চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার বিষয়ে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি আদায়ে কর্মবিরতিতে আছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। গতকাল রবিবারও চট্টগ্রাম বন্দর ছিল অচল। সরকার ও আন্দোলনকারীদের টানাটানিতে মাথায় হাত পড়েছে ব্যবসায়ীদের। এমন পরিস্থিতিতেও সরকার হার্ডলাইনে আছে, আমলে আনছে না কোনো কিছুই।
গতকাল বন্দর এলাকা ঘুরে বন্দর ভবনের বিপরীতে ৪ নম্বর জেটি গেট ও বন্দরের এনসিটি গেটে গিয়ে কোনো পণ্যবাহী পরিবহন দেখা যায়নি। চারদিকে সুনসান নীরবতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ছাড়া শ্রমিক-কর্মচারীদের দেখা যায়নি।
এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সচল রয়েছে বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান। গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘটের মধ্যে বন্দর ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান দাবি করেন, শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। তাদের কেউ বাধা দিচ্ছে না। তবু এর মধ্যে যদি কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনি ব্যবস্থা নেবে। কিছু বিপথগামী কর্মচারী বন্দরকে হাইজ্যাক করে, জনগণকে জিম্মি করে এই পথ বেছে নিয়েছে। আমরা রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী। রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের আনুগত্য থাকবে। বন্দর যে আইনে চলে, সেই আইনের প্রতি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কেউ যদি বিপথগামী হয়ে অন্য কারও আনুগত্য বেছে নেয়, সেটা কর্মকর্তা-কর্মচারী আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এনসিটি ইজারার বিষয়ে তড়িঘড়ি করা হচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, ‘যারা এসব করছে তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। রমজানের আগে এ ধরনের একটা কাজ করে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে তারা।’
গতকাল বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বর্তমান সরকারের সময়ে এ চুক্তি হবে না।
গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট চলতে দেওয়া যায় না উল্লেখ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এ বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে। কতিপয় লোক পুরো বন্দরকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে।
গতকাল সকাল থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘটের কারণে বন্দর জেটিতে পণ্য খালাসের জন্য কোনো জাহাজ ভিড়তে পারেনি, কোনো জাহাজ পণ্যবাহী কনটেইনার নিয়ে বন্দর ছেড়েও যেতে পারেনি। এ কারণে বন্দর ও বিভিন্ন বেসরকারি ডিপোতে ফের কনটেইনারের স্তূপ বাড়া ও বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাহাজের জন্য অপেক্ষার সময় বাড়তে থাকায় আমদানিকারকদের গুনতে হবে জরিমানা। পণ্যবাহী পরিবহন চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ৩৬ হাজার ৭০৮ টিইইউএস কনটেইনার ছিল। বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে ৪১ হাজার ৮৭ টিইইউএসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে কমেছে কনটেইনার ডেলিভারি। গত ৭ ফেব্রুয়ারি বন্দর ইয়ার্ড থেকে ৪ হাজার ২৪৪ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়। গতকাল সকাল ৮টার আগে (ধর্মঘট শুরু হওয়ার আগে) মাত্র ৮০৬ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন ও মো. হুমায়ুন কবীর।
গতকাল রাতে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্দোলনকারীরা বলেন, নৌপরিবহন উপদেষ্টা এবং পিপিপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন আজ (গতকাল) সাংবাদিকদের বলেছেন, তারা এই সরকারের আমলে এনসিটি চুক্তি আর অগ্রগামী করবে না। এমনকি ডিপি ওয়ার্ল্ড এই চুক্তির বিষয়ে সময় চেয়েছে। আমরা বলতে চাই, ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সরকার এই চুক্তি থেকে পুরোপুরি সরে আসুক। এ বিষয়ে আমরা আমাদের দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য এবং রমজান ও জাতীয় নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘটের কর্মসূচি স্থগিত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (৫ জন কর্মচারীকে গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলা, নগরের বন্দর, ডবলমুরিং ও আকবরশাহ থানায় জিডি, শাস্তিমূলক বদলি, দুদকে পত্র প্রেরণ ও বরাদ্দকৃত বাসা বাতিল) গ্রহণ করেছে। আমাদের ১৪ জন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এসব বিষয়ে সরকার এবং কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তত দ্রুত আমরা আমাদের কর্মসূচি স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনা করব। আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, সরকার এবং আন্দোলনকারীরা আলোচনায় বসে বন্দরের অচলাবস্থা নিরসন করুক। না হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।
আরেক ব্যবসায়ী নেতা নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম দেশের সবচেয়ে বড় বন্দর। এখান থেকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই চলে। এই বন্দর বন্ধ থাকা মানে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য অচল হয়ে যাওয়া। এরই মধ্যে অনেক কারখানা কাঁচামালের অভাবে বন্ধ করা হয়েছে। অনেক পণ্য সময়মতো রপ্তানি করতে পারছি না।’
এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেছে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতারা। বন্দরের চলমান অচলাবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে এ সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ)।