বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন থাকে সন্তানদের নিয়ে। সন্তান লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবে।
মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু সেখানে ছোবল দিচ্ছে মাদক। মরণনেশায় আসক্ত হচ্ছে সন্তানরা আর ভেঙে যাচ্ছে বাবা-মায়ের স্বপ্ন। সম্ভাবনাময় তরুণ-কিশোররা চলে যাচ্ছে অন্ধকার পথে। সন্তানের মাদকে জড়িয়ে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা। আসক্ত কিশোর বা তরুণরা নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি দুর্বিষহ করে তুলছে পরিবারের সদস্যদের জীবন।
গত ছয় মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অর্থায়নে মাদকসেবীদের নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। সেই গবেষণার তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা ৮৩ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ লাখ ৬০ হাজার পুরুষ, নারী পৌনে ৩ লাখ ও আড়াই লাখের মতো শিশু রয়েছে। যাদের ৬৩ শতাংশই তরুণ ও কিশোর-কিশোরী। অথচ এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখের কিছু বেশি। দেখা যাচ্ছে, গত ৭ বছরে মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি।
এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ) উপপরিচালক মো. মানজুরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আরও বেশি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে তরুণ-কিশোররা বেশি আসক্ত হচ্ছে। এমনকি শিশুদের সংখ্যাও সেখানে কম নয়।
তিনি বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ডিএনসি। বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও পোস্টারের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া অভিযানে গত বছরের চেয়ে এ বছর মাদক ধরা পড়েছে বেশি। মামলা হচ্ছে ও দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
মাদকাসক্ত সন্তান নিয়ে বিপাকে আছে এমন একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে গাঁজা ও ইয়াবা পাওয়া যায়। স্কুলে বন্ধুদের মাধ্যমে আসক্ত হয় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। প্রথম বুঝতে না পারলেও পরে সন্তানের অস্বাভাবিক আচরণের কারণে তারা তা বুঝতে পারেন। পরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে ডোপ টেস্টের পরে তা আরও ভালোভাবে নিশ্চিত হন।
রংপুর থেকে তমাল আহম্মেদ (ছদ্মনাম) নামে মাদকাসক্ত এক তরুণ চিকিৎসা নিচ্ছেন ডিএনসির তেজগাঁওয়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে। এই তরুণের অভিভাবক খবরের কাগজকে বলেন, ‘গাঁজার নেশায় আসক্ত হয়েছিল এই তরুণ। ঘরে ভাঙচুর থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের গায়েও হাত তুলত। এর আগেও এখানে চিকিৎসা করিয়েছি। তখন বেশ উন্নতি হয়েছিল। তাই আবার নিয়ে এসেছি।’
রাজধানীর আদাবরে এক চিকিৎসকের সন্তান ৩৫ বছর বয়সের আদনান (ছদ্মনাম) মাদকাসক্ত। এখানে আটতলা একটি বাড়ির মালিকও তার বাবা। পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করলে পরিবার তা মেনে নেয়নি। একপর্যায়ে হয়েছে বিচ্ছেদ। পরে পরিবারের ওপর অভিমান করে মাদকের পথ বেছে নেন আদনান।
আদনানের মা খবরের কাগজকে বলেন, “ভালো চিকিৎসক দেখিয়েছি, নিরাময় কেন্দ্র বেশ কয়েক মাস রাখা হয়েছিল। তবে তাকে পুরোপুরি সুস্থ করা যায়নি। এই ছেলের জন্য আমাদের জীবন ‘জাহান্নাম’ হয়ে গেছে।”
সম্প্রতি রাজধানীর কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে ছিল এক ছিন্নমূল কিশোর। পুরো শরীরে নোংরা কালিঝুলি মাখা। মাথায় উষ্কখুষ্ক চুল, পরনে ছেঁড়া টি-শার্ট আর হাফ প্যান্ট। কাছে যেতেই দেখা গেল হাতে কুঁচকানো পলিথিন, যা নাকের কাছে নিয়ে জোরে টান দিচ্ছে। পলিথিনের ভেতর একধরনের হলুদ রঙের আঠালো পদার্থ। এই পদার্থের নাম ‘ড্যান্ডি’। নাম জানতে চাইলে ওই কিশোর জানায়, জানি না, নাকে ধরা পলিথিনের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বলে ওঠে, নেশা করতাছি, ভাল্লাগে।
২০২২ সালে প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ও ইউনিসেফের একটি যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী মাদকাসক্ত পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার।
কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট ডা. কাজী লুৎফুল কবির খবরের কাগজকে বলেন, নিরাময় কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত গাঁজায় আসক্ত রোগী বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে কয়েকটা দিন পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকলে সুস্থ হয়ে যাবে এমন নয়। এর জন্য সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সুস্থ করতে ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
তিনি বলেন, এখানে চিকিৎসা নিয়ে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। তবে চিকিৎসা শেষে রোগীকে এক বছর ফলোআপ করতে হয়। এই কাজটি বেশির ভাগ পরিবার করে না। ফলে নিরাময় কেন্দ্র থেকে বের হয়ে গিয়ে তারা আবারও নেশায় জড়িয়ে পড়ে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশে মাদক উৎপাদন হয় না। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো বাংলাদেশে মাদক কারবার চলে আসছে অনেক আগে থেকেই। মাদক উদ্ধার গত বছরের চেয়ে এ বছর বেড়েছে, মামলা-শাস্তিও হচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাত-দিন এক করে কাজ করছে। দেশকে মাদকমুক্ত করাই আমাদের ব্রত। আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।’
গত বছরের নভেম্বরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্যবহার নীতিমালা অনুমোদন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে সময় জানা যায়, অস্ত্র পেতে যাচ্ছেন অধিদপ্তরের চারটি পদের কর্মকর্তারা। অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্যবহার নীতিমালা অনুমোদন হলেও পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলো এখনো শেষ হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। এ ছাড়া অভিযানে নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে। অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্যবহার নীতিমালা অনুমোদন হলেও তা এখনো পায়নি অধিদপ্তর। অস্ত্র পেলে অভিযান আরও জোরালো হবে।’
এ বিষয়ে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, মাদকের সহজলভ্যতা কারণে উপার্জন সক্ষম মানুষের পাশাপাশি বেকার যুবক-শিক্ষার্থীরাও সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ দায়িত্বশীলদের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। এই সুযোগে মাদক কারবারিরা রমরমা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে এখন মাদকের মহামারি চলছে।