তেরোশো ছয়ের এগারো জ্যৈষ্ঠ নেমে এলো ধরাধামে
দেব-শিশু এক বর্ধমানের চুরুলিয়া ছোট গ্রামে। - বিমল মৈত্র
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। চরম দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে তাঁর বেড়ে ওঠা। বাল্যকাল থেকেই নানাবিধ কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি জীবন ধারণ করেছেন। ১৯১৭ সাল- কাজী নজরুল ইসলাম তখন রানীগঞ্জের শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। সামনেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা। এই অবস্থায় হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কেবলমাত্র তাঁর স্কুলজীবনের পরম বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে, করাচি থেকে কলকাতায় এসে প্রথমে তাঁর বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মেসে এবং পরে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’-র অফিসে ওঠেন। সেখানে দু-দিন থেকে তিনি চুরুলিয়ায় যান এবং সপ্তাহখানেক ছুটি কাটিয়ে পুনরায় কলকাতায় ফিরে আসেন।
উল্লেখ্য যে, সুস্থাবস্থায় নজরুল আর কখনও চুরুলিয়ায় যাননি। মুজফ্ফর আহ্মদ ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’য় লিখেছেন - ‘চুরুলিয়া হতে নজরুল যখন কলকাতা ফিরে আসছিল, তখন সে বর্ধমানে থেমে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরির জন্য একখানা দরখাস্ত দিয়ে আসে। তাতে সে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের ঠিকানা দিয়েছিল। সেই সময়ে পল্টন হতে যাঁরা ফিরেছিলেন তাঁদের মধ্যে লেখা-পড়া জানা লোকেদের সরকারি চাকরি হয়ে যাচ্ছিল। ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের ঠিকানাতেই নজরুল ইসলামের নামে মুলাকাত (ইন্টারভিউ) করার জন্য পত্রও এসেছিল। আফ্জালুল হক সাহেব সহ আমরা অনেকেই তাঁকে সেই মুলাকাতে যেতে দিইনি। আমরা তাঁকে বুঝিয়েছিলেম যে সাব-রেজিস্ট্রারের চাকর হলে তাঁকে কোথাও দূরে গ্রামের মতো জায়গায় পড়ে থাকতে হবে। সে জায়গায় সে কলকাতার সাহিত্যিক পরিবেশ পাবে না। আর এই পরিবেশ হারালে তাঁর শক্তির বিকাশে বাধা ঘটবে।’
শুরু হলো কলকাতায় নজরুলের সাহিত্যিক জীবন। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি অতিবাহিত করেছেন বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান এই কলকাতায়। নানা কারণে বারবার ঠিকানা বদল করেছেন। নজরুলের জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই বাড়িগুলি। ক্রিস্টোফার রোডের বাড়ি থেকেই কবি নজরুলকে ১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে ঢাকার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বাড়িটি ছিল কলকাতায় কবির শেষ ঠিকানা।
কলকাতায় নজরুল শুধুমাত্র একাধিক বাড়িতে বসবাস করেছেন তাই নয়, এমন বহু নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত ভবন রয়েছে যেখানে তিনি একাধিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিয়েছেন। ২৬৭, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোড, কলকাতা-৭০০০০৯ ঠিকানায় অবস্থিত ঐতিহ্যবহনকারী রামমোহন লাইব্রেরি অ্যান্ড ফ্রি রিডিং রুম, নজরুল সহ বহু গুণীজনের স্মৃতি বহন করে আজও সংস্কৃতির এই শহরে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে।
দুই বাংলার বিশিষ্ট নজরুল গবেষকদের লেখা বই থেকে জানা যায়, তরুণ বয়স থেকেই মানবতার কবি নজরুল একাধিক অনুষ্ঠানে এই রামমোহন লাইব্রেরি হলে যোগ দেন। এই প্রবন্ধে সেই সম্পর্কে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
অগ্রজ কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি নজরুলের ছিল অপার শ্রদ্ধা। চোখের অতি সূক্ষ্ম নাড়ি ক্রমশ শুকিয়ে আসায়, চির অন্ধত্বের আশঙ্কায় কবি সত্যেন্দ্রনাথ ‘খাঁচার পাখী’ নামক কবিতাটি রচনা করেন। সত্যেন্দ্র-অনুরাগী নজরুল এই কবিতা পড়ে খুবই ব্যথিত হন এবং এরই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ‘দিল্-দরদী’ কবিতাটি রচনা করেন। নজরুল কবিতার শেষাংশে লিখলেন -
বাদশা-কবি! সালাম জানায়
ভক্ত তোমার অ-কবি,
কইতে গিয়ে অশ্রুতে মোর
কথা ডুবে যায় সবি!
এই কবিতা পড়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আবেগাপ্লুত হয়ে যান। নজরুল সুহৃদ মুজফ্ফর আহ্মদ-এর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ‘‘যে সকল কবি ও সাহিত্যিক আমাদের বাসায় কিংবা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিতে আসতেন, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁদের একজন ছিলেন না। নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর দেখা হতো অন্য সাহিত্যিক আড্ডায়। কিন্তু ‘দিল্-দরদী’ সত্যেন্দ্রনাথের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নজরুলের সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি একদিন আমাদের ৩/৪ সি, তালতলা লেনের বাসায় এলেন। বড় দুর্ভাগ্য যে সেই সময়ে নজরুল বাসায় ছিল না, আমিও ছিলাম না।’’
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা প্রয়োজন, ৩/৪ সি, তালতলা লেনের বাড়িতে বসেই ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নজরুল রচনা করেছিলেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। সেই বাড়ির সামনে দাঁড়ালে এখনও মনের গহীনে ধ্বনিত হয় -
বল বীর -
বল উন্নত মম শির!
৪০ বছর বয়সী সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অকাল প্রয়াণ হয় ১৯২২ সালের ২৫ জুন। এই ঘটনায় নজরুল গভীরভাবে শোকাহত হন। ২৬ জুন কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটের স্টুডেন্টস্ হলে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে আয়োজিত শোকসভায় নজরুল যোগ দেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শোকসভায় নজরুল সদ্যরচিত ও সুরারোপিত ‘সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি’ উদ্বোধনী-সঙ্গীত রূপে পরিবেশন করেন।
মাহবুবুল হক-এর ‘নজরুল তারিখ অভিধান’ থেকে জানা যায়, ‘সত্যেন্দ্রনাথের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তিনি গভীর আবেগে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখে দৈনিক সেবকে প্রকাশের জন্য দেন। কিন্তু সেবক পত্রিকায় কর্মরত মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও আবুল কালাম শামসুদ্দীন তাঁর ঐ লেখা পরিবর্তন করে প্রকাশ করেন। নিজের লেখার দুর্গতি দেখে নজরুল ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হন। স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার খর্ব হওয়ায়, প্রতিবাদে নজরুল ডাকযোগে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে ঐ পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।’’
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অকাল প্রয়াণে কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরি হলে ১৯২২ সালের ১১ জুলাই ‘সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত শ্রদ্ধাসভা’ অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক অরুণ কুমার বসুর লেখা থেকে জানা যায়, এই শোকসভায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর সুবিখ্যাত ‘সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’ কবিতাটি স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করে সভাজনকে অশ্রুসজল করে তুলেছিলেন।
শঙ্কর কুমার নাথ ও তারক নাথ ঘোষ-এর লেখা ‘কলকাতায় নজরুল’ বইটি থেকে ঐ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় - গুরুদেবের ইঙ্গিতে তাঁর পাশের আসনটিতেই নজরুল বসলেন। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথ সর্বদা বিভিন্ন সভায় তাঁর পাশে নজরুলকে ঠাঁই দেওয়ার কারণে তৎকালীন সাহিত্যিক জগতের বহু লোক ঈর্ষাপরায়ণ হতেন। রামমোহন হলের এই সভায় রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথের কাব্য প্রতিভা নিয়ে আলোচনা করেন। তারপর কবিগুরুর নির্দেশে নজরুল পাঠ করলেন সদ্যরচিত কবিতা ‘সত্যকবি’। নজরুল লিখলেন -
অসত্য যত রহিল পড়িয়া,
সত্য সে গেল চলে।
বীরের মতন মরণ-কারারে
চরণের তলে দলে।
এছাড়া আরও একটি শোকসভায় নজরুল যোগ দেন। ১৯২২ সালের ২৪ জুলাই কলেজ স্কোয়ারে বঙ্গীয় থিওসফিক্যাল সোসাইটির হলে সরস্বতী ইনস্টিটিউশন আয়োজিত এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সত্যেন্দ্র-স্মৃতিসভায় নজরুল মহৎ সুর ও বাণীতে শোক সংগীত (চলচঞ্চল বাণীর দুলাল এসেছিল পথ ভুলে) গেয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। স্মরণসভায় শ্রদ্ধা নিবেদন করে বক্তব্য প্রদান করেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অকাল প্রয়াণে শোকাভিভূত নজরুল ‘সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ’, ‘সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি’ ও ‘সত্য-কবি’ কবিতা রচনা করেন। তিনটি কবিতাই নজরুল কলকাতায় রচনা করেন এবং ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের শোকসভা ব্যতীত রামমোহন লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত একাধিক অনুষ্ঠানে নজরুল যোগ দেন। মাহবুবুল হক-এর ‘নজরুল তারিখ অভিধান’ থেকে জানা যায়, ১৯২৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে রামমোহন লাইব্রেরি হলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ ছাত্র সম্মিলনীর তৃতীয় ও শেষ দিনের অধিবেশনে নজরুল ‘ওঠ রে চাষী জগৎবাসী ধর কষে লাঙল’ গানটি উদ্বোধনী-সঙ্গীত হিসেবে পরিবেশন করেন।
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক বাঁধন সেনগুপ্ত তাঁর ‘সমগ্র নজরুল জীবন’ গ্রন্থেও এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তাঁর কথায় - ‘‘২৪ সেপ্টেম্বর (১৯২৮) তারিখে বিকেল ৩টায় নজরুল নিখিল বঙ্গীয় ছাত্র সম্মিলনীর তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দিনে রামমোহন হলে আয়োজিত সভার প্রারম্ভে নজরুল গাইলেন উদ্বোধন-সংগীত - ‘ওঠ রে চাষী জগৎবাসী ধর কষে লাঙল’। সভার সভাপতি ছিলেন জওহরলাল নেহেরু।’’
২৮ শে সেপ্টেম্বর, ১৯২৮ সালে ‘সাপ্তাহিক সওগাত’- এ প্রকাশিত ‘নিখিল বঙ্গ ছাত্র-সম্মিলন’ শীর্ষক সংবাদ থেকেও এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানা যায় -
‘‘...গত সোমবার (২৪শে সেপ্টেম্বর) তিন ঘটিকার সময় পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে নিখিল বঙ্গ ছাত্র-সম্মিলনির তৃতীয় ও শেষ দিনের অধিবেশন আরম্ভ হয়। ...সভার প্রারম্ভে নজরুলের ‘ওঠ রে চাষী ভারত বাসী ধর কষে লাঙল’ ইত্যাদি সঙ্গীত গীত হয়।’’
১৯২৪ সালের ৩১ আগস্ট রামমোহন লাইব্রেরি হলে এক সংগীত সমাবেশে দিলীপ রায়, সাহানা দেবী প্রমুখ রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র-নজরুল ও অতুলপ্রসাদের গান পরিবেশন করেন। বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম সার্থকভাবে গজল গান রচনা করেন কাজী নজরুল ইসলাম। দিলীপকুমার রায় নজরুল রচিত বাংলা গজলের প্রচারের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। স্বকণ্ঠে বহু অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেছিলেন নজরুলের গান।
দ্বিজেন্দ্র-পুত্র দিলীপকুমার রায় তাঁর স্মৃতিকথামূলক রচনায় লিখেছেন - ‘‘দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন গানের এক দিকপাল - ধ্রুপদ খেয়াল টপ্পা কীর্তন বাউল ও বহুভঙ্গিম প্রেমের গানে স্বদেশী গানে তাঁর দান যে অসামান্য আজ সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁর গানে ঠুংরির চাল মেলে না- পেলবতা ও সৌকুমার্যের সমন্বয়ে। বাংলায় এ চাল প্রথমে আনেন অতুলপ্রসাদ। তাঁর সম্বন্ধে আমি অন্যত্র বহু আলোচনা করেছি। কাজীর সম্বন্ধেও করেছি আমার দু'টি নিবন্ধে। তাতে দেখাতে চেষ্টা করেছি কীভাবে আমাদের বাংলা গানকে ও সম্বৃদ্ধ করে গেছে গজলের প্রেমের দুলকি চালে। এর পরে ও ঠুংরিতেও অনেকগুলি গান বাঁধে অতুলপ্রসাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। কিন্তু সে গানগুলো চমৎকার হলেও গানে ওর স্বকীয়তা ফুটে উঠেছিল সবচেয়ে বেশি ওর বাংলা গজলেই বলব। আমার বিশেষ প্রিয় ছিল ওর একটি গজল যেটি ভ্রাম্যমাণ হয়ে সর্বত্র গেয়ে আমি বহু শ্রোতাকেই সচকিত করে তুলেছিলাম:
‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল’।
এ-গানটি একদা প্রায় আমার ‘রাঙা জবা কে দিল তোর পায়ে মুঠো মুঠো’-র মতনই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই গানটির জন্যই ও আমাকে পরে ওর গীতিগুচ্ছ ‘বুলবুল’ উৎসর্গ করে।’’
‘বুল্বুল্’- এ নজরুলের বহু গজল গান সংকলিত হয়। উৎসর্গপত্রে নজরুল লেখেন -
সুরশিল্পী, বন্ধু
দিলীপ কুমার রায়
কর-কমলেষু
আমার শুধু এ বাণী হে বন্ধু, আমার শুধু এ গান।
তুমি তারে দিলে রূপ-রঙ্গিমা, তুমি তারে দিলে প্রাণ!
আমার ব্যথায় বেঁধেছিল নীড় যে গানের বুলবুলি,
আপনি আসিয়া আদরে তাহারে বক্ষে লইলে তুলি'!
আমার পাখির কণ্ঠে মিশালে তোমার দরদ ল'য়ে,
আমার বেদনা বাজে আজ তাই সবার বেদনা হ'য়ে।
যে গান গেয়েছি একাকী নিশীথে কুসুমের কানে কানে,
ওগো গুণী, তুমি ছড়াইলে, তারে সব বুকে, সব খানে।
বুকে বুকে আজ পেয়েছে আশয় আমার নীড়ের পাখি,
মুক্তপক্ষ উড়িতে যে চায়-কেন তারে বেঁধে রাখি?
তোমার কাননে উড়ে গেল মোর বাগিচার বুলবুলি,
বড় ভীরু সে যে, দোস্ত্, তাহারে দস্তে লইও তুলি'!
তোমার প্রতিভা ও প্রাণমুগ্ধ
নজরুল
কাজী নজরুল ইসলামের ‘বুল্বুল্’ খুবই জনপ্রিয় হয়। সেই বিষয়ক তথ্য পাওয়া যায় ডি.এম. লাইব্রেরির গোপালদাস মজুমদারের লেখায় - ‘‘তখনকার দিনে বাইশ শ করে ছাপা বই এক বছরের মধ্যে ফোর্থ এডিসন হওয়া দুঃস্বপ্নের কথা। নজরুলের ‘বুল্বুল্’ কিন্তু তাই হয়েছিল। দাম পাঁচ সিকা। পাঁচ সিকা থেকে কত সিকে যে লাভবান হয়েছি তা ঈশ্বরের অনুগ্রহ, নজরুলের বন্ধুপ্রীতি এবং আমার সৌভাগ্যের নিদর্শন।’’
এভাবেই বাংলা সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন নজরুল। আড্ডাপ্রিয় নজরুল যেখানেই যেতেন সেখানেই হয়ে উঠতেন আড্ডার মধ্যমণি। সময় সম্পর্কে তখন তাঁর হুঁশ থাকতো না। গানে, কবিতায়, আড্ডায় কাটিয়ে দিতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভুলে যেতেন পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির কথা। এরকমই এক দিনের বর্ণনা করেছেন মোহাম্মদ মোদাব্বের। রামমোহন লাইব্রেরির এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা কবির, কিন্তু তিনি তরুণদের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন আড্ডায়। মোদাব্বের লিখছেন - ‘কলকাতার তালতলা অঞ্চলে আমরা কয়েকজন মিলে গরীব কলেজ ছাত্রদের জন্য একটি ছাত্রাবাস খুলেছিলাম। সেখানে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন দরিদ্র ছাত্রের বিনা খরচে থাকা- খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই ছাত্ররা একদিন আবদার ধরলো যে ওদের ছাত্রাবাসে কবিকে একদিন আনতে হবে। কবিকে আনার দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপানো হল। আমি কবির নিকট সর্বহারা মানুষের দোহাই দিয়ে তাঁর করুণা প্রার্থনা করলাম। কবি বিনা দ্বিধায় রাজি হলেন। এক রবিবারের দুপুরে আমি কবিকে নিয়ে ছাত্রাবাসে হাজির হলাম। ছাত্রদের পেয়ে কবি যেন আত্মহারা হয়ে গেলেন। ছাত্ররা তাঁর কাছে পল্টন-জীবনের গল্প শুনলো, জেল-জীবনের গল্প শুনলো, তারপর শুরু হল আবৃত্তি ও গান। মনে হল, আজকের এই মজলিসের বুঝি শেষ নেই। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, ছাত্রাবাসের চারদিক ঘিরে হাজার মানুষের ভিড়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গিয়ে সন্ধ্যে, তারপর রাত ঘনিয়ে এলো।
এমন সময় হৈ-চৈ করতে করতে পাঁচ -ছ’জন ঘরে ঢুকে মজলিসের রসভঙ্গ করে দিল। তারা রক্তচক্ষু, উগ্রমূর্তি। আমাদের ওপর তর্জন-গর্জন শুরু হল: কি রকম ভদ্রলোক আপনারা? কবির সম্বর্ধনা সভা হচ্ছে রামমোহন লাইব্রেরিতে, সময় ছিল সন্ধ্যা সাতটায় অথচ কবিকে আপনারা এখানে আটকে রেখেছেন! মারমুখো যুবকদের অতিকষ্টে জানালাম যে, এসব খবর তো আমরা জানিনে, জানলে নিশ্চয়ই যথাসময়ে তাঁকে পৌঁছিয়ে দিতাম। কবি কিন্তু নির্বিকারভাবে হাসতে হাসতে বললেন, তাই তো, বড্ড ভুল হয়ে গেছে। যাক্ চল্, তোরাও চল্ সভায়। এই কথা বলে তিনি আমাদের অনেককে সঙ্গে নিয়ে রামমোহন লাইব্রেরির দিকে ট্যাক্সিতে রওয়ানা হলেন।’’
বিশিষ্ট নজরুল গবেষকদের গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য - বহু মনীষীর স্মৃতিধন্য রামমোহন লাইব্রেরি হলে একাধিক অনুষ্ঠানে আমাদের প্রাণের কবি নজরুল যোগ দিয়েছিলেন। সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতা শহর তার ঐতিহ্যকে বহন করে এগিয়ে চলুক শত শত বছর, কলকাতাবাসী হিসেবে আমরাও যেন এই অমূল্য স্মৃতি সযত্নে লালন করি অন্তরে - সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে এটুকুই চাওয়া।
তথ্যসূত্র:
বুল্বুল্: কাজী নজরুল ইসলাম
কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা: মুজফ্ফর আহ্মদ
স্মরণ-বরণ : গোপালদাস মজুমদার
শতকথায় নজরুল : সম্পাদনা - কল্যাণী কাজী
সমগ্র নজরুল জীবন : বাঁধন সেনগুপ্ত
নজরুল জীবনী : অরুণকুমার বসু
নজরুল তারিখ অভিধান : মাহবুবুল হক
কলকাতায় নজরুল: শঙ্কর কুমার নাথ, তারক নাথ ঘোষ
লেখক: নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)
অমিয়/