ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি (আরটিসি) অনুমোদিত এবং সচল থাকা ৯৪টি বাসরুট বাতিল করা হচ্ছে। বাতিল হয়ে যাচ্ছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বাসরুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের নকশা করা ৪২টি রুটও। এখন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে নিয়ে ডিটিসিএ নতুন করে ৪৪টি বাসরুটের নকশা প্রণয়ন করছে। এতে সায় আছে আরটিসির সর্বেসর্বা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কর্মকর্তাদের।
প্রাথমিকভাবে প্রণয়ন হওয়া ২৯টি বাসরুটের নকশা এসেছে খবরের কাগজের হাতে। সেই নকশা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নতুন বিন্যস্ত প্রায় সব রুটে ওভারল্যাপিং রয়েছে। সাধারণত এক রুটের ওপর দিয়ে আরেক রুটের বাস চললে যাত্রী নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে রেষারেষি দেখা যায় সড়কে। নতুন বাসরুটের বিন্যাসেও এই সমস্যা রয়ে গেছে।
নতুন বিন্যস্ত রুট ও নানা আপত্তি
১ নম্বর রুট শুরু হবে চন্দ্রার নন্দনপার্ক এলাকা থেকে, শেষ হবে ঢাকার ডেমরা ব্রিজ এলাকায়। এ রুটের বাস আবদুল্লাহপুর-কুড়িল-বাড্ডা-মালিবাগ-যাত্রাবাড়ী হয়ে ডেমরা যাবে। এ রুটে দুটি অ্যালাইনমেন্ট করা হতে পারে। একটি অ্যালাইনমেন্ট যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে সাইনবোর্ড হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত যেতে পারে।
২ নম্বর রুটও চন্দ্রার নন্দনপার্ক এলাকা থেকে শুরু হবে, শেষ হবে ঢাকার ডেমরা ব্রিজ এলাকায়। তবে এই রুটের বাস কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বনানী-মহাখালী-মগবাজার-গুলিস্তান রুটে যাবে।
উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত নকশা করা হয়েছে ৩ নম্বর রুটের। উত্তরা থেকে বাড্ডা রুট হয়ে গুলিস্তান-সদরঘাট যাবে এই বাস। ৪ নম্বর রুটের শুরু দিয়াবাড়ী থেকে, শেষ হবে ঘাটারচরে। তবে এই রুটটি নিয়ে জটিলতা আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মহাখালী-মগবাজার-কাকরাইল-শাহবাগ ঘুরে মোহাম্মদপুর রুট হয়ে ঘাটারচর যাবে বাস। তবে এত ঘুরপথে বাস চালাতে চাইছেন না ঢাকার বাসমালিকরা।
গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে টঙ্গী-বনানী-বিজয় সরণি-খেজুরবাগান হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ৫ নম্বর রুটের নকশা করা হয়েছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত ৬ নম্বর রুটের বাস যাবে বিমানবন্দর-বিজয় সরণি-ফার্মগেট-গুলিস্তান-তাঁতীবাজার হয়ে। ঘাটারচর থেকে শিমুলতলী পর্যন্ত ৭ নম্বর রুটের বাস পরিচালনা করতে গাবতলী বেড়িবাঁধ সড়কটি সচল করার পরিকল্পনা চলছে। ঘাটারচর পর্যন্ত যেতে না চাইলে ঢাকা উদ্যান থেকেও বাস চলাচলের কথা বলা হয়েছে এই রুটের বিন্যাসে। ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুর-বিজয় সরণি-মহাখালী-বিমানবন্দর হয়ে গাজীপুরের সালনা পর্যন্ত ৮ নম্বর রুটের বিন্যাস করা হয়েছে। সালনার বিকল্প হিসেবে আশুলিয়ার ধউর সেতু এলাকায় শেষ বাস স্টপেজ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঢাকার পোস্তগোলা থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ পর্যন্ত ৯ নম্বর রুটের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এই দীর্ঘ রুটে বাস চালাতে আগ্রহী নন বাসমালিকরা।
একইভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাভারের নবীনগর পর্যন্ত ১০ নম্বর রুটে বাস চালাতে আপত্তি জানিয়েছেন বাসমালিকরা।
সাভারের নবীনগর থেকে গাবতলী বেড়িবাঁধ সড়ক হয়ে পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত ১১ নম্বর রুটের বিন্যাস করা হয়েছে। সাভার বাসস্ট্যান্ড থেকে ফার্মগেট-গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত ১২ নম্বর বাসরুটের বিন্যাস করা হয়েছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে মোহাম্মদপুর-বসিলা চৌরাস্তা হয়ে গাবতলী-হেমায়েতপুর পর্যন্ত ১৩ নম্বর বাসরুটের নকশা করা হয়েছে। গাবতলী-হেমায়েতপুর পর্যন্ত বাসমালিকরা বাস চালাতে রাজি না হলে বসিলা চৌরাস্তা থেকে বাসরুট শুরু করে তা বকশীবাজার-গুলিস্তান ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। গাবতলী থেকে আগারগাঁও-মহাখালী হয়ে পূর্বাচলের কুড়াতলী এলাকা পর্যন্ত ১৫ নম্বর রুটের বিন্যাস করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে গাবতলী থেকে মিরপুর-১২ নম্বর সেকশন হয়ে কুড়িল-পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরামর্শও এসেছে। ইসিবি চত্বর থেকে টেকনিক্যাল মোড়-সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ-মতিঝিল-কমলাপুর হয়ে পোস্তগলা পর্যন্ত ১৬ নম্বর রুটের বিন্যাস করা হয়েছে। তবে এত ঘুরপথে বাস চালাতে আগ্রহী নন বাসমালিকরা। ইসিবি চত্বর থেকে রোকেয়া সরণি-মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ-মিরপুর রোড-চানখাঁরপুল-গুলিস্তান-বাবুবাজার হয়ে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় জেলখানা মোড় পর্যন্ত ১৭ নম্বর বাসরুটের বিন্যাস করা হয়েছে। শিয়া মসজিদ থেকে ফার্মগেট-দৈনিক বাংলা-মতিঝিল হয়ে সায়েদাবাদ যাবে ১৮ নম্বর রুটের বাস। ইসিবি চত্বর থেকে মিরপুর রোড হয়ে পান্থপথ-বাংলামোটর-মালিবাগ ফ্লাইওভার হয়ে গুলিস্তান, বাহাদুরশাহ পার্ক পর্যন্ত যাবে ১৯ নম্বর রুটের বাস। এ রুটটিকে বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল আবাসিক এলাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
২০ নম্বর রুটের বাস যাবে চিড়িয়াখানা থেকে ফার্মগেট-পুরানা পল্টন হয়ে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর পর্যন্ত। দুয়ারীপাড়া থেকে মিরপুর রোড-ফুলবাড়িয়া হয়ে সদরঘাট যাবে ২১ নম্বর রুটের বাস। ঘাটারচর থেকে ফার্মগেট-বাংলামোটর-মালিবাগ রেলগেট হয়ে সায়েদাবাদ যাবে ২২ নম্বর রুটের বাস। ঘাটারচর থেকে শাহবাগ-কাকরাইল-রামপুরা হয়ে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার যাবে ২৩ নম্বর রুটের বাস। গুলশান-২ থেকে গুলশান-১, মহাখালী, ফার্মগেট, বাংলামোটর, কাকরাইল, গুলিস্তান ঘুরে কমলাপুর যাবে ২৪ নম্বর রুটের বাস। এ রুটটি একসময় ৬ নম্বর রুট নামে পরিচিত ছিল। বেরাইদ ঘাট থেকে ভাটারা ধানা-বাড্ডা-সায়েদাবাদ-দয়াগঞ্জ ঘুরে সদরঘাট যাবে ২৫ নম্বর রুটের বাস। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে বসুন্ধরা সিটি-বাংলামোটর-মালিবাগ ফ্লাইওভার হয়ে খিলগাঁও তালতলা মার্কেট যাবে ২৬ নম্বর রুটের বাস। বালুরঘাট থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত রুটটি আগে ৪ নম্বর বাসরুট নামে চালু ছিল। এবার সেটি ২৭ নম্বর বাসরুট হতে যাচ্ছে। ঘাটারচর থেকে কাচপুর পর্যন্ত ২৮ নম্বর রুটের বাস যাবে। ঢাকেশ্বরী থেকে কারওয়ান বাজার-মহাখালী-গুলশান-১ হয়ে কুড়িল বিশ্বরোড যাবে ২৯ নম্বর রুটের বাস।
হঠাৎ নতুন বিন্যস্ত রুট কেন
ঢাকা মেট্রোপলিটন যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি (আরটিসি) থেকে অনুমোদন পাওয়া বাসরুটগুলো নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। বাসরুটের যথার্থতা যাচাই না করে অযাচিতভাবে একের পর এক অনুমোদন দিয়েছে আরটিসি। বাসরুটগুলো পরিচালনার জন্য পরিবহন মালিকরা কত বাস (সিলিং নম্বর) সড়কে নামানোর সক্ষমতা রাখেন, কতজন মালিক মিলে একটি কোম্পানি পরিচালনা করছেন, তাদের বাসগুলোর রুট পারমিট বা ফিটনেস সনদ আছে কি না, তা নিয়ে তর্ক চলছিল বেশ কয়েক বছর ধরে।
চলতি বছরের শুরু থেকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) রাজধানীতে ‘ট্রাফিক সার্ভে’ কার্যক্রম শুরু করে। সরেজমিনে পাওয়া তথ্য বলছে, সিলিং নম্বর থেকে বেশি বাস সড়কে নামিয়ে যানজট পরিস্থিতি তীব্রতর করে তুলেছেন বাসমালিকরা। কোনো একটি পরিবহন কোম্পানির বাসের রুট পারমিট বাতিল হলে সেই বাস কিছুদিন পর অন্য কোম্পানির ব্যানারে সড়কে চলছে। অতিরিক্ত লাভের আশায় বেশ কয়েক বছর আগে ফিটনেস হারানো বাসগুলো নিজেদের ব্যানারে নিয়ে আসছেন আরটিসি অনুমোদিত রুটের বাসমালিকরা।
সড়কের এই বিশৃঙ্খলা বন্ধ করতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ আরটিসি, বিআরটিএ, ডিটিসিএ, ডিএমপি এবং ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে সমন্বয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু আরটিসি, বিআরটিএ, ডিএমপি এবং ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ঢাকার সড়কের কর্তৃত্ব ডিটিসিএর হাতে ন্যস্ত করতে নারাজ ছিল।
ডিটিসিএর অনুমোদন না নিয়ে নতুন করে ২৭টি বাসরুটের নকশাও করে ফেলেছিল আরটিসি। পরে তাতে আপত্তি জানান খোদ বাসমালিকরা। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি রুটেই ওভারল্যাপিং হচ্ছে। অর্থাৎ এক রুটের বাস অন্য রুটের ভেতর দিয়ে চলাচল করছে। এতে শুধু বিশৃঙ্খলাই বাড়ছে না; রুটে বাস চলাচলের অনুমতি পাওয়া নির্ধারিত পরিবহন কোম্পানিও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। এ কারণে বাসরুটে ওভারল্যাপিং কমাতে চাপ দিচ্ছেন বাসমালিকরা।
এ নিয়ে ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা ২৯টি বাসরুটের নকশা প্রণয়ন করেছি। আরও ১০-১৫টি বাসরুটের নকশা নিয়ে ভাবছি। আগে ঢাকায় যত বাসরুট ছিল, সেগুলো বাতিল করা হবে।’
নতুন বাসরুটগুলোতেও ওভারল্যাপিং রয়ে গেছে; এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা বাসরুটের যে নকশা করেছি, তা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। রাজধানীর সড়কের বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ওভারল্যাপিং কমিয়ে আনার চেষ্টা করব। এছাড়া ঢাকা শহরে বাসরুটের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) উদ্দেশ্য হবে। ঢাকা শহরে এত বাসরুটের আসলে দরকার নেই।’
বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই সমাধান
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শামছুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘নতুন বাসরুট বিন্যস্ত করার আগে সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণের অভিযান জোরদার করতে হবে। সড়কে লক্কড়ঝক্কড় বাস রেখে কোনো রুট বিন্যাস সম্ভব না। আমি বলব, বাসরুটে ফ্র্যাঞ্চাইজির আসলে কোনো বিকল্প নেই। এক রুটে কেবল এক কোম্পানির বাস চলবে, এ নীতি চালু করা না গেলে শুধু বাসরুট বিন্যস্ত করে কোনো লাভ হবে না। এখন ঢাকায় সার্কুলার বাসরুটের নকশাও করা যেতে পারে, অনেকটা হাতিরঝিলের চক্রাকার বাস সার্ভিসের মতো।’