ঘোষণা দিয়ে পদ-বাণিজ্য করেছেন (২০২১-২১ সালে) ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি। সভাপতি বজলুর রহমান তার কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক রানার মাধ্যমে চুক্তি করে পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে টাকা নিতেন। সাধারণ সম্পাদক কচি ‘বিনিময়ে’র মাধ্যমে কমিটি বাণিজ্য করেছেন। শীর্ষ এই দুই নেতার অনুসারীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগের শেষ নেই।
সাবেক ছাত্রনেতা আজিজুল হক রানা ছিলেন সভাপতি বজলুর খুবই ঘনিষ্ঠ। এই সুবাদে তুলনামূলক অল্প বয়সেই নগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পান রানা। এরপর দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে অসদাচরণ শুরু করেন তিনি। অনেক নেতাকে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মহানগরের ওয়ার্ড ও থানার সম্মেলন শুরু হলে রানা আরও গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। বজলুর অনুসারীরা পদের জন্য টাকা নিয়ে রানার কাছে ধরনা দিতেন। শীর্ষ পদ ছাড়া বাকি সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অন্য পদের জন্য রানা নিজেই মোটা অঙ্কের টাকা অথবা ফ্ল্যাট-প্লট নিতেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য টাকার পরিমাণ নির্ধারণ হলে বজলুর সঙ্গে প্রার্থীদের কথা বলিয়ে দিতেন রানা। পদের জন্য তৃণমূল নেতাদের ফোন করে টাকা লেনদেনের কয়েকটি রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। যাদের কাছে টাকা চাওয়া যাবে না- এমন পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, প্লটও নিয়েছেন বজলুর। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বজলুর রহমানের একাধিক বাড়ি রয়েছে। তার একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে মোহাম্মদপুর-বছিলা ও উত্তরায়।
পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে রানার ছিল অভিনব প্রক্রিয়া। দলের নাম বিক্রি করে তিনি নিজের আখের গুছিয়েছেন বেশ ‘দক্ষতার’ সঙ্গে। লালমাটিয়ায় রানা চারটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এ ছাড়া আদাবর থানা আওয়ামী লীগের কমিটিতে পদ দেওয়ার কথা বলে দুই নেতার কাছ থেকে দুটি প্লট হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। মোহাম্মদপুরজুড়ে বিভিন্ন হাউজিংয়ে রানার রয়েছে অংশীদারত্ব। সেই সব হাউজিংয়ে তার একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। এ ছাড়া হাউজিংয়ে প্লট বরাদ্দকারীদের কাছ থেকে গ্যাসলাইন, বিদ্যুৎ, সড়ক-পানির লাইনের নামে চাঁদাবাজিও করেছেন তিনি দলের নাম ভাঙিয়ে।
এদিকে দলের চেয়ে ব্যবসায় মনোযোগী ছিলেন উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এই কারণে একপর্যায়ে নগরের থানা এবং ওয়ার্ড কমিটির কার্যক্রমে অমনোযোগী হয়ে পড়েন। বিজিএমইএতে কাঁচা টাকার প্রভাব থাকায় সেখানেই তিনি মনোনিবেশ করেন। নগরে দলকে শক্তিশালী করার জন্য তাকে বারবার ডাকা হলেও তিনি বিজিএমইএ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন বলে জানিয়ে দায়িত্ব অবহেলা করেন। এর ফলে দুর্বল কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।
এস এম মান্নান কচি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় দলীয় প্রভাব একচেটিয়া কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিয়েছেন তার ভাই কাউন্সিলর আব্দুর রউফ (নান্নু)। তার বিরুদ্ধে মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
মিরপুর সাড়ে ১১-তে কয়েক একর জায়গায় নান্নু তৈরি করেছেন বিশাল মার্কেট। এই মার্কেটের কিছু অংশ তিনি ক্রয় করেন। তবে এর বেশির ভাগটাই তিনি দখল করেন। ওই মার্কেটের তিন পাশে রয়েছে ফুটপাত। সেখান থেকে দৈনিক চাঁদা যেত নান্নুর পকেটে। নান্নুর রয়েছে নিজস্ব বাহিনী, যাদের অধিকাংশই কিশোর গ্যাং সদস্য। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে থানায় মাদক ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে। চিহ্নিতরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও দলীয় প্রভাবের কারণে প্রশাসন এতদিন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে এই সন্ত্রাসীরা গা ঢাকা দিয়েছে।
এই মার্কেটের পাশেই রয়েছে এস এম মান্নান কচির বহুতল বাড়ি। গুলশান-২ নম্বরেও ৫ কাঠা জায়গায় একটি তিনতলা বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে কচির। উত্তরা, মিরপুর, বছিলা, তিনশ ফিটে তার একাধিক প্লট রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন হাউজিংয়ে তার রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। ঢাকা মহানগর উত্তরের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক পদের বিনিময়ে খসরু চৌধুরীর কাছ থেকে উত্তরার দক্ষিণখান এলাকায় তিন বিঘার প্লট নিয়েছেন কচি। পরবর্তী সময়ে খসরু এই পদকে অবলম্বন করে ঢাকা-১৮ আসনের এমপিও হন। খসরুকে নিজের ব্যবসায়িক পার্টনারও বানিয়েছেন কচি। এ ছাড়া মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আব্দুস সালামকে মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক পদ দিয়েছেন কচি।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের কয়েক মাস আগে নির্বাচন ছাড়াই বিজিএমইএর সভাপতি হন কচি। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন ছাড়াই ব্যবসায়ীদের বৃহৎ এই সংগঠনের সভাপতি হন তিনি। কচিকে নির্বাচিত করতে বিপুল টাকাও ঢালেন খসরু চৌধুরী। বিনিময়ে গার্মেন্টের বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেয় কচির সিন্ডিকেট। বিজিএমইএ সভাপতির পদে বেশি দিন থাকতে না পারলেও কচি ঠিকই নিজের আখের গুছিয়ে নেন। আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসা রয়েছে তার। সরকার পতনের পর লন্ডনে পাড়ি জমান ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি। সেখানে (লন্ডন) তার প্রপার্টি এবং ব্যবসা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বজলুর রহমান ও কচির মধ্যে একসময় চরম মতবিরোধ ছিল। দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণে থানা ও ওয়ার্ডের কমিটিগুলো আলোর মুখ দেখেনি। সভাপতি বজলুর রহমান কমিটিতে পদ দেওয়ার কথা বলে পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে টাকা নেন। আর সাধারণ সম্পাদক কচি দলের চেয়ে ব্যবসাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই নিয়ে দুই নেতা এক টেবিলে বসলেই শুরু হতো বাগবিতণ্ডা। ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট সংগঠনের এক বৈঠকে বজলুর রহমান ও কচি বাগবিতণ্ডায় জড়ান। একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে পদ-বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন।
নগর উত্তরের তৃণমূল নেতারা বলেছেন, বজলুর ও কচি দলের শীর্ষ পদে থেকে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলন চলার সময়ে তৃণমূলে কোনো নির্দেশনা সঠিকভাবে আসেনি। কার নেতৃত্বে কর্মীরা মাঠে নামবেন তারও সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। কারণ থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ে দলের কমিটি নেই। নেতাদের মাঠে নামার মতো দলীয় পরিচয়ও ছিল না। এর মূল্য দিতে হয়েছে দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
তবে সরকার পতন হলেও থেমে নেই ওই দুই নেতার চাঁদাবাজি। ৫ আগস্টের পর সভাপতি বজলুর রহমান পালিয়ে ভারতে চলে যান। সাধারণ সম্পাদক কচি লন্ডনে পাড়ি জমান। আর দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নগরের বিভিন্ন স্তরের নেতাকে ফোন করে আওয়ামী লীগের নামে টাকা চাইছেন তারা।
উত্তরার দক্ষিণখান থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাকে বজলুর ভাইয়ের এক ঘনিষ্ঠ লোক ফোন করে কিছু টাকা চেয়েছেন। তারা নাকি নেতা-কর্মীদের জন্য খরচ করছেন। ফান্ডে টাকা দিতে হবে। উত্তরে আমি জানিয়েছি, সময় হলে দেব।’