নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কয়েক শ কোটি টাকার ফসল তলিয়ে গেছে। ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন কয়েক লাখ কৃষক। এর মধ্যে নেত্রকোনায় ক্ষতির পরিমাণ ৩৭৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে ৭৮ হাজার কৃষক পরিবার। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরিতে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও প্রকৃত কৃষকদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
- নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ–এর হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে শত শত কোটি টাকার বোরো ফসল তলিয়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখো কৃষক।
- নেত্রকোনায় প্রায় ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে ক্ষতির পরিমাণ ৩৭২ কোটি টাকার বেশি হয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবার প্রায় ৭৮ হাজার।
- সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি ও প্রকৃত কৃষকদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে; প্রশাসন তিন মাস সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
নেত্রকোনার হাওরপাড়ের কৃষকরা জানান, বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে এভাবে বিপুল পরিমাণ ফসল তলিয়ে যাবে, তা ছিল কল্পনার বাইরে। খেতে পানি জমায় এবং জ্বালানিসংকটে যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি। শ্রমিকসংকটে কৃষকরা নিজেরাই কাস্তে দিয়ে ধান কেটে শুকনো জমিতে আনছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। অকালবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে। এর বাজারমূল্য ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা অন্তত ৭৮ হাজার। এই ক্ষতি অপূরণীয়।
অধিদপ্তর আরও জানায়, শুধু জেলার হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে ৪৮ হাজার ২৭১ টনের বেশি ধান উৎপাদিত হতো, যার বাজারমূল্য ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি। এ অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৩৮ হাজারের বেশি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে তালিকা শেষ হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা ও পরবর্তী তিন মাস ২০ কেজি করে চাল বিতরণের কথা রয়েছে।
মোহনগঞ্জের মানারকান্দি গ্রামের ওয়াজেদ আলী জানান, ডিঙ্গাপোতা হাওরে ৩০ কাঠা জমিতে বোরো রোপণ করেছিলেন। ১০ কাঠা জমির ধান কাটতে পারলেও বাকি ২০ কাঠা তলিয়ে গেছে। রোদের অভাবে ধান শুকাতে না পেরে কম দামে ভেজা ধান বিক্রি করেছেন। কৃষি সহায়তা পাবেন কি না, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত।
খালিয়াজুরীর সুশীল তালুকদার জানান, ৮০ কাঠা জমির মধ্যে ৪০ কাঠা সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। পাঁচ ভাইয়ের পরিবারে যে ধান ঘরে উঠেছে, তাতে খোরাকি চললেও পড়াশোনা বা চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব নয়। পরে বাধ্য হয়ে চাল কিনে খেতে হবে। গরু বিক্রি বা মহাজনের ঋণের ওপর নির্ভর করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় বোরো চাষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাধাগ্রস্ত হয়। এবারও অতিবৃষ্টি ও ঢলের কারণে তাই হয়েছে। এই ক্ষতি অপূরণীয়। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছে, তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’
সুনামগঞ্জে ত্রাণ তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, কৃষদের ক্ষোভ
সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে এখন হাহাকার। বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় নিঃস্ব হয়েছেন লাখো কৃষক। সরকারি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৫০ হাজার বলা হলেও হাওর নেতারা বলছেন, এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। ফসল হারানো বিশাল একটি অংশ তালিকায় স্থান পায়নি। তালিকায় নাম ওঠাতে মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতি ও নিজেদের ‘ভোটব্যাংক’ বিবেচনায় লোক নির্বাচন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ‘চেয়ারম্যান-মেম্বাররা যোগসাজশ করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের নাম বাদ দিয়েছেন। যারা চাষাবাদ করে না, তালিকায় তাদের নাম এসেছে। আমরা দাবি করি, প্রকৃত কৃষকদের যাচাই করে তালিকায় তাদের সংখ্যা বাড়ানো হোক।’
দেখার হাওরের কৃষক নাসির উদ্দিন (৭৫) জানান, তার ৩০ কিয়ার জমির অর্ধেকই পানির নিচে। গলা সমান পানিতে নেমে পচা ধান কাটছেন কেবল মনকে সান্ত্বনা দিতে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আজ পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বা মেম্বার খোঁজ নিতে এল না। ক্ষতিপূরণ না দিক, একটু সান্ত্বনা তো দিতে পারত! যারা লিস্ট করছে, তারা মুখ চিনে নিজেদের লোক নিয়েছে।’ একই এলাকার কৃষক বিভুল মিয়া (৬৪) জানান, ক্ষতি হলেও কেউ তাদের নাম নিতে আসেনি।
সুনামগঞ্জ কৃষি অফিসের তথ্যমতে, শুক্রবার পর্যন্ত ৮৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। ২২ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। তবে বাস্তবতার সঙ্গে এই হিসাবের মিল নেই বলে দাবি কৃষকদের। তাদের মতে, হাওরে এখনো ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফসল রয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি আগের মতোই ২২ হাজার ৫৫০ হেক্টর রয়েছে।’
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষতির সঠিক তথ্য দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ৫০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি হয়েছে। তাদের তিন ক্যাটাগরিতে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। প্রথম ধাপে ৭ হাজার ৫০০ টাকা ও ২০ কেজি করে চাল দেওয়া শুরু হয়েছে। এই সহায়তা চলবে আগামী তিন মাস।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সমর কুমার পাল বলেন, ‘ধানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করব। এখন পর্যন্ত তালিকায় ৫০ হাজার ক্ষতিগ্রস্তের নাম এসেছে।’