গত ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় শিশুসহ বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনার পর আলোচনায় আসছে রাজধানী ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনা নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামার ঝুঁকি নিয়েও। তবে এত বড় দুর্ঘটনার পরও রাজধানীর আকাশে সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ছয়টি এয়ারফিল্ড পড়ে থাকলেও জনাকীর্ণ ঢাকার আকাশেই কেন প্রশিক্ষণ বিমান চালাতে হবে- এমন প্রশ্ন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মহলের। পাশাপাশি এই খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাইলস্টোনের প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুতই শাহজালালের আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। যেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি কম হয়।
অ্যাভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন রাজধানীর আকাশে গড়ে ১০ থেকে ১২টি সামরিক বিমান এবং কয়েকটি বেসরকারি প্রশিক্ষণ ফ্লাইট উড্ডয়ন করে। অথচ এসব প্রশিক্ষণের জন্য ঈশ্বরদী, শ্রীমঙ্গল বা সৈয়দপুরের মতো তুলনামূলক নিরাপদ ও খোলা আকাশপথ রয়েছে। তা সত্ত্বেও এসব স্থানে প্রশিক্ষণ বিমান চালানোর বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি দুর্ঘটনা ঘটার পরও বিমানবাহিনী কিংবা বেবিচক রাজধানীর আকাশপথ থেকে প্রশিক্ষণ ফ্লাইট সরিয়ে নিতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ আন্তর্জাতিক সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ফ্লাইট অপারেশন জনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে পরিচালনা করতে হবে। তাদের অ্যানেক্স-১৪ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণের জন্য এমন এলাকা নির্বাচন করতে হবে, যা জনবসতি থেকে দূরে, শব্দদূষণ কম এবং বিপদের ঝুঁকি কম থাকে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব নীতিমালাতেও একই ধরনের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায় না। বরং এসব ঝুঁকিপূর্ণ ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।
এ নিয়ে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অনেকগুলো এয়ারফিল্ড আছে, যেগুলো প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনার জন্য নিরাপদ। কারণ এসব এয়ারফিল্ডের আশপাশে বসতি নেই। কিন্তু সেগুলো বাদ দিয়ে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আকাশে প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনা করা হচ্ছে, যা মোটেও নিরাপদ নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নতুন করে ভাবা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
প্রায় একই কথা বলেন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের আকাশে এমন যুদ্ধবিমানের প্রশিক্ষণ পরিচালনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কেবল প্রশিক্ষণ বিমান ওড়া নিয়েই যে ঢাকা ঝুঁকিতে আছে এমন নয়। ঝুঁকি আছে বিশ্বের সঙ্গে রাজধানী ঢাকাকে যুক্ত করা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের বেশ কিছু এলাকাও।
ঢাকা শুধু প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের কারণে ঝুঁকিতে নেই; বরং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়মিত বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের কারণেও ঝুঁকিতে রয়েছে।
১৯৮০ সালে মূল রানওয়ে এবং কেন্দ্রীয় অংশ খোলার মাধ্যমে বিমানবন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর উদ্বোধন করেন। রাজনৈতিক কারণে আরও তিন বছর লাগে বিমানবন্দরের কাজ শেষ হতে। অবশেষে ১৯৮৩ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে এর উদ্বোধন করেন।
২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামকরণ দেয়। তখন এই বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকার বেশির ভাগই জলাশয় ও খালি ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরটির আশপাশ ঘিরে গড়ে উঠতে থাকে আবাসিক এলাকা। নানা তদবির আর রাজনৈতিক মদদে এখন বিমানবন্দরটির সীমানা ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, যা একেবারেই আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশন আইনের বহির্ভূত। কিন্তু দেশে আইনের ফাঁকফোকর আর অন্যতম দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজউক ও বেবিচক একে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর অজুহাতে ব্যবস্থা নেই এসব অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে।
বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত ৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবচিত্র তার উল্টো- এই এলাকায় অধিকাংশ ভবনই আট থেকে ১০ তলা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিমানবন্দরের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এমনকি বেবিচকের নিজস্ব কার্যালয়টিও একটি বহুতল ভবনে অবস্থিত, যার পাশেই রয়েছে একটি বড় আকারের শপিংমল এবং আরেকটি উঁচু ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। বিমানবন্দরটির রানওয়ে থেকে ৫০০ ফুট সীমার বাইরে যে প্রায় ১৩ হাজার ফুট বা প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ অঞ্চল রয়েছে, সেটি অ্যাপ্রোচ এরিয়া নামে পরিচিত। যেখানে বিমান অবতরণ ও উড্ডয়নের পথ নির্ধারিত থাকে। এই অ্যাপ্রোচ এলাকায় ১৫০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতার স্থাপনা নির্মাণে বৈধতা দিয়েছে সরকারের নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কিংবা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। কিন্তু এই এলাকায় কী ধরনের ভবন গড়ে উঠবে, তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।
এ বিষয়টি উল্লেখ করে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, অ্যাপ্রোচ এলাকা সাধারণত বিমান ওঠানামার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। তাই এই এলাকায় একটি নির্দিষ্ট উচ্চতার ভবন নির্মাণের নির্দেশনা থাকলেও জনসমাগম হতে পারে এমন ভবন হওয়া উচিত নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনেও আছে। কিন্তু বাংলাদেশের এই সংক্রান্ত আইনে তা না থাকায় অনেকেই সুযোগ নিচ্ছে। এমনকি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবস্থান ও অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে অনেক। এ বিষয়ে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে নগর পরিকল্পনাবিদরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাতা, রাজউক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), জেলা প্রশাসন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন- কোনো পক্ষই মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির দায় থেকে মুক্ত নয়। তবু এসব দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কাউকেও নিজেদের দায় স্বীকার করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি। এমনকি মাইলস্টোন স্কুল ভবনটি আদৌ ‘ফ্লাইং জোনের’ মধ্যে পড়ে কি না, এ নিয়েও কেউ স্পষ্ট করে মুখ খুলছে না।
বেবিচকের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন যে অনেক ভবন ফ্লাইং জোনে বা অ্যাপ্রোচ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে বা লিখিত বক্তব্য দিতে কেউই প্রস্তুত নন।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী অ্যাপ্রোচ এরিয়ায় জনসমাগম হয় এমন স্থাপনা যেমন মসজিদ, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দেশের আইনে সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ না থাকায় অ্যাপ্রোচ এলাকায় এগুলো গড়ে উঠছে বৈধভাবেই।’
মাইলস্টোন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বিমানবন্দরের রানওয়ে একই সরল রেখায় অবস্থিত। কোনো উড়োজাহাজ ওঠানামা করলে, তাকে কলেজের ওপর দিয়েই যেতে হবে। ফলে এটি যে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় অবস্থিত, তা এমনিতেই বোঝা যায়। তবে আমরা চাই অ্যাপ্রোচ এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করতে নতুন কমিটি গঠন করা হোক। তাদের পর্যালোচনার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা না ঘটে।’
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, বেবিচক ইতোমধ্যে বিমানবন্দরের রানওয়ের আশপাশে এক হাজারেরও বেশি নিয়ম লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা অতিরিক্ত উচ্চতার ভবন শনাক্ত করেছে। চিঠিও দেওয়া হয়েছে তাদের। তবে কার্যকর কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, দিন যতই যাচ্ছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের আশপাশ ততই ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে সরকারের উচিত এগুলোকে সরানোর পরিকল্পনা নেওয়া। আর যতদিন পর্যন্ত তা সম্ভব হচ্ছে না, ততদিন পর্যন্ত অ্যাপ্রোচ এলাকায় মনিটরিং জোরদার করা। এ বিষয়ে বেবিচককেই কঠোর অবস্থানে যেতে হবে।