গত ২০ জানুয়ারি থেকে চলছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম। ইসির ঘোষণা অনুযায়ী আজ সোমবার শেষ হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহের কাজ।
রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকাসহ দেশের বেশ কিছু স্থানে এই কার্যক্রমের মাঠের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছে খবরের কাগজ। তাতে দেখা গেছে, এবারের হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি সাড়া দিয়েছেন তরুণ ভোটাররা। তথ্য সংগ্রহকারীরা জানিয়েছেন, উৎসাহ নিয়ে তথ্যকেন্দ্রে গিয়েও ভোটার হয়েছেন কেউ কেউ। নাগরিক সেবা পেতে অনেকেই এনআইডির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারায় তথ্য পেতে সুবিধা হচ্ছে। ইসির শর্ত অনুযায়ী কিছু কাগজপত্র সংগ্রহ করতে ভোগান্তি ও বিড়ম্বনায় পড়ার অভিযোগ করেছেন অনেকে। অন্যদিকে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ১০৬ প্রবাসীকে জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটার করার চেষ্টার ঘটনায় এ কাজে সতর্কতা বেড়েছে ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
হালনাগাদ কার্যক্রমে অনেক এলাকায় তথ্য সংগ্রহকারীদের বাড়ি বাড়ি না যাওয়া, ভোটার এলাকা স্থানান্তরে তথ্য বিড়ম্বনা এবং অনেকেই ভোটার হতে না পারায় তথ্য সংগ্রহের সময় বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
রবিবার (২ জানুয়ারি) পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়নি বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন এনআইডি শাখার মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর।
ইসির এনআইডি শাখার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত হালনাগাদ কার্যক্রমে ২০০৭ সালের আগে জন্মগ্রহণকারী বাদ পড়া ১৯ লাখ ৫০ হাজার, নতুন ভোটার ১৩ লাখ ৩৭ হাজার নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া আগের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৩৫ জন মৃত ভোটারকে।
গতকাল সকালে কথা হয় রাজধানীর জিগাতলা এলাকার বাসিন্দা তাহসান রুদ্রের (২০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাসায় তথ্য সংগ্রহকারীরা আসেননি। আমি নিজে তথ্যকেন্দ্রে গিয়ে তাদের কাছে কাগজপত্র দিয়ে এসেছি। ভীষণ ভালো লাগছে ভোটার হতে পারছি, নির্বাচনে আমি আমার ভোট দিতে চাই।’ তবে রায়েরবাজার এলাকার বাসিন্দা সাবরিনা খান (২৭) বললেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, বিগত দিনে তিনি নানা কারণে ভোটার হতে পারেননি। এবার তিনি এবং তার বোন সোহানা খান (২২) একসঙ্গে ভোটার হতে আগ্রহী। কিন্তু তাদের বাসায় যাননি তথ্য সংগ্রহকারীরা, তবে মোবাইলে মেসেজ পেয়েছেন। সিরাজগঞ্জ থেকে ভোটার এলাকা ঢাকার রায়েরবাজারে আনতে কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র পেতে ভোগান্তির অভিযোগ টেইলর ব্যবসায়ী মো. ইসলাম খানের। স্থানীয় আরও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ইসির তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি না গেলেও মাঝেমধ্যে মাইকিং তারা শুনেছেন। এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমাদের তথ্য সংগ্রহকারীরা ছুটির দিনসহ দিন-রাত চেষ্টা করেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছাতে। কিন্তু সময় ও জনবলসংকটে সেটা পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না।’ প্রত্যয়নপত্র নিতে আসা নাগরিকদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
কী অবস্থা ঢাকার বাইরে?
গত ২০ জানুয়ারি ঢাকার অদূরে এবারের হালনাগাদ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। দেশের সর্বোচ্চ ভোটার সংখ্যার এই উপজেলার মোট ভোটার ৯ লাখ ৯১৫ জন। সাভারে এই কার্যক্রম তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। উৎসাহ নিয়েই তারা মাঠকর্মীদের তথ্য সরবরাহ করেছেন। তবে অনেক এলাকায় তথ্য সংগ্রহকারীরা এখনো বাড়ি বাড়ি যাননি, ইসির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেতে বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন নতুন ভোটারসহ বাসিন্দারা। যেমন- ডিজিটাল জন্মসনদ, নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট, কাবিননামা, ভাড়াটিয়াদের ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকের এনআইডি ও বিদ্যুৎ বিলের কপি পেতে বিপাকে পড়ছেন অনেকে।
আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়নের গাজীরচট এলাকার বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, ‘আমার স্ত্রী এবার নতুন ভোটার হবে। শুরু থেকেই সে আমাকে তাগাদা দিয়ে আসছিল। কিন্তু মাঠকর্মীরা আমার বাড়ি যাননি। স্ত্রীকে নিয়ে আমিই তথ্য সরবরাহ করতে যাই ইউনিয়ন পরিষদে। সেখানে যারা তথ্য সংগ্রহ করছেন, তাদের কাছে অনলাইনে ফরম পূরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটার জন্য বাইরে কম্পিউটারের দোকানে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ৫০ টাকায় ফরম পূরণ করতে হয়। এখানে ভাড়া বাসায় থাকি। অনেক আগে বিয়ে হওয়ায় কাবিননামা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। এখন নতুন ভোটার হতে গেলে বিয়ের কাবিননামাও দিতে হবে। এই মুহূর্তে গ্রামের বাড়িতে গিয়েও কাবিননামা আনা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। স্ত্রীকে ভোটার করতে গিয়ে আমি ঝামেলায় পড়েছি।’
আশুলিয়া থানার হেলাল উদ্দিন নামের এক তরুণ বলেন, ‘শিকদারবাগ এলাকার ভোটার ক্যাম্পে আমি প্রথমবারের মতো ভোটার হতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওখানে তারা আমার বাড়িওয়ালার ভোটার আইডি কার্ড ও বাড়ির বিদ্যুৎ বিলের কপি চান। আমি বিদ্যুৎ বিলের কপি দিয়েছি। আমার বাড়িওয়ালা এখানে থাকেনও না। আমি গরিব মানুষ, গাড়ি চালাই। আমাকে তো বাড়িওয়ালা তার ভোটার আইডি কার্ড দেবেন না। এখন আমি কী করব!’
সুনামগঞ্জে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে সেখানেও নতুন ভোটাররা সমস্যার সম্মুখীন। পৌরসভায় কোনো কাউন্সিলর বা মেয়র না থাকায় পরিচয়পত্র পেতে ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে অনেককে। সুনামগঞ্জ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আহমেদ নুর বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র হালনাগাদের কাজ চলছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের সঠিক কোনো তথ্য না দেওয়ায় বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। তারা কিছু না বুঝে আমাদের কাছে আসছেন।’
সম্প্রতি জেলার জগন্নাথপুরে জালিয়াতির ঘটনায় ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমে সতর্কতা বেড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাঝে। গত ২৮ জানুয়ারি ওই উপজেলার ১০৬ জন প্রবাসীকে জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটার করার দায়ে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান (৫০) এবং ওই অফিসের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর জুবায়ের আলমকে (৩৫) সাময়িক বরখাস্ত এবং পরে আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে পাঠানো হয়। জালিয়াতির ওই ঘটনায় মুজিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ভোটারপ্রতি লাখ টাকার ওপরে লেনদেনের অভিযোগে ওঠে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিদেশে থাকা ওই সব প্রবাসীর পরিবর্তে স্থানীয়দের আঙুলের ছাপ ও বায়োমেট্রিক নেওয়ার প্রমাণ পান ইসির তদন্ত কর্মকর্তারা। ওই ঘটনার পর জগন্নাথপুরের অভিযুক্ত মুজিবুর রহমানের পরিবর্তে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন মো. খলিলুর রহমান।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ১ দশমিক ৫২ শতাংশ নাগরিককে ভোটার তালিকায় যুক্ত করার লক্ষ্যে এবারের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে মাঠে রয়েছে সংস্থাটির ৬৫ হাজার লোকবল। তথ্য সংগ্রহের এই অভিযানে যেসব নাগরিকের জন্ম ২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি বা তার আগে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হলে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে নতুন ভোটারদের ছবি তুলে নিবন্ধন সম্পন্ন করার কাজ, চলবে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। এদিকে ২০২২ সাল থেকে তিন বছর ধরে চলা আগের হালনাগাদ কার্যক্রমের শেষ ধাপের কার্যক্রম এখনো চলমান। সেই তালিকায় ১৮ লাখের মতো নতুন ভোটারসহ ইসির চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় প্রকাশ করা হবে আগামী ২ মার্চ। সর্বশেষ হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ১৬০ জন। আর চলমান হালনাগাদ কার্যক্রমে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ ভোটার।
এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী ও সাভার প্রতিনিধি ইমতিয়াজ উল ইসলাম।