অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সংস্কারের বড় একটি দিক হচ্ছে ব্যাংকিং খাত সংস্কার। কিন্তু এখন ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে। নিউইর্য়ক গ্লোব পত্রিকায় গত বৃহস্পতিবার এ নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের একটি আইন নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। এই আইনের উদ্দেশ্য কি আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নাকি অন্য কিছু তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে বিগত সরকারের অনুগত ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হচ্ছে। আইনটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্সে’- সংশোধনী এনেছে। সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন নতুন করে বেশ কিছু ক্ষমতা অর্জন করেছে। সরকারিভাবে এই সংস্কারকে সুশাসন এবং জবাবদিহির হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, শেয়ারহোল্ডারশিপ বাতিল, প্রশাসক নিয়োগ এবং জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো বদলে দেওয়ার ক্ষমতা পেয়েছে।
এই আইন সংস্কারের নেপথ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি আইএমএফের একজন সাবেক অর্থনীতিবিদও।
ড. মনসুর ব্যাংকিং আইনের সংশোধনীকে এই খাতে চলা দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতিকে দূর করে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করলেও সমালোচকরা বলছেন, এর মূল কাজ হলো রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের একটি পথ তৈরি করা।
ব্যাংকিং খাতের এই সংশোধনী আনার পর সরকার এখন ছয়টি বেসরকারি ব্যাংকের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। অনেক পর্যবেক্ষক সরকারের এই উদ্যোগকে ‘বিপদ সংকেত’ হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, টেকসই ও পদ্ধতিগতভাবে সংস্কারের জন্য আইনটি করা হয়নি, এটি করা হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত ব্যবসায়ীদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভেঙে টুকরো টুকরো করার জন্য।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবসায়ীদের সম্পদ জব্দের যে নীলনকশা তৈরি করেছে, তার দীর্ঘদিনের প্রয়োগ দেখা যায় রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। রুশ ভাষায় এই কৌশলকে বলা হয়, ‘রেইডার্স্টভো’। যাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ‘প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি’ বলা হয়ে থাকে। করপোরেটের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য সেখানে নানা কৌশলও গ্রহণ করা হয়। প্রয়োজন হলে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা হয়, যাতে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কেউ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারেন। এর নিশ্চিত ফল হলো সম্পদের রাজনৈতিক হস্তান্তর, যার পোশাকি নাম হলো ‘সংস্কার’।
এই ক্ষেত্রে রুশ সরকারের দুটি কুখ্যাত ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। এর একটি ইউকশ তেল কোম্পানির ঘটনা। ক্রেমলিনের সঙ্গে বিরোধিতার কারণে ২০০০ সালের শুরুর দিকে এই কোম্পানির পতন ঘটে। কর ফাঁকিসহ নানা অভিযোগ দায়ের করা হয় এর মালিক মিখাইল খোদরকভস্কির বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত মিখাইল দেউলিয়া ঘোষিত হন। তার সম্পদ বিক্রি করা হয়। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন রসনেফট ওই সম্পদ কিনে নেয়।
আরেকটি কোম্পানি হলো উইম-বিল-ড্যান। রাশিয়ার ডেইরি খাতের বড় কোম্পানি ছিল এটি। তবে তদারকি আইন ও আর্থিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ার তুলে দেওয়া হয়েছিল পেপসিকোর হাতে।
তদারকি আইন নিয়ে বিভিন্ন দেশে ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে এর সর্বশেষ লক্ষ্য একই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অথবা স্বাধীন শক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভেঙে দিয়ে তার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ গ্রহণই এর মূল লক্ষ্য। উদ্বেগের বিষয় হলো- ড. মনসুর সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ছয়টি বেসরকারি ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় নেওয়া হবে। ব্যাংকগুলোকে ‘শক্তিশালী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের’ হাতে তুলে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশে এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল টার্গেট হলো এস আলম গ্রুপ। চট্টগ্রামভিত্তিক এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মূল শেয়ারের মালিক। গত এক দশকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি স্টিল, বিদ্যুৎ, শিপিং ও আর্থিক খাতে তার পদচিহ্নের বিস্তার ঘটিয়েছে। অভিযোগ করা হয়ে থাকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সখ্য ছিল।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সহযোগীদের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পরিবর্তন করেছেন। আর্থিক খাতের বিরাজমান সংকট নিরসনের পরিবর্তে তারা এখন এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন। তাদের লক্ষ্য হলো- বিগত সরকারের অনুগত ব্যবসায়ীদের কলিজায় হাত দেওয়া।
সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধুই একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের অন্তত ১০টি ব্যবসায়িক গ্রুপের বিরুদ্ধে সরকার এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে।
গ্রুপগুলো হলো বসুন্ধরা গ্রুপ, বেক্সিমকো, সিটি গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, পারটেক্স গ্রুপ, একে খান গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, প্রাণ আরএফএল ও নাভানা গ্রুপ। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের তদারকি বাড়িয়েছে। তাদের অডিট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তাদের সম্পদের উৎস খুঁজে বেড়াচ্ছে।
এসব গ্রুপ বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যবসা কল-কারখানার মধ্যে তফাত থাকলেও একটি দিক দিয়ে মিল রয়েছে যে তাদের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের সখ্য ছিল।
নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনি সংস্কারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো গড়ে তুলতে চাচ্ছে। অথচ এই সরকারের পার্লামেন্টের কোনো ম্যান্ডেট নেই। তবে দুর্নীতি দমনের ন্যারেটিভে তাদের জনসমর্থন রয়েছে।
হয়তো যে কেউ একমত হবেন যে ব্যাংকিং খাতের একটি অংশের সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু বিশেষ একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে যখন এসব তদারকি সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়, তখন বাংলাদেশের রেগুলেটরি সিস্টেমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এই অবস্থায় পারস্য উপসাগীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলবেন, বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কি নিরাপদ, বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে।
এর ফলে যে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হবে, তাতে সামষ্টিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জোরপূর্বক ব্যাংকের কাঠামো পরিবর্তন আমানতকারীদের আস্থায় চিড় ধরাতে পারে। এর ফলে ঋণপ্রবাহ কমতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগের গতিপ্রবাহকেও থমকে দিতে পারে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক খাত ভেঙে পড়তে পারে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস ও আস্থা খুব জরুরি।
তত্ত্বগতভাবে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্সের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে নীতি ও কৌশল প্রয়োগ করছে সরকার তার সঙ্গে রাশিয়ার ‘রেইডার্স্টভো’র যথেষ্ট মিল রয়েছে।