রাজশাহী অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে জ্বালানিসংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিং মিলে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সেচনির্ভর বোরো ধান চাষে। ফসল বৃদ্ধির সময়ে পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে ফলন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎসংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহীতে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বইছে। গতকাল শনিবার রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা দেশের মধ্যেও সর্বোচ্চ। গত বুধবার তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। পরবর্তী সময় তা কমে বৃহস্পতিবার ৩৪ দশমিক ২ এবং শুক্রবার ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়ায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। তবে উৎপাদন সেই অনুযায়ী না বাড়ায় তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ ঘাটতি।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা নেই। রাজশাহীতে যেখানে চাহিদা ৫৫০ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ হচ্ছে কম। আগের দিন ৫০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৬০ মেগাওয়াট।
গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। কৃষকরা জানান, এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দুই ঘণ্টা থাকে না। এই অনিয়মিত সরবরাহের কারণে সেচের সময়সূচি ঠিক রাখা যাচ্ছে না।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ধান এখন চূড়ান্ত বাড়ন্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই সময়ে নিয়মিত সেচ না পেলে শীষ গঠন ও দানার ভর ঠিকমতো হয় না। ফলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। কিন্তু কয়েক দিন ধরে যেভাবে বিদ্যুৎবিভ্রাট বাড়ছে, তাতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। উপরন্তু বাজারে ডিজেল সহজলভ্য না হওয়ায় আমাদের আরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
একই উপজেলার গভীর নলকূপ অপারেটর আবদুর রহমান বলেন, ‘সেচ ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমানে কয়েক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার দীর্ঘ সময় পর আসছে। এতে নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাপপ্রবাহের কারণে জমিতে পানির চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো ধানের উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
গোদাগাড়ীর দিয়ারমানিক চরের কৃষক আবদুল্লাহ বিন সাফি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর সেচ বাবদ খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বারবার পাম্প চালাতে হচ্ছে, আবার ডিজেলের দামও বেশি। কিন্তু তাতেও নিয়মিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদন ভালো হলেও খরচ বেশি হওয়ায় লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়বে, বরং লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।’
এদিকে একই সংকটের ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে রাজশাহীর তানোর উপজেলায়। সেখানে সেচ অপারেটরের খামখেয়ালিপনায় শত শত বিঘা বোরোখেত হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কামারগাঁ ইউনিয়নের চকসাজুড়িয়া মৌজায় সময়মতো পানি না পাওয়ায় জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের সবুজ পাতা।
কৃষকদের অভিযোগ, ফলন ঘরে তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে অপারেটর নানা অজুহাতে সেচ বন্ধ রাখায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কাজিপাড়া এলাকার কৃষকরা জানান, নির্ধারিত হারে বিঘাপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করলেও সেচ সেবায় কোনো নিয়ম মানা হচ্ছে না। সেচ কার্ড থাকার পরও সময়মতো পানি পাচ্ছেন না তারা।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, পানির অভাবে জমির মাটি ফেটে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ধানের গাছগুলো হলদে হয়ে নুয়ে পড়ছে। অনেক কৃষক বলছেন, আর কয়েক দিন এভাবে চললে গাছ বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রায় ২৫০ বিঘার সেচ স্কিমের মধ্যে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমির ধান ইতোমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট অপারেটর রনি ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সেচের তেমন কোনো সমস্যা নেই। প্রায় ২০০ বিঘার বেশি জমিতে নিয়মিত পানি দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজন কৃষকের ভুল-বোঝাবুঝি থেকে এসব অভিযোগ উঠেছে।’
এ বিষয়ে তানোর বিএমডিএ (বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) এর সহকারী প্রকৌশলী নাইমুল হাসান বলেন, ‘গভীর নলকূপের মূল উদ্দেশ্যই হলো কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা দেওয়া। কোনো অপারেটর দায়িত্বে অবহেলা করার অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলাতেই আবাদ হয়েছে ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। এই বিশাল আবাদই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
শুধু কৃষি নয়, বিদ্যুৎসংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবনও। তীব্র গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটে ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। দিন-রাত মিলিয়ে একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। এতে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই, অফিস-আদালতের কাজেও নেমে এসেছে স্থবিরতা।
ব্যবসায়ীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার এলাকার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে ফ্রিজ, ফ্যান, রান্নার যন্ত্রপাতি ঠিকমতো চালানো যায় না। ক্রেতারাও গরম ও অস্বস্তির কারণে কম আসছেন। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছি, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। এতে দৈনিক বিক্রি অর্ধেকের নিচে নেমেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
বিদ্যুৎসংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। আগামী ২১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে উদ্বেগ বাড়ছে। বাগমারা বিএস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক জেসমিন আক্তার বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এই সময়টায় শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত পড়াশোনা এবং পুনরাবৃত্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তারা ঠিকমতো পড়তে পারছে না। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না–এই অবস্থায় পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ সেখানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেশি।’
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেল সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যাহত করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক সাবিনা বেগম বলেন, ‘বোরো ধানের এই পর্যায়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সময়ে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে ফলনের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আংশিক ক্ষতি থেকে শুরু করে উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা যেতে পারে। জ্বালানিসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ অনেক কৃষকই ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের আর্থিক চাপও বাড়ছে, যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।’