কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবস আজ। এ উপলক্ষে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করবেন খ্যাতিমান নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা। নজরুলের গান ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা বলেছেন নন্দিত এই শিল্পী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ মিজান
নজরুলের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আপনার ব্যস্ততা কেমন?
আজ ভোরে নজরুলের সমাধিতে ফুল দেব- আমার গানের স্কুল সুরসপ্তকের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। এভাবেই নজরুলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার দিনের শুরু হবে। চ্যানেল আইয়ে আমার একটি একক সংগীতানুষ্ঠান প্রচার হবে। ঢাকা এবং কুয়াকাটার বিভিন্ন মনোরম লোকেশনে গানগুলোর শুটিং হয়েছে। অনুষ্ঠানের নাম ‘মোরা আর জনমে’। এটি সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে চ্যানেল আইতে প্রচার হবে।
বিটিভি ও এটিএন বাংলায় দুটি অনুষ্ঠান প্রচার হবে। বিকেলে বাংলা একাডেমিতে নজরুলকে নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে গাইব। রাতে বাংলাভিশনে একটি লাইভ অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করব। এ ছাড়া নজরুল ইনস্টিটিউটের আমি একজন ট্রাস্টি মেম্বার। সেখানে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমি উপস্থিত থাকব।
আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার নজরুলকে নিয়ে যে আয়োজন হচ্ছে, তা কি যথেষ্ট?
নজরুলকে নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠান বিগত বছরগুলোতে আমার অংশগ্রহণ কমই ছিল। বিশেষ করে গত ১৬ বছরে আমাকে অনুষ্ঠানে ডাকা হতো না। একমাত্র চ্যানেল আইতে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতাম। এর বাইরে একটা-দুটা চ্যানেলের অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছি। বিটিভি এবং বাংলাদেশ বেতারে কখনো আমাকে ডাকা হয়নি। এমনো হয়েছে ভুল করে বেতারে আমাকে ডেকে সেই অনুষ্ঠান আবারও বাতিল করা হয়েছে।
যারা আমাকে ডেকেছিল ভুল করে তারাও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে গেছে। এ বিষয়টি আমাকে খুব ব্যথিত করেছে। বেতারে চেহারা দেখানো যায় না। ওখানে শুধু কণ্ঠ শোনা যায়, এই জায়গাটিতেও আমাকে ডাকা হয়নি। তবে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বিটিভি, বেতারে আমাকে ডাকা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতেও আমি এখন নিয়মিত অনুষ্ঠান করার ডাক পাচ্ছি।
বিগত বছরে কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে মনোক্ষুণ্ণ হয়েছেন?
একবার অফিসার্স ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকা হলো। মূলত আমাকে ডেকেছিলেন আমার হাজব্যান্ডের সহকর্মী ও তার ওয়াইফ। অনেক বছর পর অফিসার্স ক্লাবের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে আমি খুশি হয়েছিলাম। একই অনুষ্ঠানে ভারতীয় এক তরুণ শিল্পী এসেছিল গান শোনাতে। সে একটা রিয়েলিটি শো থেকে বেরিয়েছে। খুব বেশি পরিচিত মুখ নয়। অনুষ্ঠানে গান করলাম দুজনেই। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষের দিকে ওই তরুণ শিল্পীকে ক্রেস্ট, ফুলের তোড়াসহ নানা সম্মাননা দেওয়া হলো। আমাকে কিছুই দেওয়া হলো না। শূন্যহাতে আমি বসে ছিলাম। তখন অনেকেই বলেছিলেন এটা কেমন কথা, আমাকে ক্রেস্ট না দিক অন্তত ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে পারতেন।
এটাও যদি না পারেন, তবে আমার হাত দিয়ে ওই তরুণ শিল্পীকে একটা ক্রেস্ট দেওয়াতে পারতেন। তখন আমার হাজব্যান্ডের সহকর্মীর ওয়াইফ খুব রেগে গিয়েছিল এই অবস্থা দেখে। তিনিও আমার জন্য কষ্ট পেয়েছিলেন। আমি ভীষণ আঘাত পেয়েছিলাম। এই ঘটনা মনে পড়লে আমার এখনো খারাপ লাগে।
আপনার গানের প্রতিষ্ঠান সুরসপ্তকের পক্ষ থেকে কোনো আয়োজন আছে কী?
সুরসপ্তকের কোনো আয়োজন নেই। তবে চ্যানেল আইতে সকালের অনুষ্ঠানের গানে গানে শুরুতে আমার সঙ্গে সুরসপ্তকের সব ছেলেমেয়েরা অংশ নিয়েছে।
জন্ম বা মৃত্যু দিবস এলেই ঘটা করে নজরুলকে নিয়ে আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া পুরো বছর তেমন কোনো আয়োজন থাকে না। এটা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
আমরা নজরুলকে জাতীয় কবি নজরুল বলি। অথচ জাতীয় কবির জন্য যেগুলো করণীয়, তা কি হচ্ছে? আমি জানি না। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে সব সময় চেষ্টায় আছি। আমি চাই, আমার ছাত্রছাত্রীরাও একসময় নজরুলের পতাকা ওড়াবে। যে মানুষটি সকল মানুষের, সকল ধর্ম ও উৎসবের গান রচনা করেছেন তাকে আমরা জন্ম বা মৃত্যুদিনেই স্মরণ করি। তার পরও আমি একটা কথা বলি কিছু না হওয়ার চেয়েও তো কিছু একটা হচ্ছে। এ ছাড়া নজরুলের জন্ম ও প্রয়াণ দিবসের কিছুদিন আগেই রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও মৃত্যু দিন পালন করা হয়। তাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে নজরুলের বেলায় নাকি আর বাজেট থাকে না।
আপনি একজন সংগীত পরিচালকও। নতুন কোনো গান করেছেন?
আমি এই মুহূর্তে বিটিভিতে ‘অগ্নিবীণা’ নামের একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছি। এখানে জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি নতুন ভালো গায় এমন শিল্পীরাও থাকবে। এটি একটি পাক্ষিক অনুষ্ঠান। এখানে প্রতি পর্বে দুজন করে শিল্পী থাকেন। সবমিলিয়ে দুটি করে দুজনের সিঙ্গেল গান থাকে। একটি গান ডুয়েট থাকে। এই অনুষ্ঠানের সংগীত পরিচালনা ছাড়া অন্য কোনো গানে সংগীত পরিচালনা করছি না। গানের পাশাপাশি সংগীত পরিচালনা করতে আমার ভালো লাগে।
নতুন যারা নজরুলসংগীত চর্চা করছে, তাদের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
নতুন প্রজন্ম যথেষ্ট ভালো। কিন্তু এরা এত চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়ে শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম করতে পারছে না। সময়টা আসলে তাদের অনুকূলে নেই। ফেসবুক শিল্পী হয়ে তো ক্যারিয়ার গড়া যায় না। জীবনটা তো ডিজিটালের কোনো বাক্স নয়। এর মধ্যেও হয়তো দু-একজন বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। তবে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা অনেক। আশা করি, একদিন তারা তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে।
/এমএস