২০১৬ সালের জুন মাস। বাবা মো. আবদুল বাসেদ মোল্লার সঙ্গে বাড়ির পাশে মসজিদে এশার নামাজ পড়ে বের হতেই সাদাপোশাক পরা গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা আটক করেন মো. তুহিন মোল্লাকে। ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার পরপরই বগুড়ায় ডিবি অফিসে যান সবজি বিক্রেতা মো. আবদুল বাসেদ। জানতে চান কী অপরাধে তার ছেলেকে ধরা হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেন ডিবি কর্মকর্তারা।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দাড়াইল এলাকার তুহিন মোল্লাকে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর তার লাশ পাওয়া যায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মালঞ্চা গ্রামে একটি মাঠে। বগুড়া পুলিশ লাইনসে থাকা ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত বন্দিশালায় এভাবে অনেককেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে কার ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা বলতে পারেন না সেখানে দিনের পর দিন আটক থাকা গাবতলী উপজেলার আবু বক্কর, দুপচাঁচিয়া উপজেলার শিহাব, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মো. ফারুক, মো. ওসমান ও মো. হাসুর মতো আরও অনেকেই। ঢাকায় গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি গণমাধ্যমে বগুড়া পুলিশ লাইনসের বিষয়টি তুলে ধরলে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে পাওয়া যায় হত্যা ও নির্যাতন সম্পর্কে নানা তথ্য।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গুলিতে নিহত তুহিন মোল্লাকে আল্লাহর দল নেতা পল্লি চিকিৎসক ডিপটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলেও এজাহারে তার নাম ছিল না। প্রাথমিক তদন্তেও ডিপটি হত্যার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা খুঁজে পাননি সিআইডি কর্মকর্তারা।
গাইবান্ধায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানায়, ২০১৬ সালের জুনের শুরুতে বগুড়া পুলিশ তাদের জানিয়েছে, ২০১৫ সালে দিনের আলোয় ডিপটিকে গুলি করে হত্যার সঙ্গে জড়িত আছেন তুহিন মোল্লা। গাবতলী উপজেলার দাড়িয়াল গ্রামের ওই তরুণকে বগুড়া পুলিশ লাইনস থেকে ২০১৬ সালে ৯ জুন গাইবান্ধায় নিয়ে যান সিআইডির সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মো. আব্দুল হান্নান।
ডিপটি হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল হান্নান বলেন, ‘তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হই, তুহিন ডিপটি হত্যার ঘটনা কিছুই জানতেন না এমনকি এজাহারে তার নামও ছিল না।’ তিনি জানান, তুহিনকে গাইবান্ধায় আনার কিছুক্ষণ পর ওপর থেকে নির্দেশ আসে তাকে গাইবান্ধা জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার। এ নির্দেশের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় তুহিনকে। অবসর নেওয়ার পর এসআই আব্দুল হান্নান বলেন, ‘তুহিনকে জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের সময় সে আমার হাত-পা ধরে অনুরোধ করে তাকে যেন হত্যা করা না হয়। কিন্তু যেদিন তাকে হস্তান্তর করা হয়, সে রাতেই ক্রস ফায়ারে তুহিন মারা যায়।’
তুহিনের বাবা আবদুল বাসেদ বলেন, ‘মাথার বিভিন্ন অংশে কয়েকটি গুলি করা হয়, পচে যাওয়া লাশ আনার সময় নজরে পড়ে তার পাশেই পড়ে ছিল আরেকটি লাশ।’ তুহিনের মা কোহিনুর বেগম এ হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, ‘ছেলের লাশের কাছে দুর্গন্ধে আমি কাছে যেতে পারছিলাম না। কাফন পরানো ও দাফন করতেও কষ্ট হয়েছে।’
অন্যদিকে বগুড়া পুলিশ লাইনসে একটানা ২২ দিন আটকে রাখা হয় গাবতলী উপজেলার দাড়িয়াল গ্রামের মো. আবু বক্করকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার স্মার্ট ফোন দিয়ে জঙ্গি তৎপরতায় তথ্য আদান প্রদান করতেন। তার দাবি, এখনো তিনি স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন না। আবু বক্কর অভিযোগ করেন, তাকে বাড়ি থেকে ধরে আনার সময় কানে এমনভাবে চাপ দেওয়া হয় যে প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। চোখ বেঁধে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে টুলের ওপর দাঁড় করিয়ে হাত ওপরের দিকে বেঁধে পায়ের নিচ থেকে টুল সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ অবস্থায় তাকে পেছনে লোহার কিছু দিয়ে আঘাত করলে রক্ত ঝরতে শুরু করে। হাতকড়া লাগিয়ে সারা দিন জানালার গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হতো। ফলে বসা ও শোয়া যেত না। আবু বক্কর বলেন, ‘এক দিন চোখ বাঁধা অবস্থায় একজন পুলিশ অফিসারের সামনে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই পুলিশ অফিসার তখন চা-পান করছিলেন, কথা বলতে বলতে তিনি গরম চা আমার মাথায় ঢেলে দেন।’
আবু বক্কর অভিযোগ করেন, ‘তাকে তিনবার জেলগেট থেকেই আটক করা হয় কিন্তু কোন অপরাধে তাকে আটক করা হলো তা কোনোবারই জানানো হয়নি।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্যাতন থেকে বাঁচতে আর মুক্তি পেতে দুই লাখেরও বেশি টাকা দিতে হয়েছে পুলিশকে। আর টাকার শোকে আমার মা মারা গেছেন।’
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানার সাবেক একজন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) জানান, গোবিন্দগঞ্জ থানার বিভিন্ন এলাকার মো. হাসু, মো. ওসমান ও মো. ফারুককে আটক করে বগুড়া পুলিশ লাইনসে রাখা হয় অনেক দিন।
আবু বক্কর সব মিলিয়ে পুলিশের হেফাজতে ছিলেন ৩৯ দিন। এর মধ্যে বেশ কয়েক দিন ছিলেন বগুড়া পুলিশ লাইনসের একটি ঘরে। তখন তিনি জানতে পেরেছেন তার সঙ্গেই আটক আছে প্রতিবেশী তুহিন মোল্লা। অবৈধ ওই বন্দিশালায় আর কাউকে তিনি আটক দেখেছেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, দুপচাঁচিয়ার শিহাবসহ আরও কয়েকজনকে আটক রাখার কথা তিনি জানেন।