পাবনার ঈশ্বরদীতে লিচুর ফলনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দিন-রাতের তাপমাত্রার তারতম্য, অসময়ে বৃষ্টি ও খরার কারণে গাছে মুকুল কম এসেছে। অধিকাংশ গাছে নতুন পাতা এসেছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। গত বছর লিচুর বিক্রি হয়েছিল ৪০০ কোটি টাকার। এবার উৎপাদন অনেক কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ বলছে, ফলন কম হলেও দাম বাড়তে পারে। এতে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা আছে।
ঈশ্বরদীতে প্রচুর পরিমাণে সুস্বাদু ও বিখ্যাত বোম্বে লিচু উৎপাদিত হয়। এ লিচুর সুনাম ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। তবে এবার অধিকাংশ লিচু গাছে মুকুলের পরিবর্তে নতুন পাতা এসেছে। উপজেলার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ গাছে এ অবস্থা দেখা গেছে। এতে চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
চাষিরা জানান, আগেও মুকুল কম আসার ঘটনা ঘটেছে। তবে এবারের মতো ফলন বিপর্যয় কখনো হয়নি। ফেব্রুয়ারির শুরুতে মুকুল আসার সময় হঠাৎ অসময়ে বৃষ্টি হয়। এরপর মুকুলের পরিবর্তে গাছে নতুন পাতা আসতে থাকে।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, ঈশ্বরদীতে ৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ রয়েছে। বাগানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৬০টি। গাছ রয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজারটি। প্রতিটি পরিপূর্ণ গাছে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার লিচু ধরে।
এ ছাড়া বাড়ির ভিটা জমিতে ২ থেকে ৪টি করে লিচু গাছ রয়েছে। উপজেলার ছলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় শত শত লিচুর বাগান রয়েছে। সবচেয়ে বেশি বাগান রয়েছে ছলিমপুর ও সাহাপুর ইউনিয়নে। এখানে মোজাফফর ও বোম্বে জাতের লিচুর আবাদ বেশি হয়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ৭০-৭৫ শতাংশ বাগানের গাছে এবার মুকুল নেই। কিছু কিছু বাগানে নামমাত্র মুকুল এসেছে। তবে প্রচণ্ড তাপদাহে লিচুর গুটি ঝরে পড়ছে।
চাষিরা জানান, সাধারণত জানুয়ারির শেষ ও ফেব্রুয়ারির শুরুতে মুকুল আসে। এবার মুকুল আসার ঠিক আগে বৃষ্টির কারণে কাঙ্ক্ষিত মুকুল আসেনি। বরং গাছে নতুন পাতা এসেছে।
কৃষি অফিস জানায়, গত বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর বিক্রয়মূল্য ছিল ৪০০ কোটি টাকা। এর আগের বছর ছিল ৩৫০ কোটি টাকা। এবার মুকুল কম আসায় ১৯ হাজার ৪৫০ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ১০ হাজার ৬৫০ টন কম। বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন আরও কমতে পারে। ঈশ্বরদী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্র জানায়, ঈশ্বরদীতে প্রতিদিন তাপমাত্রা বাড়ছে। বইছে মাঝারি তাপপ্রবাহ।
ছলিমপুর ইউনিয়নের মিরকামারী গ্রামের ইমরান মণ্ডলের ২৮টি লিচুর গাছ রয়েছে। তিনি জানান, এবার তার গাছগুলো থেকে ২ হাজার ৮০০টি লিচু পাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তিনি বলেন, ‘মুকুল আসার আগেই বৃষ্টি হয়। এরপর নতুন পাতা আসে। পরে আর মুকুল আসেনি।’
সাহাপুর ও ছলিমপুর ইউনিয়নে সাতটি বাগান কিনেছিলেন লিচু ব্যবসায়ী আবুল বাশার প্রামাণিক। তিনি জানান, তিন শতাধিক গাছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মুকুল এসেছে। এখন গুটি ধরলেও প্রচণ্ড গরমে তা ঝরে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘আগের বছর লাভ হয়েছিল। এবার ৫-৬ লাখ টাকা লোকসান হবে।’
উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা মোতমাইন্না বলেন, ‘আবহাওয়ার তারতম্যে এবার অধিকাংশ গাছে কম মুকুল এসেছে। বিশেষ করে মুকুল আসার আগ মুহূর্তে বৃষ্টির কারণে এ সমস্যা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফলন কম হলেও দাম বেশি হবে। এতে চাষিরা কিছুটা হলেও লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবেন।’