রাজধানীসহ সারা দেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। গত সোমবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ইশরাক হোসেনের বৈঠকের পর আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। কারণ ওই বৈঠকে ব্যানারে ইশরাক হোসেনের নামের আগে ‘মাননীয় মেয়র’ লেখা হয়। মঙ্গলবার সভা করেন দক্ষিণের সব ওয়ার্ডের সচিব ও সাবেক কাউন্সিলরদের সঙ্গে। সেখানেও একই ধরনের ব্যানার ছিল। এদিন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্যে ইশরাক হোসেন বলেছেন, তার এই ইস্যুটি নগর ভবনকেন্দ্রিক নয়, এটি সম্পূর্ণ জাতীয় এবং রাজনৈতিক ইস্যু। এর আগেও তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক কারণেই তাকে শপথ পড়তে দেওয়া হচ্ছে না।
কিন্তু কীভাবে এই রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি হলো? খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, বিএনপির প্রতিপক্ষ একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রতিটা ওয়ার্ডে প্রশাসক বসানোর জন্য প্রক্রিয়া শুরু করা হলে বিএনপি এ বিষয়ে নড়েচড়ে বসে। ইতোমধ্যে ওই দলটির পক্ষ থেকে আগ্রহীদের সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করা হয়। তা ছাড়া উত্তর সিটি করপোরেশনে ওই দলটির পক্ষ থেকে প্রশাসককে নিয়োগ দেওয়া হলে এই আলোচনা আরও জোরদার হয়। বলা হয়, এই দলটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের পছন্দের লোক বসানো হচ্ছে। ফলে বিএনপি আর দক্ষিণের বিষয়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি। তখন পরিকল্পনা হয় দক্ষিণ সিটি কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেওয়া যাবে না। ওই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আরেকটি রাজনৈতিক দলও যুক্ত হয়ে দক্ষিণে বিএনপিকে কোণঠাসা করে দখলে রাখার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্যের চেষ্টার কথাও শোনা যায়। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা নিয়েও টালবাহানা চলতে থাকে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতারা বিএনপির সিনিয়র নেতাদের উদ্দেশ্যে বেপরোয়া বক্তব্যও দিতে শুরু করেন। তখন দলটির নেতারা মনে করেন, ছোট-ছোট ছেলেমেয়ের সঙ্গে তাদের ‘খেলা’ মানায় না। সে জন্য বেছে নেন বয়সে তরুণ নেতা ইশরাক হোসেনকে। আর বিএনপি ইস্যু হিসেবে বেছে নেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এটা দিয়ে বিএনপি এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করার কৌশল গ্রহণ করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ইশরাক হোসেনের ২০২০ সালে করা মামলাটি উজ্জীবিত করা হয়। সেই মামলার রায়ে প্রথম চালেই ইশরাক হোসেনের প্রতিদ্বন্দ্বী ওই দুই রাজনৈতিক দলকে চাপে ফেলে দেয় বিএনপি। রায়ের পর লন্ডনে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইশরাক হোসেন। সেখানে তিনি প্রায় এক সপ্তাহ অবস্থান করেন। এরপর অনেক দিন গড়িমসির পর অবশেষে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে। এরপর গেজেট স্থগিত চেয়ে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিবে কি না তা জানতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়। যার এখতিয়ার স্থানীয় সরকারের নেই বলে ইশরাকের আইনজীবীরা অভিযোগ তোলেন। এরপর কে কার প্রতিপক্ষ তা জনসমক্ষে দৃশ্যমান হয়। এদিকে ততদিনে নগর ভবন দখলে নিয়ে আন্দোলন করে অচল করে দেন ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা। নগর ভবন থেকে আন্দোলন করতে করতে তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে চলে আসেন। কয়েকদিন কার্যত ওই এলাকা অচল থাকে। ইশরাক হোসেনকে মেয়রের দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার জোরালো আন্দোলন চলতে থাকে। সেখানে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে একটি দলের প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করে তাদের পদত্যাগ দাবি করা হয়। যমুনার কাছে আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ইশরাক হোসেন বলেন, মেয়রের জন্য আন্দোলন নয়, এটি ডিসেম্বরে নির্বাচনের আন্দোলন।
প্রথম রিট খারিজের পর আবার আপিল করেন রিটকারী। তাও আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন। তারপরও ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়নি। ঈদের ছুটিতে আন্দোলনে বিরতি দেওয়া হয়। এতদিনেও নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা স্থানীয় সরকার থেকেও শপথের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই গত রবিবার থেকে আবার ঢাকাবাসীর ব্যানারে আন্দোলন শুরু করা হয়। আন্দোলনের পাশাপাশি জনভোগান্তি কিছুটা হলেও কমাতে জরুরি সেবা চালুর ঘোষণা দেন ইশরাক হোসেন। এরই মধ্যে গত সোমবার স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বলেছেন, শপথ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনাধীন থাকা অবস্থায় গেজেটের মেয়াদ শেষ হওয়ায় শপথ পড়ানো যায়নি।
এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেছেন, ‘তার (স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা) এ কথা সত্য হলে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি আর শপথ পড়ার সুযোগ পাবেন না। অর্থাৎ বিজয়ী প্রার্থীর নামে গেজেট প্রকাশিত হলে পরাজিত প্রার্থী অথবা যেকোনো একজন নাগরিককে সজীব ভূঁইয়ার মতো একজন ব্যক্তি ইন্ধন দিয়ে শপথ না পড়ানোর জন্য মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট মামলা করবেন। আর ওই রিট মামলা ৩০ দিন অনিষ্পন্ন থাকলে গেজেটে উল্লিখিত ৩০ দিনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে কোনো জনপ্রতিনিধি শপথ পড়ার সুযোগ পাবেন না।’
তিনি বলেন, ‘গেজেট পেয়ে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের কিছুই করণীয় নেই। তবে শপথ অনুষ্ঠানকে বিলম্ব করার জন্য ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন আপিল করবে কিনা, নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে আরজি সংশোধনের সুযোগ নেই ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন তুলে কালবিলম্ব করে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে বিরত থাকে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘মূলত স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য তার পছন্দের একজন ব্যক্তিকে প্রশাসক নিয়োগ করে আর্থিক ও রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।’
গতকাল বেলা সোয়া ১২টার দিকে নগর ভবনে সংবাদ সম্মেলনের পর পৌনে ১টার দিকে সব ওয়ার্ডের সচিব ও কিছু সাবেক কাউন্সিলরের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ইশরাক হোসেন। এর আগে সকাল থেকে নগর ভবনে জড়ো হয়ে ঢাকাবাসীর ব্যানারে ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এদিনও নগর ভবনে তালা ঝুলানো ছিল।
প্রশাসক, প্রধান নির্বাহীসহ কর্মকর্তাদের কেউ আসেননি। গত ১৪ মে থেকে ইশরাক হোসেনকে মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার আন্দোলন চলছে। সেই থেকেই তারা আসেন না। আর তখন থেকে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ও সচিবকে নগর ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
গতকাল নগর ভবনের বৈঠকে ইশরাক হোসেন ঢাকার সমস্যা সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ তিন মেয়াদে পরিকল্পনা করে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। নগর ভবনকে একটি সেবার কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে ভবিষ্যতে গড়ে তোলারও ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিক সনদ- এই কার্যক্রম ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই এবং সেটি কোন পন্থায় হবে, তা আলোচনা করেছি। আপনারা যারা ওয়ার্ড সচিব রয়েছেন আঞ্চলিক প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে এই কাজটি করে জনগণকে সেবা দেবেন। চলমান আন্দোলন ও নানা ধরনের চাপ অস্থিরতার মধ্যে জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ডভিত্তিক আমরা যেভাবে পরিকল্পনা সাজিয়েছি, আগামীতে আপনারা সেই ভাবে সেবাগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। নগর ভবনকেন্দ্রিক যে আন্দোলনটি হচ্ছে এটি চূড়ান্ত লক্ষ্যে যাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে যেটা বলেছি- এটা জাতীয় ইস্যু- রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে আপনাদের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। জনগণের জন্য যতটুকু সম্ভব সেবা- তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং যত দ্রুততম সময়ে সম্ভব সমাধান করার অনুরোধ করছি।’