রাজধানীতে শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের প্রথম দিনেই দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের নানা সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব সমস্যার চিত্র উঠে আসে। একই সঙ্গে এসব সংকট নিরসনে মাঠ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেগুলোর অনেকটিই বিদ্যমান অবকাঠামো, জনবল ও আইনি কাঠামোর ঘাটতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সম্মেলনের আলোচনায় দেখা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি। কোথাও ১০০ শয্যার হাসপাতালে বাস্তবে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকছেন, আবার কোথাও আইসিইউ, অক্সিজেন সরবরাহ বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় রংপুর বিভাগে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল স্থাপন, বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ও সিসিইউ চালু এবং পুরোনো হাসপাতালগুলো সম্প্রসারণের প্রস্তাব গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, বরগুনা, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতাল উন্নীতকরণ বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণের দাবি উঠেছে।
জনবলসংকটও আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। অনেক হাসপাতালে অনুমোদিত পদের বড় অংশই শূন্য থাকায় চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সদের আবাসন না থাকায় কর্মস্থলে অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, এমন বাস্তবতা তুলে ধরে আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ চালু, শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ এবং অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অনেকটিই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, কোথাও ছাদ ঝুঁকিপূর্ণ, কোথাও আবার জনবল ও ওষুধের অভাব রয়েছে। এসব কেন্দ্র পুনর্নির্মাণ, নিয়মিত সংস্কার এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিকে টেলিমেডিসিন চালুর সুপারিশ করা হয়, যাতে প্রান্তিক মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারে এবং বড় হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমে।
দুর্গম ও নদীবেষ্টিত এলাকার জন্য আলাদা গুরুত্ব দেখা যায় আলোচনায়। বরিশাল, পিরোজপুর, কুড়িগ্রাম, রাঙামাটিসহ বিভিন্ন জেলার প্রশাসকরা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর প্রস্তাব দেন। এসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় জরুরি রোগী পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ ও অ্যাম্বুলেন্স সচল রাখার বিষয়টিও সামনে আসে।
জনস্বাস্থ্যের নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে ডেঙ্গু ও সাপের কামড়ের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বরগুনায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় আইসিইউ স্থাপন ও জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বাড়ায় উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়, কারণ বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় অনেক রোগীর পক্ষে তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্যসেবার বাইরে পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে। হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি তুলে ধরে চিকিৎসা বর্জ্য ও পয়োবর্জ্যের জন্য বিজ্ঞানসম্মত পরিশোধনাগার নির্মাণের কথা বলা হয়। বর্তমানে অনেক স্থানে উন্মুক্তভাবে বর্জ্য ফেলার ফলে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে পরীক্ষার ফি নির্ধারণে কোনো একক নীতিমালা না থাকায় জেলায় জেলায় ভিন্নতা তৈরি হয়েছে। এতে রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে উল্লেখ করে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আইনগত ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে। ভেজাল ও মানহীন ওষুধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ‘ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’-এর কিছু ধারা মোবাইল কোর্ট আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। এ ছাড়া দেওয়ানি আদালত ও ভূমিসংক্রান্ত আপিল মামলায় তামাদি মওকুফের প্রস্তাবও আলোচনায় উঠে আসে, যা বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সম্মেলনে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়েও আলোচনা হয়। গাজীপুর, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর ও লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইপিজেড স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজধানীমুখী জনস্রোত কমবে বলে মত দেওয়া হয়।
প্রথম দিনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবলসংকট, আইনি সীমাবদ্ধতা এবং সেবার অসম বণ্টন এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। এসব সমস্যা সমাধানে মাঠ প্রশাসনের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সেবার মান উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে ডিসি সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণবিষয়ক অধিবেশন শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার বিষয় উঠে এসেছে এবং সেগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, বিগত সময়ে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত অনেক হাসপাতাল ভবন এখনো অসমাপ্ত বা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব স্থাপনা দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নেবে সরকার। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে অপারেশন থিয়েটার ও লেবার রুমে কাজ ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্সসংকট, হাসপাতালে ওষুধের ঘাটতি, ভেজাল ওষুধ বিক্রি এবং চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির মতো সমস্যাগুলোও আলোচনায় উঠে এসেছে।
অবৈধ ও অপরিকল্পিত ক্লিনিকগুলোতে মোবাইল টিমের মাধ্যমে নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে অপচিকিৎসা ও রোগী হয়রানি বন্ধ করা যায়। একই সঙ্গে ডিসপেনসারিতে ভেজাল ওষুধ বিক্রি রোধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে দেশে চলমান হামের সংকট সমাধানে সরকারের সাফল্য জানাতে গিয়ে মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশে হাম টিকাদান কর্মসূচিতে এরই মধ্যে ৮১ শতাংশ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং দ্রুত শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।