অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে শ্রম আইন সংশোধনসহ একগুচ্ছ নীতি প্রণয়ন করেছে। ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ অনেক দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প-বিনিয়োগ-ব্যবসা-বাণিজ্যে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটা এককভাবে আর্থিক খাতের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে এসব সিদ্ধান্ত সংশোধন বা বাতিলের দাবি জানালেও সরকার আমলে নেয়নি। অর্থনীতিতে গতি আনতে নির্বাচিত সরকারকে এসব নীতি বাতিল বা সংশোধন করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতে অনেক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই বিনিয়োগবান্ধব নয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচিত সরকারকে এসব সিদ্ধান্ত সংশোধন বা বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান (বাবু) খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। শ্রম আইন সংশোধন করা হলো অথচ আমাদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হলো না। এই আইনটির কারণে তৈরি পোশাক খাতসহ শিল্পের অনেক খাতে অস্থিরতা তৈরি হবে। আমি তিন মাস ধরে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আইনটি নিয়ে আলোচনা করার জন্য সময় চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে সময় দেওয়া হয়নি।’
সংশোধিত শ্রম আইন চূড়ান্ত করে সরকার ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে। পোশাক খাতের মালিকদের তিন সংগঠন, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর নেতারা আইনটি সংশোধনের জোরালো দাবি জানান। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) ১৭টি অসংগতি চিহ্নিত করে সংশোধনের দাবি জানিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও কোনো কাজ হয়নি।
ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলেন, শ্রম আইন সংশোধন অধ্যাদেশে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। এসব সংশোধন করা না হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সংশোধিত শ্রম আইন বাস্তবায়ন করা হলে শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টি হবে; শিল্পকারখানা সংকটে পড়বে। আশা করি, নির্বাচিত সরকার আমাদের দাবি অনুযায়ী শ্রম আইনের ধারাগুলোতে সংশোধন আনবে।’
বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর নেতারা সংশোধিত শ্রম আইনের তিনটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। এক. শ্রমিকের সংজ্ঞায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা; দুই. ২০ জন শ্রমিকের সম্মতি নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সুযোগ প্রদান এবং তিন. ১০০ জন শ্রমিক হলেই ভবিষ্যৎ তহবিল করার বাধ্যবাধকতা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলে। বিনিয়োগ বাড়াতে বিডা, বেজার মতো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব একই ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেয়। বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিনিয়োগ সামিট করে। কিন্তু দেশে বিনিয়োগের খরা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দেওয়া হয়েছে। ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দেড় বছরে তিনবার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির তীব্র বিরোধিতা করলেও তা বিবেচনায় আনা হয়নি।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণের ফলে বাজারে পণ্য সরবরাহ কমে যায়। এলসি খোলা কমে যায়। ফলে পণ্যসংকট দেখা যায়। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খুব একটা কাজে আসে না।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘গভর্নর বলেছিলেন, বর্তমান নীতি সুদহার দিয়ে মূল্যস্ফীতি সাতের নিচে নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে এ নীতি চললেও মূল্যস্ফীতি সন্তোষজনক পর্যায়ে নামেনি, যা ব্যবসায়ীদের হতাশ করেছে। উল্টো নীতি সুদহারের বিষয়ে কঠোর হওয়ার ফলে সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নীতির ফলে উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত এবং কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। গত দেড় বছর আমাদের কথা শোনার জন্যে কেউ ছিলেন না।’
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, উৎপাদন ও ব্যবসায় খরচ বাড়ায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা কমেছে। রপ্তানি আয় কমেছে। ক্রমাগত লোকসানে এরই মধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়েছেন। শিল্প গড়ে না ওঠায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভারতের সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার, যা দুই দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। সরকার ভারত থেকে ডুপ্লেক্স বোর্ড, নিউজপ্রিন্ট, কাগজ, মাছ, সুতা, আলু, দুধ, বাইসাইকেল ও মোটরের যন্ত্রাংশ, সিরামিক ও স্যানিটারি ওয়্যার, মার্বেল পাথর, কাপড়সহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ভারতও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফলসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি করে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভারত বিদ্যমান কিছু ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে।
সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ভারসাম্য বজায় রাখতে সংকোচনমূলকনীতি শিথিল করা প্রয়োজন। নির্বাচিত সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভারত থেকে অনেক পণ্য বাংলাদেশে আমদানি হয়। এসব পণ্যের ওপর আমাদের শিল্পের অনেক খাত নির্ভরশীল। এ ছাড়া দেশ দুটি পাশাপাশি হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি সম্ভব। দুই দেশের বাণিজ্যে গতি আনতে দেড় বছরে গ্রহণ করা অনেক সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারকে বিবেচনা করে নতুনভাবে গ্রহণ করতে হবে।’