ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রস্তুতিমূলক কাজের সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ (পথনকশা) আজ বৃহস্পতিবার ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জানা গেছে, এই রোডম্যাপে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে (রমজানের আগে) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট এবং ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময় ধরেই দুই ডজনের বেশি প্রস্তুতিমূলক কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছে ইসি। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে অংশীজনদের সঙ্গে নির্বাচনি সংলাপ করার ও নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিয়েছে ইসি। নির্বাচনের প্রাক-প্রস্তুতি কার্যক্রমে এরই মধ্যে সংসদীয় ৩০০ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণে ৩৩ জেলার ৮২টি আসনের দাবি-আপত্তির ওপর শুনানি কার্যক্রম ইসি শেষ করেছে।
এদিকে বুধবার (২৭ আগস্ট) কমিশন বৈঠকে নির্বাচনি রোডম্যাপের খসড়া অনুমোদন করেছে ইসি। এ বিষয়ে সংস্থাটির সচিব আখতার আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমরা নির্বাচনকে ঘিরে যে কর্ম পরিকল্পনাটা করেছি, সেটার জন্য আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। আমরা বিস্তারিত জানাব।’
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী সংসদ ভোটের জন্য ইসির হাতে সময় আছে আর মাত্র ৫ মাস। ফলে আইন অনুযায়ী ভোটের ৫০-৬০ দিন আগে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করে নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে এই রোডম্যাপে।
ইসির একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য সংসদ নির্বাচনের মতো এবারের নির্বাচনি রোডম্যাপেও ইসির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক কর্মপরিকল্পনায় প্রাধান্য পেয়েছে অন্তত ১৫ ধরনের কার্যক্রম। সেগুলো হলো- সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ, নির্বাচনি আইনের সংস্কার, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, দল নিবন্ধন, দল ও অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ, নির্বাচনি বিধি ও নীতিমালা জারি, প্রবাসীদের ভোট, নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, ব্যালট মুদ্রণ, নির্বাচনি সরঞ্জাম কেনাকাটা, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন, নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সভা ও ভোটার সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
একই সঙ্গে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকালীন পুরো সময়ে সম্ভাব্য অন্তত ৭টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সেগুলো হলো- নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, ভোটারদের আস্থায় আনা ও ভোটের দিন কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। এ ছাড়া অপপ্রচার ও এআইর ব্যবহার মোকাবিলা, প্রার্থীদের আচরণবিধি মানতে বাধ্য করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও মাঠে দায়িত্বরতদের নিরপেক্ষতা এবং ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমুক্ত রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ইসি।
এদিকে রোডম্যাপ ঘোষণার আগেই নির্বাচনের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ ইতোমধ্যে এগিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এসবের মধ্যে অন্যতম হলো সংসদীয় ৩০০ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা। সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে এবার ৮৩টি আসন থেকে ১ হাজার ৭৬০টি দাবি আপত্তি আবেদন ইসিতে জমা পড়ে। গতকাল নির্বাচন ভবনে শেষ হয়েছে ইসির প্রকাশিত খসড়া সীমানার ওপর দেশের ৩৩ জেলার ৮২টি সংসদীয় আসন থেকে করা দাবি-আপত্তির ওপর ৪ দিনব্যাপী শুনানি কার্যক্রম। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, শুনানির পর এবার যত দ্রুত সম্ভব সংসদীয় আসনগুলোর সীমানার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, ‘দাবি-আপত্তিগুলোর ওপর ওপর শুনানি করেছি। শুনানিতে আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার, অপর চারজন কমিশনার এবং সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। প্রথম দিন ২৪ আগস্ট ৬টি জেলার ১৮টি আসনের ওপর মতামত শুনেছি। ২৫ আগস্ট ৯টি জেলার ২০টি আসন নিয়ে আবেদনকারীদের কথা শুনেছি। ২৬ আগস্ট ঢাকাসহ ৬টি জেলার ২৮টি আসন এবং গতকাল ২৭ আগস্ট ১২টি জেলার ১৮টি আসন থেকে আসা দাবি-আপত্তির ওপর শুনানি গ্রহণ করা হয়।’
শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের খসড়া প্রস্তাবের বিপক্ষে ১ হাজার ১৮৫টি এবং পক্ষে ৭০৮টি প্রস্তাব বা মতামত তুলে ধরা হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট থেকে চলে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ইসির এই শুনানি। এ পর্যায়ে শুনানিতে পাওয়া মতামতগুলো লিপিবদ্ধ করে পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে অক্টোবরের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর নিবন্ধন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংস্কার, আচরণবিধিমালা জারি, ভোটার তালিকাসহ সব কিছু চূড়ান্ত হয়ে যাবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট নিতে প্রয়োজনীয় অ্যাপসহ আনুষঙ্গিক কাজ এবং তরুণ ভোটারদের নিয়ে সম্পূরক ভোটার তালিকার কাজ নভেম্বরে শেষ করতে চায় ইসি। সেই লক্ষ্যে হালনাগাদের পর খসড়া ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবে ৩১ আগস্ট। পাশাপাশি সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে অক্টোবরে। ৩১ অক্টোবর ভোটারযোগ্য তরুণদেরও জাতীয় নির্বাচনের সুযোগ দিতে আরও একটি সম্পূরক তালিকা করা হবে। এরপর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। এ ছাড়া প্রবাসী ভোটারদের জন্য প্রথমবারের ভোটাধিকার দিতে অনলাইন নিবন্ধন অ্যাপ ও পোস্টাল ব্যালটের বিষয়টি নভেম্বরের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবাসীদের জন্য আইটি সাপোর্টেড নিবন্ধন ও পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি প্রক্রিয়াধীন, চূড়ান্ত হলে পদ্ধতি নিয়ে প্রচারণা।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ছোটখাটোসহ অন্তত ৪৪টি বিষয়ে সংস্কার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এগুলোর জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। এ ছাড়া দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি সংস্কার সাপেক্ষে অনুমোদন করা হবে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে রাজনৈতিক দলগুলোসহ অংশীজনদের সঙ্গে নির্বাচনি সংলাপ করবে ইসি। নতুন দলের নিবন্ধন বাছাই শেষে বাদ পড়েছে ১২১টি আবেদন। বাছাইয়ে টিকে থাকা ২২টি দলের অস্তিত্ব, কার্যকারিতা মাঠপর্যায়ে তদন্ত চলছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এবার অন্তত ৩১৮টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার আবেদন বাছাই করছে ইসির কমিটি। অক্টোবরে-নভেম্বরে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের ব্রিফিং, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্তমন্ত্রণালয় সভা, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কার্যক্রম, ম্যানুয়াল ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা মুদ্রণ, ভোটকেন্দ্রের সম্ভাব্য তালিকা ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত, নির্বাচনি সরঞ্জাম কেনাকাটা সরবরাহ, বিতরণের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
আগামী ভোটের সময় নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব করে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। সেই লক্ষ্যে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটের অনিয়ম তদন্তে একটি কমিশনের কাজ চলছে। আলাদাভাবে তিন নির্বাচনে সম্পৃক্তদের বিষয়ে মামলাও হয়েছে। ইতোমধ্যে বিগত তিন নির্বাচনের ভোট গ্রহণে কর্মকর্তা, নির্বাহী হাকিমদের তালিকাও সংগ্রহ করছে পুলিশের একটি সংস্থা। নির্বাচন কমিশনও বলছে, অনিয়মে সম্পৃক্ত ছিল এমন কর্মকর্তাদের এবার দায়িত্বে রাখা হবে না। সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, শিক্ষক ও ব্যাংকাররা ভোট গ্রহণে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকেন। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার মিলিয়ে প্রায় সোয়া ৯ লাখের মতো লোকবল দরকার হতে পারে আগামী সংসদ নির্বাচনে।
সংসদ নির্বাচনের আগে এবার সাড়ে ১১ লাখ মানুষকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২৯ আগস্ট কোর ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সংসদ নির্বাচনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এটা চলবে প্রায় ৫ মাস। এ সময়ে প্রায় ১১ হাজার (১০৮৫০) জন রাজনৈতিক কর্মীকে ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেবে ইসি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা তাদের দলীয় পোলিং এজেন্টদের দায়িত্ব-কর্তব্য, ভোট গ্রহণের নিয়ম-কানুন এবং আইন ও বিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেবেন।
এ বিষয়ে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) মহাপরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, সবমিলিয়ে এবার ২৩ ধরনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে ইটিআই। এর আওতায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার ব্যক্তিকে ট্রেনিং দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে আছেন ১০ লাখ ৮৯ হাজার প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং এবং পোলিং কর্মকর্তা। নির্বাচনে ৪৫ হাজার ভোটকেন্দ্র হতে পারে, এমনটা ধরে এই সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা কমে এলে প্রশিক্ষণার্থী ভোট গ্রহণ কর্মকর্তার সংখ্যাও কমবে। এ ছাড়া যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে তারা নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক ও দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও। তাদেরও দিনব্যাপী নির্বাচনি প্রশিক্ষণ দেবে কমিশন। যদিও ওই প্রশিক্ষণের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওরিয়েন্টেশন বা ব্রিফিং’। কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ে পৃথকভাবে এসব প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাঠ প্রশাসনে শৃঙ্খলা রক্ষাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ইসি। এক্ষেত্রে ৫টি বিশেষ সমন্বয় ও তদারকি কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি। চারজন নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে এই কমিটিগুলো কাজ করবে। প্রতিটি কমিটিতে একজন কমিশনারের নেতৃত্বে ৭ জন সদস্য কাজ করবেন। আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বে আছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ; তিনি একই সঙ্গে প্রবাসী ভোট ও দেশি- বিদেশি পর্যবেক্ষক সমন্বয় কমিটির দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনি আইন বিধি-প্রবিধিবিষয়ক কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ। মাঠ প্রশাসন সমন্বয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। এ ছাড়া নির্বাচনে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম তদারকি কমিটির নেতৃত্ব দেবেন নির্বাচন কমিশনার তহমিদা আহমদ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের সব কাজ গুছিয়ে রাখতে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পর এসব বিশেষ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন।