‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে’ টাকা আয়ের হাতিয়ার করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট–আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরেক প্রসিকিউটরের এমন অভিযোগ নিয়ে আইন-আদালত অঙ্গনে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এদিকে প্রসিকিউটররা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
গত সোমবার চিফ প্রসিকিউটর পদে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের পর কেন অভিযোগ? এই প্রশ্নও আছে আদালত অঙ্গনে। অভিযোগ তোলা প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ গতকাল মঙ্গলবার এই প্রশ্নের জবাবে দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন–এতদিন কি কথা বলার সুযোগ ছিল? তাও বলেছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যানকে জানিয়েছিলাম। বিএনপির আইনজীবী নেতাদের জানিয়েছিলাম। কিন্তু তাজুল ইসলামের ব্যাপারে তখন ব্যবস্থা নেবে কে? কার এত সাহস? আইন উপদেষ্টা ছিলেন তার ‘ল্যাসপেন্সার’!
তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত সোমবার এক ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে অভিযোগনামা তুলে ধরেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। এক প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আরেক প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিমের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন তিনি। এতে তিনি লিখেছেন, গত বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি এসআই আবজালুল হকের স্ত্রী সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর তামিমের কক্ষে প্রবেশ করেন। পোস্টে সুলতান লিখেন, বিষয়টি দেখার পর তাজুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাকে জানানো হয়। কিন্তু তাজুল ইসলাম এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বকাবকি করেছিলেন।
সুলতান মাহমুদ আরও লিখেছেন, তামিম তখন সবার সামনে এসআই আবজালুলের স্ত্রীর তার কক্ষে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। পরে সেই আবজালুলকে রাজসাক্ষী করা হয়। বিচারে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত গত সোমবার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। ওই পোস্টে দুটি মন্তব্য করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। সেই দুই মন্তব্যে তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এসব অভিযোগ তোলেন তিনি।
মন্তব্যে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হককে ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) করা, রংপুরে শহিদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে করা মামলা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া এবং চানখাঁরপুল এলাকায় ‘গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া’ একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই প্রসিকিউটর।
সেখানে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ আরও লিখেন–চানখাঁরপুলের মামলায় এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছে এ রকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরেও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে।
প্রসিকিউটর লিখেছেন, রংপুরের আবু সাঈদের মামলায় এসি ইমরানকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হলো? এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষীরা আদালতে এসে বলেছেন। তারপর সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনকে কী কারণে রাজসাক্ষী করা হলো?
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা এক মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। গত ১৭ নভেম্বরের দেওয়া ওই রায়ে এই মামলার অপর আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে (অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে দেওয়া আরেকটি মন্তব্যে সুলতান মাহমুদ লিখেন, ‘শুধু আইজি মামুন নয়, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় টাকার বিনিময়ে আবজালকেও রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিন–চারজনের একটি সিন্ডিকেট শুরু থেকে এই চক্রে জড়িত।’
আদালত অঙ্গনে চলমান এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গতকাল নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আমার দায়িত্ব পালনকালে কোনো প্রসিকিউটর কিংবা অন্য কেউ কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা প্রমাণ করে দেব এই ট্রাইব্যুনাল পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত। এখানে আন্তর্জাতিক মানের বিচার চলবে। এর বাইরে অন্য কোনো আলোচনা আমরা প্রশ্রয় দেব না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই একেবারেই আইন অনুযায়ী এই ট্রাইব্যুনাল পরিচালিত হোক। গতি বাড়ার সঙ্গে আরও স্বচ্ছতা বাড়ুক, সেটাই আমরা চাই। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী মামলাগুলোর বিচার যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সেসব বিষয়ে আলোচনা করেছি প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে। আশা করছি, খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’
তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে ২৪টি মামলার ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি মামলার ট্রায়াল চলছে দুটি ট্রাইব্যুনালে। যদিও এ মামলাগুলোর বিষয়বস্তু এখনো দেখিনি। এ জন্য সব আমার কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে যদি মনে হয় তদন্ত যথাযথ হয়নি, কিংবা কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে, তাহলে আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো নিরপরাধ মানুষ কিংবা রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করে কোনো কার্যক্রম চালাব না। আমাদের মূল লক্ষ্যই থাকবে প্রকৃত অপরাধীদের সাজার আওতায় আনা।’
প্রসিকিউশন টিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। সব ধরনের মামলার বিষয়বস্তু বুঝতে হবে। যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেসবও তদন্ত করে দেখতে হবে। এরপরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের মধ্যে গতকাল গণমাধ্যমে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন সদ্যসাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ‘প্রকাশিত সংবাদের ব্যাপারে আমার স্পষ্ট বক্তব্য’ শিরোনামে পাঠানো এই বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘গতকাল এবং আজ কিছুসংখ্যক গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে আমার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনৈক প্রসিকিউটরের বরাতে কিছু বিদ্বেষপ্রসূত ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে-
‘উক্ত বক্তব্যসমূহ জঘন্য মিথ্যাচার, তথ্য-প্রমাণবিহীন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দুরভিসন্ধি থেকে করা হয়েছে। এসব বিদ্বেষপ্রসূত ও অভিযোগগুলো সর্বতোভাবে মিথ্যা। আমি চ্যালেঞ্জ করছি- আমার ব্যাপারে আনীত এসব অভিযোগের স্বপক্ষে সামান্য তথ্য-প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আমি এবং প্রসিকিউশন টিমের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বচ্ছ ও আইনানুগ।’
বার্তায় তিনি আরও লিখেন, ‘পতিত স্বৈরাচার ও গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নিষ্পত্তিকৃত এবং চলমান বিচার প্রক্রিয়া থেকে দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি মহল সংঘবদ্ধভাবে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে এই বিচার আর কোনোভাবে অগ্রসর না হতে পারে।’
‘দায়িত্বকালে কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাননি। আমি বিদায় নেওয়ার পর বিশেষ মহল গণহত্যাকারীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ধরনের মিথ্যাচার ও ঘৃণ্য অপতৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।’
আরেক প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে এসব অভিযোগ আনছেন তিনি। আমি ‘স্ট্রংলি’ চ্যালেঞ্জ করছি, তিনি বা পৃথিবীর কেউ আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে না।’