চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। বিশেষ করে মায়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাতের মাঝে কক্সবাজারের টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র তৎপরতা ব্যাপক উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে।
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, মায়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের একাধিক গ্রুপ টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয় ক্যাম্পে বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্রের মজুত গড়েছে। সেই অস্ত্র ব্যবহার করে তারা স্থানীয়ভাবে যেমন খুন-জখম, অপহরণ-ডাকাতির ঘটনা ঘটাচ্ছে, তেমনি চলমান উত্তেজনার মাঝে আরাকান আর্মি বা রাখাইনের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক হামলা চালাচ্ছে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবির থেকে বড় একটি গ্রুপ টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকাসংলগ্ন সীমান্তের ওপারে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা চালায়। আরাকান আর্মি তাৎক্ষণিকভাবে পিছু হটলেও সেই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে বাংলাদেশের সীমানা তথা টেকনাফ লক্ষ্য করে গুলি, মর্টার শেল নিক্ষেপ করে, যা থেকে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
একদিকে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে বিমান, ড্রোন, মর্টার শেল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে জান্তা বাহিনী, অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে স্থলভাগে সংঘর্ষে জড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তিনটি গোষ্ঠী। এই ত্রিমুখী সংঘাতের কারণে টেককনাফ সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল ও ভীতিকর হয়ে উঠছে। রাখাইন থেকে ছোড়া গুলি-মর্টার শেল এসে পড়ছে টেকনাফে। এতে স্থানীয়রা যেমন চরম আতঙ্কগ্রস্ত, তেমনি পথেঘাটে বের হলেই জীবনের ঝুঁকিতে পড়ছেন। এরই মধ্যে গত রবিবার আরাকান আর্মির ছোড়া গুলি এসে লাগে টেকনাফের শিশু হুজাইফা আফনানের মাথায়। শিশুটি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ছাড়া গতকাল সোমবারও আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মো. হানিফ (২৮) নামে এক যুবকের বাঁ পা উড়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) স ম মাহবুব-উল-আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকট–এসব বিষয়ে রাষ্ট্রকে সুস্পষ্ট কৌশল তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্রের স্বার্থ বা জাতীয় নিরাপত্তা নীতির কৌশলগত একটি সংস্কৃতি (স্ট্র্যাটেজিক কালচার) চালু করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোতে ঐক্য, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী অর্থনীতি প্রয়োজন। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা জরুরি। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখানকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুসারে কাজ করা প্রয়োজন। আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে।’
সীমান্তের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রসঙ্গে গতকাল কথা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অপারেশন্স শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব মুর্শেদ রহমানের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘টেকনাফ সীমান্তের পরিস্থিতি অনুযায়ী সেখানে বাড়তি টহল, নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে অবস্থান, সতর্ক করার পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে বিজিবি টেকনাফের সীমান্ত এলাকা থেকে ৫৩ জনের একটি গ্রুপকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। বিজিবি সব সময় রাষ্ট্রের স্বার্থ এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নে সজাগ-সতর্ক রয়েছে।’
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে সরকার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে। গতকাল পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. তৌহিদ হোসেনের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ে রাখাইনের উত্তেজনা ও টেকনাফের পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বেশ কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের উপস্থিতিতে। নিরাপত্তা উপদেষ্টা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, আগামীকাল বুধবার তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তৎপরতা রোধ কীভাবে
এই ক্ষেত্রে প্রধান দুটি সমস্যা চিহ্নিত করেছেন নিরাপত্তাসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আনসার সদস্যদের টহল থাকলেও অপরাধের প্রবণতা ও ধরন অনুসারে তা ভারসাম্যপূর্ণ নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নিরাপত্তা বাহিনী বা যৌথ বাহিনী অভিযান চালাতে গেলেও নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতায় অনেক সময় তা হচ্ছে না। বলতে গেলে, কৌশলে ক্যাম্পে অস্ত্র ও মাদকের মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে দেওয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দোহাই দিয়ে এই জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। অথচ সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের কিছু গ্রুপ আগ্নেয়াস্ত্র, মাদকসহ নানা অপরাধের ঘাঁটি বানাচ্ছে ক্যাম্পগুলোকে। এমনকি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর সেই অস্ত্র ব্যবহার করছে। সার্বিকভাবে ওই সন্ত্রাসীদের হুমকি ও তৎপরতার ফলাফল ভোগ করতে হচ্ছে কক্সবাজার-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এ ছাড়া রাখাইন সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের সীমানার দিকে গুলি-মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হলেও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ও কৌশলগত সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করছেন, আরাকান আর্মি বা মায়ানমার বাংলাদেশকে মাঝেমধ্যেই সংঘাতের জন্য উসকানি দিচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হয়। ফলে হুটহাট কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। তবে একেবারে চুপচাপ থাকাটাকেও যৌক্তিক মনে করেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। বাস্তবসম্মত কৌশল তৈরি করে তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন তারা।
আরাকান আর্মির সক্ষমতা নিয়ে কী বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা
আরাকান আর্মিসহ মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে নিবিড়ভাবে খোঁজখবর রাখে এমন একটি সংস্থার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, মায়ানমারে বেশ কিছু গ্রুপ বা গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলমান রয়েছে। মায়ানমারের জান্তা সরকার বা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এসব গ্রুপ তাদের অধিকার আদায়সহ নানা ইস্যুতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত মোকাবিলা বা যুদ্ধ-শক্তির সক্ষমতার দিক থেকে আরাকান আর্মি ‘লেভেল-২’ পর্যায়ের গোষ্ঠী। আরাকান আর্মির চেয়েও মায়ানমারে শক্তিশালী গ্রুপ রয়েছে, আবার দুর্বল গোষ্ঠীও রয়েছে। আরাকান আর্মি মূলত সামরিক পরিভাষায় ‘জাঙ্গল ওয়ার ফেয়ার’ গ্রুপ, যারা পাহাড় বা এই অঞ্চলে লড়াই করার সক্ষমতা রাখে। যুদ্ধ করার জন্য তারা বর্তমানে চায়নিজ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, মর্টার শেল, রকেট লঞ্চার ও গ্রেনেড জাতীয় অস্ত্রই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে। সম্প্রতি তারা হামলার জন্য ড্রোন সংযোজন করেছে। এই ড্রোনে বোমা যুক্ত করে শত্রু পক্ষকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে বলে জানা যায়। তবে আরাকান আর্মির কাছে এখনো মিসাইল বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নেই। ফলে দূরপাল্লার হামলা বা এই জাতীয় হামলা প্রতিহত করার মতো ব্যবস্থা আপাতত তাদের কাছে নেই বলে জানিয়েছে বিশ্বস্ত সূত্রগুলো।
মায়ানমারের অভ্যন্তরে কী হচ্ছে
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, বর্তমান সময়েও মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৪টি গ্রুপ বা গোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ-সংঘাতে লিপ্ত। এগুলোকে বলা হচ্ছে, এথনিক আর্মস অর্গানাইজেশন (ইএও), যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের অধিকার আদায়সহ নানা কারণে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আরাকান আর্মিও এমনই একটি সশস্ত্র সংগঠন। ১৯৪৫ সাল থেকেই মায়ানমারে জাতিগত বা অঞ্চলভেদে এসব সংঘাত চলে আসছে।