বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতিবাজদের অনেকের কারখানা এখন বন্ধ। এদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন। অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকের কারখানার শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। মালিকদের অনেকের বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত ৫৫টি কারখানার মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব কারখানার সম্পদের পরিমাণ চিহ্নিত করে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এসব কারখানার অনেকের মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দাপ্তরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। এসব দাপ্তরিক জটিলতা কবে নাগাদ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে তা অনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আত্মগোপনে থাকা বা গ্রেপ্তার হওয়া মালিকরা ও তাদের প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি ও রাজস্বখেলাপি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও রাজস্ব পাওনার পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি।
তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) খবরের কাগজকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত। এ খাতে গতি আনতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শঙ্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। করোনার পর থেকেই তৈরি পোশাকশিল্প সংকটে আছে। এই মহামারি রোগের শেষ না হতে ডলারসংকটের কবলে পড়েছে দেশ। বিগত সরকারের সময়ের অনেক কারখানা এখন বন্ধ অথবা প্রায় বন্ধ। এখানে তো আমাদের বলার কিছু নেই। কারণ অনিয়ম করে ধরা পড়লে সবাইকে আইনের আওতায় আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় থাকা উচিত নয়।’
ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক মালিক কারখানা বন্ধ রেখে পালিয়ে গেছেন। তাদের কারখানাগুলোর বেশির ভাগের শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়নি। অনেকে আরও বেশি অন্যায় করেছেন। রাজস্ব ও ঋণ ফাঁকি দিয়েছেন। ওই সব কারখানার মালিকদের সম্পদ বিক্রি করেও সরকারের পাওনা আদায় হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, তবে আশার কথা বর্তমান সরকারের সময়ে অনেকে নতুন করে এ ব্যবসায়ে আসছেন।
গতকাল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে মালিক পক্ষের গাফিলতি এবং দীর্ঘ দিন বিদেশে অবস্থান করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনটি গার্মেন্টসের মালিকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন- টিএনজেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন শামীম, ডার্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান ইত্তেমাদ উদ দৌলাহ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল উদ দৌলাহ এবং রোর ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুল ইসলাম। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম আদালত, গাজীপুর এবং প্রথম ও তৃতীয় শ্রম আদালত, ঢাকায় দায়ের করা মামলাকে ভিত্তি করে সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেসব ব্যক্তি শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করে আত্মগোপনে আছেন তারা অপরাধী। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা হবে। এ জন্য সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যারা শ্রমিকদের প্রতি অন্যায় করবে তাদের প্রতি কঠোর হব। শ্রম অধিকার লঙ্ঘন ও সংশ্লিষ্ট আইনগত অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো চলমান রয়েছে। অভিযুক্তদের দেশে ফেরত এনে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা প্রদানে জন্য যা করার প্রয়োজন সরকার তা করবে।
এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে কি না, তা জানতে চাওয়া হলে উপদেষ্টা বলেন, এতে ভাবমূর্তি বাড়বে। এটা প্রমাণ হবে যে, বাংলাদেশ শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় অনেক বেশি তৎপর।
কারখানা মালিক/ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল (এনসিবি) কর্তৃক স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ ইন্টারপোল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি তৈরি পোশাক খাতকে ঘিরে ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে বটে, তবে এটিকে পূর্ণাঙ্গ সুবাতাস বলা যায় না- এমন মন্তব্য করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘শঙ্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে তৈরি পোশাক খাত। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধা পাবে- এমন আশা করলেও সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, তা যথেষ্ট না। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপে প্রতিযোগী কিছু দেশের বাজার সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশ একটি সম্ভাব্য সুবিধার অবস্থানে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১০২টি পণ্য রপ্তানি করছে, যেখানে ভিয়েতনাম ৫০০-টিরও বেশি, ভারত প্রায় ১,০০০, পাকিস্তান ১৫২ এবং কম্বোডিয়া ১৬০টি পণ্য রপ্তানি করে। পাশাপাশি, আমাদের আরএমজি খাত এখনো জ্বালানিসংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একই সঙ্গে আমরা এখনো পর্যাপ্ত ভ্যালু অ্যাডেড প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারিনি, যা আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী অবস্থান নিশ্চিতের জন্য অপরিহার্য। এতে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।’
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ‘কারখানার মালিকদের দ্বারা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে অসহযোগী বা অবহেলাযুক্ত আচরণ সহ্য করা হবে না। তৈরি পোশাকশিল্পের অনেক ব্যবসায়ী বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিয়েও শ্রমিকদের ঠকিয়েছেন। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কঠোর।’