ভূমি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনে জালিয়াতি ও ঘুষ নেওয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন অনেক সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রারসহ নিবন্ধন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ধরনের বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তে প্রমাণ পেয়ে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দায়ের করা মামলা ও চার্জশিটে অন্তত ১৮ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে অভিযুক্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অবশ্য এর আগের বছরও (২০২৩ সাল) একই ধরনের অভিযোগে ১৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয় দুদক।
এ ব্যাপারে দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুধু সাব-রেজিস্ট্রার নন, যেকোনো দপ্তরের অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ বিভিন্নভাবে দুদকে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে অভিযোগসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এরপর সুষ্ঠু তদন্তে উপযুক্ত প্রমাণ পেলে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়ে থাকে।’
জানা গেছে, প্রায় আট কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ২৩ জুন সাব-রেজিস্ট্রার দম্পতি এ কে এম ফয়েজ উল্যাহ ও রেহেনা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। মামলায় ফয়েজ উল্যাহর বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৮৬ লাখ ৬ হাজার ৬৯৬ টাকার এবং তার স্ত্রী রেহেনা বেগমের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৮৮ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।
সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া, ভূমি হস্তান্তরের দলিলে পৌরসভার জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর শেরপুর জেলার শ্রীবরদীর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এর আগে ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘুষের এক লাখ টাকাসহ তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে দুদকের একটি বিশেষ টিম।
ঘুষের বিনিময়ে জাল দলিল তৈরির অভিযোগে গত বছরের ২৩ অক্টোবর ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গার তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার তনু রায়ের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
ওই চারজনসহ গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৮ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে মামলা ও চার্জশিট দেয় দুদক। অভিযুক্তদের তালিকায় অপর সাব-রেজিস্ট্রাররা হলেন মনিন্দ্রনাথ বর্মণ, সুব্রত কুমার দাস, ইব্রাহিম আলী, রফিকুল ইসলাম, বসু প্রদীপ কুমার, আব্দুল হান্নান, শাহজাহান মোল্লা, তাপস কুমার রায়, সাবিনা ইয়াসমিন, আব্দুর রশিদ মণ্ডল, এছাহাক আলী মণ্ডল, নূরুল আমিন তালুকদার এবং আরও দুজন সাব-রেজিস্ট্রার, যারা ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
এদিকে ভূমি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনে ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি ও নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে গোপনে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে এখনই ওই সাব-রেজিস্ট্রারদের নাম প্রকাশ করতে আগ্রহী নন দুদক কর্মকর্তারা। তবে উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত হাতে পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম প্রকাশ করা হবে বলে দুদকর সূত্রটি জানিয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অন্তত ১৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে দুদক। এ ছাড়া আইন মন্ত্রণালয়ও ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘুষ-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ১০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত আরও অন্তত ১৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে মামলা ও চার্জশিট দেয় দুদক।
দুদকের আইনগত ব্যবস্থা
আট কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রার মোশারফ হোসেন চৌধুরী ও তার স্ত্রী মারজাহান বেগমের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে আগস্ট মাসে মামলা করে দুদক। ঘুষের লাখ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার হওয়া সাব-রেজিস্ট্রার পার্থ প্রতীম মুখার্জির বিরুদ্ধে ওই মাসেই আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য ঘুষ নেওয়ার সময় দুদক টিমের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার পার্থ প্রতীম মুখার্জি।
দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয় গাজীপুরের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার খোন্দকার গোলাম কিবরিয়া, একই অফিসের পূর্বতন সাব-রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারা বেগম ও মোজাহেরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তারা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার মাধ্যমে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭২ টাকা রাজস্ব ফাঁকির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অবৈধ উপায়ে অন্তত তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করায় সাব-রেজিস্ট্রার দম্পতি মজিবুর রহমান ও ইসরাত জাহান, সাড়ে ৯ কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ময়মনসিংহের ভালুকার সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম, অবৈধ উপায়ে ৮০ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল ইসলাম, দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নরসিংদীর সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নিহার রঞ্জন বিশ্বাস, দেড় কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার শাহজাহান আলী, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রার বসু প্রদীপ কুমার, ঘুষের বিনিমিয়ে সরকারি সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে এক ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার অভিযোগে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল হান্নান এবং আড়াই কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার (আইআরও হয়ে অবসর) জসিম উদ্দিন ভূঁঞার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থা
ঘুষ-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করার অভিযোগে একই বছরের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সাব-রেজিস্ট্রার পারভীন আক্তারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ১৫ একর জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ১২টি দলিল রেজিস্ট্রি করেন। এতে রাষ্ট্রের ১ কোটি ২৬ লাখ ৩৯ হাজার ২২৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। একই মাসে ঘুষের বিনিময়ে প্রতিবন্ধীর দলিল বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রি করায় বরগুনা জেলার আমতলীর সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আফসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। সরকারি ফির অতিরিক্ত টাকা আদায় করায় নরসিংদী জেলার শিবপুর সাব-রেজিস্ট্রার মিজাহারুল ইসলামকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বরখাস্ত করা হয়। একই ধরনের অভিযোগে চুয়াডাঙ্গার সাব-রেজিস্ট্রার মামুন বাবরের বেতনের গ্রেড নামিয়ে দেওয়া হয়। ঘুষ-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করার অভিযোগে আশাশুনি উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার দুলাল কুমার চৌধুরীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তবে তাকে তার চাকরির সব সুবিধাদি পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থ আত্মসাৎসহ চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার মো. খায়রুজ্জামান মণ্ডল, মুন্সীগঞ্জের শ্রীপুরের সাব-রেজিস্ট্রার রেহানা বেগম, কুষ্টিয়া সদরের সুব্রত কুমার সিংহ, নরসিংদীর সাব-রেজিস্ট্রার নীহার রঞ্জন বিশ্বাস, ভোলার তজুমদ্দিনের সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় আইন মন্ত্রণালয়।