচ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ ছাড় থাকবে। তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা কম দামে তুলা আমদানির পক্ষে। তাদের বেশির ভাগই ভারত থেকে কম দামে তুলা আমদানি করতে চায়। অন্যদিকে টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে তুলা আনার বিপক্ষে। তারা দেশে উৎপাদিত তুলা ব্যবহারের পক্ষে। তবে সরকার পড়েছে খানিকটা বেকায়দায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর শর্ত রয়েছে। তাই আগামী বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।

শুল্ককরের মারপ্যাঁচে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পরই মোবাইল ফোনের সামগ্রী বেশি দামে আমদানি করতে হবে। মোবাইল ফোন মেরামতে খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি করা মোবাইলের দামও বাড়বে। একইভাবে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা।

আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন কাস্টমাইজেশন, এনটিটিএন, ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল অ্যানিমেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট সার্ভিস, ওয়েব লিস্টিং, আইটি প্রসেস আউটসোর্সিং, ওয়েবসাইট হোস্টিং, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি অ্যান্ড প্রসেসিং, ডিজিটাল ডেটা অ্যানালেটিক্স, জিওগ্রাফিক্স ইনফরমেশন সার্ভিসেস, আইটি সাপোর্ট অ্যান্ড সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স সার্ভিস, সফটওয়্যার ল্যাব টেস্ট সার্ভিস, কল সেন্টার সার্ভিস খাতে খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। একইভাবে ওভারসিজ মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশন্স সার্ভিস, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন সার্ভিস, ডকুমেন্ট কনভারশন, রোবোটিক্স প্রসেস আউটসোর্সিং এবং সাইবার সিকিউরিটি সার্ভিস খাতেও খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রীসহ এনবিআর বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব খাতের ওপর কোনো ধরনের রাজস্ব আরোপ না করার নির্দেশ দেন। ফলে আগামী বাজেটে বাড়ছে না এসব খাতের খরচ।  

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্ষমতা বাড়াতে সুপরিকল্পিত বাজেটের তাগিদ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
সক্ষমতা বাড়াতে সুপরিকল্পিত বাজেটের তাগিদ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ক্রমবর্ধমান সেই উন্নয়নের গতিতে এগিয়ে চলেছে। যদিও চব্বিশের অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবকাঠামোগত যে বিপর্যয় ঘটেছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে মারাত্মক বেগ পেতে হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

তবু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার স্বার্থে বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট খাতের আরও আধুনিকায়ন জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য তারা আগামী জাতীয় বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও উন্নয়নে সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিতভাবে অর্থ বরাদ্দেরও তাগিদ দিচ্ছেন। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগের (জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা) জন্য ৩১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই দুটি বিভাগের জন্য উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যার মধ্যে জননিরাপত্তায় ১ হাজার ২২৪ কোটি টাকা ও সুরক্ষা সেবায় ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। যদিও ওই দুটি বিভাগ পরে একীভূত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয়ে আসছে। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৩১ হাজার ১২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে দাঁড়িয়েছিল ২৯ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায়।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে আইনশৃঙ্খলা খাতের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও বাস্তবতায় আমাদের দেশের রাজস্ব কম, সম্পদের স্বল্পতা রয়েছে–তার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো উচিত। কারণ জনগণের জানমালের বা সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টিও ক্রমবর্ধমান। সব মিলিয়ে আগামী বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সরকার বিশেষ নজর দেবে–এমনটাই প্রত্যাশা করি।’

গত ৩০ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশনে এক বক্তব্যে পুলিশের জন্য তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে কিছু আলোচনা তুলে ধরেন। এতে বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা এবং সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আইনশৃঙ্খলা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা খাতের সবচেয়ে বড় অংশীজন হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ, যারা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখাসহ সামাজিক শৃঙ্খলা-নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করে থাকে। প্রায় সোয়া দুই লাখ সদস্যের বাংলাদেশ পুলিশের দায়িত্ব পালন এবং অবকাঠামোগত বিষয়ে এখনো মারাত্মক সংকট রয়ে গেছে। বিশেষ করে পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা, যানবাহন, বাসস্থান, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, র‌্যাব, আনসার ভিডিপি, কোস্টগার্ড ছাড়াও কারাগার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ এই খাতের সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা খাত একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ খাতের আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণসহ কাজের ধারাগুলো চলমান বা গতিশীল প্রক্রিয়া। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সব সময় সময়োপযোগী আর্থিক বাজেট হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কোন কোন বিষয়ে কেমন অর্থ লাগবে, সেটিও সুনির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা উচিত। যেহেতু আধুনিক দেশগুলো নানা প্রযুক্তি-সরঞ্জামের মাধ্যমে এই ধরনের বাহিনীগুলোকে এগিয়ে নিচ্ছে, সে ক্ষেত্রে আমাদেরও উচিত সে রকম বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করা।’

গ্রাহকের ব্যানারে আন্দোলনে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
গ্রাহকের ব্যানারে আন্দোলনে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা
‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে গ্রাহক পরিচয়ে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। (বাঁ থেকে) ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছেন এক কর্মকর্তা, ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা মো. আকমাম হোসাইন এবং কর্মকর্তা আবুল আজাদ। ছবি: খবরের কাগজ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তারা ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে গ্রাহক পরিচয়ে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ আন্দোলনকারীদের গোপনে সমর্থন দিচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা ব্যাংকের চাকরিবিধি, মানবসম্পদ নীতিমালা এবং পেশাগত আচরণবিষয়ক নির্দেশনা লঙ্ঘন করছেন। ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ সার্কুলারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তা না মানলে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনার বিষয়েও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সচেতন গ্রাহকের ফোরামের সঙ্গে ব্যাংকটির অনেক কর্মকর্তাও আন্দোলনে নেমেছেন। কেউ কেউ আন্দোলনকারীদের গোপনে সমর্থন দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ধরনের কিছু ভিডিও ভাসছে। প্রকাশ্যে আন্দোলনে নেমেছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা আবুল আজাদ, মোহাম্মদ আকমাম হোসাইন, সিবিএ নেতা আনিসুর  রহমানসহ অনেকেই। একটি ছবিতে দেখা যায়, ‘ইসলামী ব্যাংকের আঙিনায় খুরশীদের ঠাঁই নাই।’ এ রকম একটি ফেস্টুন নিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সড়কে দাঁড়িয়েছেন চকমোগলটুলি শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার আবুল আজাদ। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে সচেতন গ্রাহক ফোরাম আন্দোলনে নেমেছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড রুমে তালা দিয়েছেন কিছু কর্মকর্তা। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে তালা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় যত শক্তি ব্যবহার করুক না কেন? জীবনবাজি রেখে তা পাহারা দেওয়ার ঘোষণা দেন। 

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, তালা দেওয়ার ঘটনাটি ঘটিয়েছেন আবুল আজাদ এবং ব্যাংকটির সিবিএ নেতা ও ইলেকট্রিশিয়ান আনিসুর রহমান।

অপরদিকে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সঙ্গে সরাসরি আন্দোলনে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আকমাম হোসাইনকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আরেক ছবিতে দেখা যায়, ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনের সঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা কামরুল হাসান বাবলু। তার পাশে রয়েছেন বিএম আনোয়ারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।

খবরের কাগজের পক্ষ থেকে ফোন করা হলে অভিযোগের বিষয়ে মো. আকমাম হোসাইন কথা বলতে রাজি হননি। আবুল আজাদ এবং আনিসুর রহমানকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, ইসলামী ব্যাংকের ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের সার্কুলার লেটার নং: এইচ আর ডব্লিউ/৩০৪৬-তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, এ বিষয়ে ইতোপূর্বে ইস্যুকৃত ইনস্ট্রাকশন সার্কুলার নং এইচ আর ডি/১৩০২, তারিখ ১৯-০২-২০১৩, ইনস্ট্রাকশন সার্কুলার নং এইচ আর ডব্লিউ/১৫৯৬, তারিখ ১০-০৪-২০১৮, ইনস্ট্রাকশন সার্কুলার নং এইচ আর ডি/৮৯৯৭, তারিখ ২৪-০৫-২০১৮, সার্কুলার নং এইচ আর ডি/২০১৪/৫৪৯৭, তারিখ ০৬-০২-২০১৪, সার্কুলার নং এইচ আর ডি/২০১৬/৬৯৮৩, তারিখ ১২-০৫-২০১৬, সার্কুলার নং এইচ আর ডব্লিউ/৮১৫৩, তারিখ ০৫-০৯-২০১৭-এ জারিকৃত সার্কুলারসমূহে ব্যাংকের সব স্তরের নির্বাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সর্বাবস্থায় সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন–ফেসবুক/টুইটার/ই-মেইল ইত্যাদিতে কোনো প্রকার দলীয় পক্ষপাতমূলক বা বিতর্কিত মন্তব্য প্রদান বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। 

এ বিষয়ে ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালার অধ্যায় ৬-এ অন্তর্ভুক্ত ‘জেনারেল কনডাক্ট অ্যান্ড ডিসিপ্লিন পলিসি’র ৩ নং ধারা, শিরোনাম ‘রাজনীতি, নির্বাচন ইত্যাদিতে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা’-এর প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। যাতে বলা হয়, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন না। তবে ভোট দিতে পারবেন। কোনো উপদলীয় মতবাদ প্রচার করবেন না অথবা এ রকম কোনো উপদলীয় বিতর্কে অংশ নেবেন না অথবা উপদলীয় কোনো স্বজনপ্রীতিতে আসক্ত হবেন না, যেটা দায়িত্ব পালনে তার নিষ্ঠাকে ব্যাহত করবে অথবা ব্যাংকের প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলে দেবে অথবা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের ভেতরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। সংকীর্ণতা, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অফিসের অপব্যবহার করা যাবে না। ব্যাংকের সর্বস্তরের নির্বাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেকোনো পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া বা সাম্প্রদায়িক বিরোধে অংশগ্রহণ করা থেকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। নির্দেশনার কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তা ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম কাওছার আলম এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম কামাল উদ্দীন জসিম স্বাক্ষরিত সার্কুলারে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

একাধিক ব্যাংকার খবরের কাগজকে জানান, দেশের প্রাইভেট ব্যাংকগুলো যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা মেনে চলছে, সেখানে ইসলামী ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা গ্রাহক সেজে আন্দোলনে নেমেছেন–এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. কামাল উদ্দিন জসিমের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনও ফোন রিসিভ করেননি।

যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্মারক, ঐতিহাসিক স্বাধীনতা জাদুঘর এখন এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। যে ভূগর্ভস্থ জাদুঘরে একসময়ে ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের রেপ্লিকা, ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস সাজানো ছিল–সেই জাদুঘর এখন পোড়া গন্ধ, ভাঙা কাচ আর অন্ধকারে ডুবে থাকা এক নীরব ধ্বংসাবশেষ। জাদুঘরটির পোড়া দেয়াল আর ভাঙা কাচের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, গর্ব, আভিজাত্য-অহংকার।

  • ৪৭ মাস ধরে তালাবদ্ধ স্বাধীনতা জাদুঘর, সংস্কারে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা
  • এই জাদুঘরটি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানের নিচেই ধ্বংসস্তূপ; ৬৭ একর জায়গায় প্রকল্পটিতে রাষ্ট্রের ব্যয় ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা 
  • রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি ৫-১০ কোটি টাকা, পূর্ণাঙ্গ সংস্কারে সম্ভাব্য ব্যয় ২০ কোটি টাকারও বেশি
  • ‘জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করেছি, কিন্তু ইতিহাসের ওপর এ ধরনের ধ্বংস মেনে নিতে পারিনি। মনে হয়েছে হামলাকারীদের যত রাগ মুক্তিযুদ্ধের ওপর’: দর্শনার্থী

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নজিরবিহীন হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এই জাদুঘরের কোনো ছবি, ভাস্কর্য কিংবা নিদর্শন অক্ষত নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অথচ ঘটনার ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই, একটিমাত্র মামলার অগ্রগতিও থমকে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দ ও সিদ্ধান্ত ছাড়া জাদুঘরটি পুনরায় সংস্কার ও চালু করা সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস ধারণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে–এই স্মৃতিস্মারক রক্ষায় বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ওপর।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানটিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৬ ডিসেম্বর যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, ঠিক সেই ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলেই নির্মিত হয়েছিল স্বাধীনতা জাদুঘর।

২০১৫ সালের ২৫ মার্চ উদ্বোধন হওয়া এই জাদুঘর ছিল দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ জাদুঘর। প্রায় ৬৭ একর এলাকাজুড়ে নির্মিত পুরো প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। জাদুঘরটিকে অনেকেই বলতেন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস জানার ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার’। কারণ এখানে মুঘল আমল থেকে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ৭ মার্চের ভাষণ, গণহত্যা, শরণার্থী জীবন, সেক্টর কমান্ডারদের যুদ্ধ, আত্মসমর্পণ–সবকিছুর ধারাবাহিক উপস্থাপন করা ছিল।

এই জাদুঘরে ছিল ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’, ‘শিখা চিরন্তন’, জলাধার, ম্যুরাল, মিলনায়তন এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনী গ্যালারি। এসব গ্যালারিতে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র প্রদর্শিত ছিল। এর মধ্যে ১৪৪টি কাচের প্যানেলে ছিল তিন শতাধিক ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। আরও ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশি সংবাদপত্রের কাটিং, পোস্টার, টেরাকোটা ম্যুরাল, যুদ্ধের নিদর্শন এবং আত্মসমর্পণের টেবিলের প্রতিকৃতি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই গ্যালারিগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন, জাদুঘরটির পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৫ আগস্টের ধ্বংসযজ্ঞের ভাঙা পোড়া স্মৃতিচিহ্ন।

৫ আগস্ট ২০২৪: হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন বিকেলে স্বাধীনতা জাদুঘরে সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। 

এ বিষয়ে স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক মো. গোলাম কাউছার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানকার গ্যালারিগুলোতে থাকা কোনো নিদর্শনই অক্ষত নেই। প্রদর্শিত আলোকচিত্রগুলোর ডিসপ্লে, টিভি মনিটর, সাউন্ড সিস্টেম, চেয়ার, ফ্যান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, এমনকি পানির পাম্প, বিদ্যুতের তার পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাদুঘরের ভেতর একটি নিদর্শনও আগের জায়গায় নেই। জাদুঘরটির বাইরে থাকা প্রাচীরে স্থাপিত ঐতিহাসিক ভাস্কর্যগুলোও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙচুর করা অনেক জিনিসে ভেতর ও বাইরে আগুনে দেওয়া হয়। 

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় গিয়ে কথা হয় সেই দিনের ঘটনার সাক্ষী পিডব্লিউডির এক কার্য সহকারীর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা শুধু ভাঙচুরই করেনি, বরং জাদুঘরের ভেতরে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী টেনে বের করে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। সেই আগুন জাদুঘরের বিভিন্ন অংশে টানা দুদিন পর্যন্ত জ্বলেছে। তিনি আরও জানান, হামলার সময় তাকে মারধরের চেষ্টাও করা হয়। পরে নিজেকে স্থানীয় লোক পরিচয় দেওয়ার পর রক্ষা পান। সেই সময়ের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

যত আক্রোশ যেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ধ্বংসস্তূপের নীরব সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মনসুর ঘরামি (৭৫)। একাত্তরে ৯ নম্বর সেক্টরের হেমায়েত বাহিনীর এই যোদ্ধার সার্টিফিকেট নেই। তিনি উদ্যান এলাকায় ভাঙারি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ থেইকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি, যা কিছু আছিল সব লুট কইরা নিয়া গেছে। সেই দিনের পর থাইকা এটা বন্ধ। আর খোলে নাই।’ কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করছি দেশ বাঁচাইতে, টাকার জন্য না। এই রকম বাংলাদেশ তো চাই নাই।’

তার মতো অনেকেই মনে করছেন, হামলাটি শুধু একটি স্থাপনার ওপর ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ইতিহাস ও প্রতীকগুলোর ওপর আঘাত। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মৌটুসী ইসলাম বলেন, ‘এই জাদুঘরে আমি একবার গিয়েছি। এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের সার্বিক চিত্র এর ভেতরে সাজানো ছিল; যা আমাদের জন্য লেসন। অথচ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর সারা দেশে যে আঘাত ২৪-এ আমরা ঘটতে দেখেছি সেটা অপ্রত্যাশিত। জুলাইকে আমিও সমর্থন করেছি। কিন্তু এ ধরনের ধ্বংস মেনে নিতে পারিনি। আমি আশা করি, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীনতা জাদুঘরসহ ধ্বংসের শিকার জাদুঘরগুলো সংস্কার করে আবার চালু করার উদ্যোগ নেবে।’

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় দীর্ঘদিন যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী মোবাশ্বের আলম (৫৬) বলেন, ‘বিগত দিনে কত আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেছি। সরকার বদল হতেও দেখেছি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ দেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর যে ধরনের আঘাত ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে; সে ধরনের ঘটনা আগে আমরা দেখিনি। মনে হয়েছে হামলাকারীদের যত রাগ মুক্তিযুদ্ধের ওপর! এ ধরনের সন্ত্রাসী সব কর্মকাণ্ড দমনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন, অনেক রক্তের বিনিময়ে জয় করা এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর আর কোনো আঘাত যেন না আসে।’

সংস্কার ও মামলার অগ্রগতি নেই

স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক গোলাম কাউছার বলেন, ‘এটি কোনো ব্যক্তির জাদুঘর নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জাদুঘর। তাই নতুন করে গবেষণা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে আবার দাঁড় করাতে হবে। ফলে এটি শুধু সংস্কারের বিষয় নয়; পুরো উপস্থাপনাই নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ আগের ডিসপ্লেগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নতুন করে আলোকচিত্র, দলিল, কিউরেশন এবং প্রদর্শনী পরিকল্পনা করতে হবে।’ তিনি জানান, এতে সময় ও বড় অঙ্কের অর্থ লাগবে। সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা হলেও পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণে ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

মামলা প্রসঙ্গে গোলাম কাউছার জানান, স্বাধীনতা জাদুঘরের চারটি মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্ত্রও লুট হয়ে যায়। পরে লুট হওয়া অস্ত্র ও ভাঙচুরের ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও সেগুলোর সঙ্গে জাদুঘরের অস্ত্রের মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে সংশ্লিষ্ট থানায় খোঁজ নিয়ে মামলার কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার পর একটি মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য তদন্ত অগ্রগতি, চার্জশিট বা গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ হয়নি। এ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন– বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসবাহী একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় এমন হামলার পরও কেন তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? 

৪৭ মাসেও নেই সংস্কারের উদ্যোগ

ঘটনার পর ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি এখনো বন্ধ। ভেতরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। পোড়া দেয়াল, ভাঙা কাচ, ক্ষতিগ্রস্ত ম্যুরাল, গ্যালারিগুলোসহ জাদুঘরের গোটা এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন। 

জাদুঘরটি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাদুঘরের ভেতরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সব ভাঙা হয়েছে। তবে ১৯৭১-কে বাদ দিয়ে আমরা কিছুই করতে পারব না। খুবই যত্ন করে নতুন আঙ্গিকে স্বাধীনতা জাদুঘর আবার তুলে ধরা হবে। নতুনভাবে ডিসপ্লে, কিউরেশন এবং দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাদুঘরটি সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। পিডব্লিউডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি।

স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ভগ্নদশা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের স্মৃতি সংরক্ষণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার রক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে–দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার দায় কি এড়াতে পারে রাষ্ট্র? এ প্রসঙ্গে লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন বলেছেন, ‘ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। পরবর্তী প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে বের করবেই। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাষ্ট্রের একটি মীমাংসিত সত্য। সেটিতে কারও হাত দেওয়া উচিত নয়।’

রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে
এভাবেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীরা। ছবি: খবরের কাগজ

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল সকাল থেকে। তা উপেক্ষা করেই শহরতলির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা কাউসার। কারওয়ান বাজার মোড়ে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে বাসের দেখা পান। কিন্তু সেই বাসে ওঠার জো নেই, বাদুরঝোলা হয়ে গন্তব্যে ছুটছেন অনেক যাত্রী। সাভারের রেডিও কলোনি যেতে ফাতেমাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

এই চিত্র গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার। ফাতেমার মতো আরও অনেক যাত্রীকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে সাভার-নবীনগর, উত্তরা, টঙ্গী-কামারপাড়া, গাজীপুরসহ শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় যেতে যাত্রীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, প্রগতি সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর রোড, বিমানবন্দর সড়ক ঘুরে খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা দুর্ভোগের চিত্র দেখেছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ থাকায় রাজধানীবাসীর ‘বড় অংশ’ রয়ে গেছে ঢাকার বাইরে। ৭ জুন থেকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে। তাই আজ শনিবার রাজধানীমুখী যাত্রীদের ঢল দেখা যাবে। তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে সিটি বাসগুলোও বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।

খবরের কাগজের একজন প্রতিবেদক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে সাভারগামী ওয়েলকাম পরিবহনের বাসে উঠেন। সেই বাসে পা ফেলার জায়গাও ছিল না। পথে যেতে যেতে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব একজন যাত্রীর সঙ্গে।

তিনি জানান, নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে তিনি গুলিস্তান এসে পৌঁছান। সাভারগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। আরেকজন নারী যাত্রী বলেন, ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে অনেকটা জোর করে বাসে উঠেছি। বাসে সিট ছিল না বলে নারী যাত্রীদের উঠাতে চাইছিল না হেল্পার।’

ওই বাসে আসন না পেয়ে নারী যাত্রী দাঁড়িয়েই যাচ্ছিলেন হেমায়েতপুরে। বাসটির হেল্পার মিল্টন বলেন, ‘ঈদের পরে অনেক যাত্রীই তো রইয়া গেছে বাড়ি। তারা তো ফিরে নাই। আজকের (শুক্রবার) রাতের পরে তারা সবাই ফিরতে শুরু করবে। তাদের আনতে টাউন সার্ভিসের বাসগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।’

রাজশাহীর আলোকচিত্রী রায়হান বিশ্বাস গতকাল ঢাকায় এসেছেন জরুরি কাজে। তিনি জানান, সিরাজগঞ্জের এলেঙ্গার মোড়ে তিনি ঢাকার সিটি সার্ভিসের বেশ কয়েকটি মিনিবাসে ঢাকামুখী যাত্রী দেখেছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ঢাকার ‘টাউন সার্ভিস’ বাস দেখার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল রহমান। পথে-পথে সেসব বাস বিকল হয়ে থাকার কথাও জানান তিনি।

তাদের কথার সত্যতা পাওয়া যায় শুক্রবার বেলা ২টার দিকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও টাউন সার্ভিসগুলো গেটলক হয়ে রাজধানীর দিকে ফিরছিল। সাভার পরিবহন, সেলফি, মিরপুর লিঙ্ক, রাজধানী, নীলাচল নামের বেসরকারি বাসগুলো তো বটেই;  এমনকি শহরতলি রুটে চলাচল করা বিআরটিসির এসি বাসও দূরপাল্লায় যাত্রী পরিবহন করছে।

এসব বাসে ঢাকায় ফিরতে যাত্রীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ঈদের ফিরতি যাত্রার দ্বিতীয় পর্বে এসব অনিয়ম দেখার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা হাইওয়ে পুলিশের কোনো অভিযান নজরে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং ঢাকা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সদস্য সচিব শহিদুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বার্তা পেয়েও সাড়া দেননি হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে এখনো যারা বাড়ি রয়ে গেছেন, তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে দূরপাল্লার বাস পর্যাপ্ত নয়। তাই ঢাকার ভেতরে চলাচল করা অনেক বাস সুযোগ বুঝে দূরপাল্লার রুটে গেছে।

আরটিসির নিয়ম অনুযায়ী এসব বাস দূরপাল্লার রুটে চলাচলের অনুমতি পায় না। কিন্তু প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে অনেক মালিক বাস দূরের জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন স্থানীয় প্রশাসনও নীরব। কারণ, বাসগুলো তো যাত্রী পরিষেবা দিচ্ছে। আমরাও সমিতিতে আলোচনা করেছি, এসব বাস দূরপাল্লার রুটের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।’

রাজধানীর ভেতরে বা শহরতলিতে চলাচল করা অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই, চালকদেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ঈদযাত্রা বা ফিরতি যাত্রায় ঢাকার এসব টাউন বাসই দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণ।

পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আসিফ রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যদিও দুই চালকেরই ভারী যান পরিচালনার লাইসেন্স থাকে, কিন্তু ইন্টারসিটি চালক হুট করে মহাসড়কে নেমে এলে সেই সড়কের চরিত্র বুঝতে পারবেন না। দুই ধরনের সড়কের চরিত্র ভিন্ন। হুট করে চালকের যানবাহনের ধরন (ট্রান্সপোর্ট মুড) পরিবর্তন হলে বিপদের সমূহ শঙ্কা থাকে।’