রক্তের সম্পর্ক যেন প্রতিনিয়ত ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক-সামাজিক বন্ধনের সেই মধুর সম্পর্কগুলো হয়ে যাচ্ছে নিঃশেষ। পারিবারের কোন্দল, অর্থসম্পদের লোভ, পরকীয়ার লালসা ও সামাজিক নানা অস্থিরতায় একের পর এক ঘটছে নির্মম-নৃশংস ঘটনা। প্রিয়জনের হাতেও খুন হচ্ছে স্বজনরা। আস্থা-নির্ভরতার প্রতীক বাবা-মায়ের হাতেও নির্মমভাবে প্রাণ হারাচ্ছে শিশু সন্তানরা।
- পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, অনৈতিক সম্পর্ক ও দারিদ্র্যসহ নানা কারণে এসব ঘটনা ঘটছে: অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক
- মামলা-বিচার বা শাস্তির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে: মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
- পরিস্থিতির উন্নয়নে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা জরুরি: মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ
- কারণগুলো চিহ্নিত করে পরিবারসহ দায়িত্বশীল সবাইকে কাজ করতে হবে: পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি শাহাদাত হোসাইন
এমনই হৃদয় বিদারক ঘটনা সম্প্রতি দেখা গেছে গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। সেখানে ভাড়াবাসায় ফোরকান মিয়া নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালকসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করেন। এমনকি বীভৎস এই ‘ফাইভ মার্ডারের’ পর নিজেই খুনের কথা ফোন করে অন্য স্বজনকে জানান। অন্যদিকে গত ২২ এপ্রিল নওগাঁর নিয়ামতপুরে সম্পত্তি দখলের লোভে হাবিবুর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে খুন করেন নিকটাত্মীয়রা। যশোরে পরকীয়া সম্পর্কের জের ধরে ইকরামুল কবির নামে এক যুবক খুন হন। ৩৫ দিন পর গত ৯ মে রাতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় অভিযুক্তদের গোয়ালঘরের মাটি খুঁড়ে।
এভাবেই পারিবারিক কোন্দল-কলহ ও পরকীয়ার আগুন মুহূর্তেই ছাই করে দিচ্ছে বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা সুখের নীড়। সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন, মায়া-মমতা, সম্পর্কের বন্ধন–সবকিছু যেন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন অবক্ষয়? কোথায় হারাল সেসব সোনালি শান্তির পারিবারিক-সামাজিক বন্ধন– সে প্রশ্নও তাড়া করছে বিবেকবান মানুষকে।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, পারিবারিক বা সামাজিক ওই সব নৃশংসতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে–পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট মাধ্যমের অবারিত-অস্বাভাবিক ব্যবহার, পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্ক, ধৈর্য কমে যাওয়া বা অসহিষ্ণুতা, মানসিক স্বাস্থ্যের বিরূপ প্রভাব, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা।
এসব সংকট উন্নয়নে করণীয় প্রসঙ্গে ড. তৌহিদুল হক বলেন, এসব ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। পারিবারিক সম্পর্ক বা বন্ধনের প্রতি যত্মশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে, পরিবার ও জীবনযাপন প্রক্রিয়ায় নৈতিকতার চর্চা বাড়ানো দরকার। পরিবারের সদস্যদের একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত স্বামীর হাতে, স্বামীর পরিবার ও নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন ৮৫ জন নারী। এই সময়ের মধ্যে শিশু-কিশোরী ও বিভিন্ন বয়সের অন্তত ১৮০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ শিশু-কিশোরী খুনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের বিগত ৫ মাসে ১১৫ শিশু বিভিন্ন কারণে হত্যার শিকার হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ‘আসক’র জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক ও মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সমাজে নানা কারণে প্রতিনিয়ত নৈতিকতার স্খলন দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধেরও চরম অভাব দেখা দিয়েছে। এ থেকে বাড়ছে নির্মম-নৃশংস ঘটনা। পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধমূলক ঘটনায় মামলা, বিচার বা শাস্তির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধ প্রবণতাকে উনকে দিচ্ছে। ফলে পরিবার ও সামাজিক বিষয়গুলোর প্রতি দায়িত্বশীলদের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নজর দিতে হবে। সংকট চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করতে রাষ্ট্রকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য বলছে, গেল কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু বীভৎস পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাটি হচ্ছে গত ৯ মে ঘটা গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউতকোনা গ্রামে। সেখানে ফোরকান মিয়া স্ত্রী শারমিন, তিন সন্তান ও শ্যালকসহ ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা করেন। ঘটনার কয়েক দিন পর পুলিশ গত বৃহস্পতিবার ফোরকানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটির সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করেছে মুন্সীগঞ্জের পদ্মা সেতু বা পদ্মা নদী এলাকায়। সে হিসেবে পুলিশের ধারণা, ফোরকান নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।
অন্যদিকে, গত ৯ মে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে জমির বিবাদ কেন্দ্র করে এক পরিবারের ৩ জনকে পিটিয়ে হত্যা, দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ৮ মে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে শিশু ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ছোট্টশিশু প্রতিবেশী চাচার হাতে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যার শিকার হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া গত ১৯ মার্চ খুলনার লবণচরায় ঘরোয়া শত্রুতায় ঘুমন্ত পরিবারের ওপর গুলি চালিয়ে ৪ জনকে জখম ও হত্যা, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার হোমনায় প্রবাসী জহিরুলের স্ত্রী পাপিয়া ও দুই শিশুকে ঘরে ঢুকে জবাই, ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্বে ৩ বছরের শিশু আবদুল্লাহকে আছাড় মেরে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাগুলো সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের অস্তিত্বকে মারাত্মকভাবে আঘাত হানছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘একক কোনো কারণে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটছে না, বরং বিভিন্ন ধরনের সমস্যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পারিবারিক হত্যা বা বীভৎস খুনের ঘটনা ঘটছে। কারণগুলোর দুটি দিক রয়েছে; একটি হচ্ছে–চারপাশের পরিবেশ, যার মধ্যে নিজ পরিবার, সমাজ বা যেখানে বেড়ে ওঠা এবং বসবাস অন্তর্ভুক্ত এবং অন্যটি হচ্ছে–বিস্তৃত পরিবেশ, যার মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অন্যতম। এ ছাড়া যিনি এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন তার শৈশবের বিকাশ কেমন ছিল, সেটিও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।’
এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব–এমন প্রশ্নের জবাবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির উন্নয়নে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশ্বাসভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আইনের শাসন, পারিবারিক ও নৈতিক অনুশাসনগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠা করা গেলেই এ ধরনের নৃশংস ঘটনা অনেকাংশেই কমে যাবে।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পারিবারিক, সামাজিক বা যেকোনো কারণে হোক, হত্যা মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে কাজ করে থাকে পুলিশ। তদন্ত প্রক্রিয়ায় পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা নিয়মিত তদারকি করে থাকেন। জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে থানা পুলিশের বাইরেও বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সক্রিয় থাকে। এ জাতীয় নৃশংস ঘটনা কমিয়ে আনতে কারণগুলো চিহ্নিত করে পরিবার ও সমাজসহ দায়িত্বশীল সবাইকে কাজ করতে হবে।’