চারদিকে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, চোখ জুড়ালেই যে জমিতে ধান আর ধান, সেই জমির ধান এখন কৃষকদের বোঝা। হাঁটুপানিতে তলিয়ে থাকা ধানের শিষ পুড়ে গেছে মুরগির ফার্মের বিষ্ঠা মিশ্রিত পানিতে। দূষিত পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে ধানের গাছ।
প্রায় ১ হাজার ২০০ একর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন কৃষকরা। প্রতিবছর ক্ষতি কম হলেও এবার ধান ঘরে তোলার কোনো আভাস নেই। শুধু ধানের ক্ষতি নয়, ওই এলাকার প্রাকৃতিক ও চাষের মাছ খুঁজে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ কৃষক ও মাছচাষিদের।
এই অবস্থা রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের শিবপুর, দক্ষিণ শিবপুর, বসন্তপুর, নন্দনপুর, আকন্দপাড়ার বাউশার দোলা, ফরুয়ার দোলা, নয়দুনিয়ার দোলাসহ কয়েকটি এলাকায়।
সোমবার (১১ মে) ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ধানের গাছ থাকলেও পুড়ে গেছে ধান। শুধু খড় কেটে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। তাদের ধান না পাওয়ার বেদনা আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে ওই এলাকা।
কৃষকদের অভিযোগ, রংপুর সদরে অবস্থিত ভিআইপি শাহাদাত হোসেন পোলট্রি ফার্মের বিষ্ঠা নিশ্রিত ময়লা পানি এসে জমিতে ঢুকে। ভিআইপি শাহাদাত হোসেন প্রভাবশালী হওয়ায় মুখ খুলে কথা বলার সাহস নাই তাদের। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চাপা কষ্ট নিয়েই থাকতে হচ্ছে। প্রতিবছর কয়েক শ একর জমির ধান নষ্ট হলেও প্রতিকার মিলছে না।
কৃষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় ১০০ শতকে এক একর। এক একর জমিতে ধান হয় ১২০ মণ অর্থাৎ ১ হাজার একরে ধান হয় ১ লাখ ২০ হাজার মণ।
কৃষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘গরুও খাওছে না, গন্ধে মুখত নেওছে না গরু। ২ একর সউগ নষ্ট হয়া গেইছে। হামরা ছইলপইল ধরি কী করি খামো। মাছ সউগ নষ্ট হয়া গেইছে। একটা ভালো শার্ট নাই গাওত দেইম ধান বেচেয়া কিনার কথা সেই হাউস (ইচ্ছা) থাকি গেল এবার।’
কৃষক মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘১০ একর জমির ধান সব নষ্ট হয়ে গেছে। এক মণ ধান ঘরে তোলার কোনো উপায় নাই। প্রতিবছর কম নষ্ট হলেও এবার একেবারেই শেষ। এই পোলট্রি ফার্মের বিষ্ঠার পানি ঢুকে শুধু ধান নয় মাছ, গাছ ফলমূলের গাছও পচে যাচ্ছে। প্রতিবার বলা হলেও তারা প্রভাবশালী হওয়ায় আমাদের পাত্তা দেন না। আমরা কৃষকরা অসহায় হয়ে পড়েছি।’
কৃষক মতলুবুল হক বলেন, যে ধান আবাদ করছি আর ঘরে উঠছে না। খরচ ওঠা দূরের কথা ধানের গাছ কাটাও সম্ভব হচ্ছে না। পচা নোংরা পানির কারণেই এলাকার লোকজনের বিভিন্ন রোগ হচ্ছে। পাশাপাশি গরু-ছাগলের রোগবালাই হচ্ছে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘যেকোনো খামার, শিল্পকারকারখানা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না, পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া এগুলো লাইসেন্স পায় না। যদি এ রকম হয় যে আগে ক্ষতি করে নাই পরে ক্ষতি করেছে, তাহলে উচিত শাস্তির ব্যবস্থা বা জরিমানা করা। সবকিছুরই একটা প্রক্রিয়া আছে। এগুলো প্রয়োগ করে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে সেটি যদি বন্ধ না করেন তাহলে তিনি অপরাধী।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পোলট্রি ফার্মের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তা যাচাই-বাছাই করছি। তারপর কী ক্ষতি হয়েছে তা নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রংপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক নুর আলম বলেন, ‘বিষয়টি এনফোর্সমেন্টে পাঠানো হয়েছে, জরিমানা হলো কি না দেখতে হবে। একটা প্রতিষ্ঠান চাইলেই বন্ধ করা যায় না। কীভাবে চলছে, কেন চলছে সেটি দেখা যাবে।’