কলেজের প্রধান হিসেবে শিক্ষার্থীসহ সবার স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব অধ্যক্ষের। অথচ নোয়াখালীর সরকারি মুজিব কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আজাদ আতিকুর রহমান নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কৌশলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, কলেজের একটি কক্ষে থাকলেও সেই বাবদ কোনো ভাড়া পরিশোধ না করা, দরপত্র ছাড়া কলেজের মসজিদে এসি ও কলেজে সিসিটিভি স্থাপনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে।
এসব অনিয়ম নিয়ে যারা প্রতিবাদ করেছেন তাদের শোকজ করা, কলেজ থেকে বদলি হয়ে যেতে বাধ্য করা এবং এসিআর (কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) খারাপ দেবেন বলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আছে এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।
যেভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়
কলেজ সূত্র জানায়, কলেজের একাদশ শ্রেণিতে প্রতিবছর কমপক্ষে ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তাদের ভর্তির সময় অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই মানবিকে ভর্তি ফি বাবদ ২ হাজার ২৮৯ টাকা জমা দেয় এক শিক্ষার্থী। এই টাকার বাইরে ৩৫০ টাকা অতিরিক্ত হাতে হাতে নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী খবরের কাগজকে বলে, ‘রসিদের বাইরে টাকা নিয়েছিল। তবে সেটা ৩০০ নাকি ৩৫০ টাকা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’ এভাবে প্রতিবছর অনার্স, ডিগ্রি ও একাদশে মিলিয়ে ৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন এই কলেজে। প্রত্যেকের কাছ থেকে সমপরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপেও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার তথ্য পাওয়া গেছে।
কলেজের একাধিক রসিদের কপি বিশ্লেষণ এবং শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। খবরের কাগজের হাতে থাকা নথিপত্র অনুযায়ী কলেজের হিসাব পরিচালিত হয় রূপালী ব্যাংক, বসুরহাট শাখার মাধ্যমে। সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর ২৬০৬। চলতি বছর এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের এই অ্যাকাউন্টে ফরম ফিলাপের টাকা জমা নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের এক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৫৫০ টাকা। রসিদে শিক্ষার্থীর অংশে ২ হাজার ৫৫০ টাকা লেখা হলেও অফিস কপির ঘর খালি রাখা হয়েছে। যেখানে বোর্ডের নির্ধারিত ফি কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজেরা লিখে দেয়।
নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও কৌশল করে কলেজের কর্মকর্তারা নিজেরা জমা দেন বলে জানা গেছে। এই পদ্ধতিতে সব পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে।
এই কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষার্থীরা কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দেয়। বোর্ডের দেওয়া গত ২১ মার্চ (২০২৪) তারিখের ফরম পূরণের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নিয়মিত শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ব্যবসায় ও মানবিক বিভাগের পরীক্ষার্থীদের (৪র্থ বিষয়সহ) ফি ২ হাজার ১২০ টাকা। সেই হিসাবে শিক্ষার্থীপ্রতি ৪৩০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়।
কলেজের ভর্তি ও ফরম ফিলাপসংক্রান্ত কাজে যুক্ত কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী জানান, অতিরিক্ত অর্থ থেকে শিক্ষার্থীপ্রতি ১৪০ টাকা অধ্যক্ষ কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদককে দিতেন। সমপরিমাণ অর্থ নিজের জন্য রাখতেন। বাকি টাকা কলেজের উন্নয়ন কাজে ব্যয় করবেন বলে অধ্যক্ষ নিজের কাছে রাখতেন বলে জানা গেছে।
তবে ৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা পলায়ন করায় এই বছরের জুলাইয়ে ভর্তির সময় উত্তোলিত অতিরিক্ত টাকা তারা নিয়ে যেতে পারেননি বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু আগের ফরম ফিলাপসহ এবং আগের বছরের ভর্তির টাকা তারা নিয়ে যান তখনই।
কলেজের প্রশাসনিক ভবনে থাকলেও ভাড়া দেন না
অধ্যক্ষ আজাদ আতিকুর রহমান কলেজের প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় পশ্চিম পাশের কক্ষটিতে থাকেন। সেখানে রয়েছে অ্যাটাচড বাথরুম। রয়েছে এসি ও খাট। বারান্দায় রয়েছে নিরাপত্তাবেষ্টনী। সম্প্রতি প্রকাশিত কলেজের ডকুমেন্টারিতে দোতলার এই কক্ষটিও দেখা গেছে। তবে অধ্যক্ষ এখানে থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন। কিন্তু কলেজের একাধিক শিক্ষক ও কলেজের নিরাপত্তা প্রহরী তার থাকার কথা নিশ্চিত করেন। যার রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।
সরকারি নিয়মানুযায়ী এই কক্ষটিকে ডরমিটরি হিসেবে ধরা হলেও তার বাড়ি ভাড়া থেকে ১০ ভাগ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু এ বাবদ কোনো অর্থ তিনি পরিশোধ করেননি। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সংকর চন্দ্র নাথ খবরের কাগজকে বলেন, অধ্যক্ষ বাড়ি ভাড়া বাবদ কোনো অর্থ দেন না। কলেজে অধ্যক্ষ থাকেন কি না, তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
মসজিদে এসি ও কলেজে সিসি ক্যামেরা স্থাপনে অনিয়ম
কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই কলেজের মসজিদে দুই টনের চারটি এসি ও কলেজ ক্যাম্পাসে ২৮টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এখানে বড় অঙ্কের অনিয়ম করার অভিযোগ করেছেন অনেকেই। আর সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য তিনি সিলেট থেকে লোকবল আনেন। সিলেটের এমসি কলেজ আজাদ আতিকুর রহমানের পূর্বের প্রতিষ্ঠান।
এই অনিয়ম নিয়ে অধ্যক্ষকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান। সব কাজ এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো অনুদান বা অন্য কোনো সহযোগিতা নিতে হলে সরকারি অনুমোদন থাকতে হয়। কিন্তু তিনি এসব বিষয়ে তোয়াক্কা করেননি বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ প্রমাণে ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে কবিতা
কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেই নিজেকে আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ প্রমাণ করার জন্য নানা কৌশল নিয়েছেন আজাদ আতিকুর রহমান । এ জন্য সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে লিখেছেন কবিতা। কবিতাটি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার বিদায়ী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দিয়ে আবৃত্তি করিয়েছেন। কবিতার নাম ‘কৃতী সন্তান’। কবিতার শ্লোকের মধ্যে রয়েছে-
‘ষাটের দশকে এই বাংলার রাজনীতিতে হাতেখড়ি যাদের
তন্মধ্যে অন্যতম ওবায়দুল কাদের।
ছয়ষট্টির ছয় দফা আন্দোলনে যিনি ছিলেন নির্ভীক, নিরন্তর
উনসত্তরের অভ্যুত্থানে যার তেজস্বিতায় মুগ্ধ আপামর।
মুজিব বাহিনীতে তিনি ছিলেন কোম্পানীগঞ্জের অধিনায়ক।
পনেরো আগস্টোত্তর আড়াই বছরের কারাবাস
দলীয় আনুগত্যের পরিচায়ক।’
এসব অনিয়ম নিয়ে অধ্যক্ষ আজাদ আতিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘একদম শতভাগ মিথ্যা কথা। আমি বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করি, যা শুনেছেন মিথ্যা কথা। উদ্ভট ষড়যন্ত্র।’