ষোড়শ পর্ব
শাহবাজ খান স্যার।
হুম। কতদিন আগে ভাড়া দিয়েছে?
এক বছর আগে, স্যার।
এক বছর ধরে মেয়েটি এখানে একা থাকত?
না, স্যার। ওই লোকটা মাঝে মাঝে এই ফ্ল্যাটে আসত।
তাই নাকি!
ফ্ল্যাটের ডিডের কপি আছে না?
জি স্যার।
নিয়ে এসো।
খালেক মিয়া দ্রুত বের হয়ে যায়। তার অফিস কক্ষে গিয়ে ফাইল থেকে ডিডের কপি বের করে। তার পর ফটোকপি করে একটি কপি নিয়ে শ্যামল পালের কাছে যায়। কপিটি তার হাতে দিয়ে বলে, স্যার, আমি এখানে চাকরি করি। কাকে ভাড়া দেবে না দেবে; সেটা ফ্ল্যাটমালিকের এখতিয়ার। কাকে বাড়া দেওয়া হইছে সেইটা আমরা জানিও না, স্যার। আমাকে ডিডের কপি দিয়া কইল, এইডা ফাইলে রাখো। আমি রাখছি। আর মাস শেষে ভাড়ার টাকা তুলি। ওই লোকটা চেকের মাধ্যমে ভাড়া দিয়ে আসতেছে। এই পর্যন্তই, স্যার। আমার চাকরিটা যেন না যায়, স্যার! তাইলে আমার ছেলেমেয়ে নিয়া পথে বসতে হইব।
চিন্তা করো না। তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। তবে একটা কথা, টাইম টু টাইম আমাকে তথ্য দিয়া সাহায্য করবা। না করলে কিন্তু খবর আছে! তোমার চাকরি তো যাবেই। জেলেও যেতে হবে।
শ্যামল পালের কথায় কিছুটা ভরসা পেল খালেক মিয়া। কিন্তু দুশ্চিন্তা কাটল না।
শ্যামল পাল থানায় বসে রুবিনার ডায়েরি পড়ছে। ডায়েরির পাতায় পাতায় শাহবাজ খানকে নিয়ে তার ভালোবাসার কথা লেখা। মেয়েটির সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ছবিও ডায়েরিতে আঠা দিয়ে লাগানো। ডায়েরির এক জায়গায় লেখা, শাহবাজের মা আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। শাহবাজও টেলিফোনে রুবিনাকে সে কথা বলেছে। খুব সাবধান! তুমি বাইরের কারও সঙ্গে মিশবে না। কারও সঙ্গে ছবি তুলবে না। তোমার আমার ছবি কখনো কাউকে দেখাবে না। ফেসবুকে ভুলেও দেবে না। তাহলে কিন্তু কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মা জানতে পারলে তোমাকে মেরেই ফেলবে।
ডায়েরি পড়তে পড়তে শ্যামল পাল ভাবে, সত্যিই মেয়েটিকে মেরে ফেলা হয়েছে! আত্মহত্যা করলে মেয়েটি খাটের ওপর থেকে ফ্যানে ঝোলার কথা না। তাকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারপর ফ্যানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য শাহবাজ খানই দায়ী। মেয়েটিকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছে সে। তাকে ঢাকায় রাখার জন্য সে-ই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় হয়তো মেয়েটিকে হত্যা করা হয়েছে।
শ্যামল পালের ভাবনা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শক এসে বলল, স্যার, ভয়াবহ খবর আছে!
শ্যামল পাল বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইল, কী ভয়াবহ খবর?
আজকে একটা অডিও ফাঁস হয়েছে।
কী আছে তাতে?
শাহবাজ খানের সঙ্গে মেয়েটির কথোপকথন।
তাই?
পুলিশ কর্মকর্তা পকেট থেকে মোবাইল বের করে নিজের ফেসবুক আইডিতে ঢুকল। তার পর ম্যাসেঞ্জারে অডিও রেকর্ডটি অন করে বলল, স্যার, এই যে শুনুন।
শ্যামল পাল মোবাইল কানের কাছে নিয়ে অডিওটি শুনল। তিন-তিনবার শোনার পর সে মোবাইল ফিরিয়ে দিয়ে বলল, এটা সম্ভবত, মেয়েটি মারা যাওয়ার দু-এক দিন আগের! তাই না?
তাই মনে হচ্ছে, স্যার।
লোকটার কথাবার্তা শুনলেন! কী সব ভাষা! ছি! এরা বড়লোক হলো কী করে!
আর বলবেন না! আচ্ছা শোনেন, শাহবাজ খানের ব্যাপারে ডিটেইল তথ্য জোগাড় করেন। তার ব্যবসা, পারিবারিক জীবন, লেখাপড়া সবকিছু। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হবে। মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করেছে। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকায় পৌঁছবে। তারা এলেই মামলা ফাইল করা হবে। তারপর দেখা যাক কোন দিকে যায়!
পুলিশ কর্মকর্তা সংশয়ের ভঙ্গিতে বললেন, স্যার, কিছু কী করতে পারবেন?
কেন?
শুনলাম, সে নাকি অনেক পাওয়ারফুল!
কিসের পাওয়ার? টাকার নাকি অন্য কিছুর?
টাকা থাকলে আর কিছু লাগে, স্যার!
তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু আমি তো চাই, মামলাটা ঠিকঠাকভাবে চলুক। মানে, দোষীর শাস্তি হোক। আমরা সৎ থাকলে সেটা কি সম্ভব নয়?
না, স্যার। সেটাও সম্ভব না।
কেন?
কারণ, ওপর থেকে যদি ফোন আসে? রাজনৈতিকভাবে প্রভাব খাটালে আপনি-আমি কী করব? আমরা তো ছোট চাকরি করি!
দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে শ্যামল পাল। সে মামলার গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। ভাবতে ভাবতেই সে রুবিনার বড় ভাইয়ের মোবাইলে ফোন করে। ফোনে রুবিনার বড় ভাই রাশেদুল হক জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই সে থানায় পৌঁছাচ্ছে।
শ্যামল পালের সঙ্গে আলোচনার পর রাশেদুল হক বাদী হয়ে শাহবাজ খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। বাদী কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটি কথাই বলে, আমরা গরিব মানুষ। টাকা-পয়সা খরচ করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই। আপনারা এই সহযোগিতাটুকু করবেন। আমাদের বিশ্বাস, আমরা ন্যায়বিচার পাব।
বাদীকে ভরসা দেওয়ার মতো মনের জোর নেই শ্যামল পালের। সে তাকে শুধু সান্ত্বনা দিয়ে বলল, চিন্তা করবেন না। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখুন।
বিকেলে শ্যামল পালের কাছে এল কয়েকজন সাংবাদিক। তারা রুবিনার আত্মহত্যার বিষয়ে জানতে চাইল। সে সাংবাদিকদের বলল, রুবিনার আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে শাহবাজ খানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আপাতত এটাই মামলার অগ্রগতি।
পরদিন দেশের অধিকাংশ পত্রিকায় শাহবাজ খান ও রুবিনার অন্তরঙ্গ ছবিসহ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।
১৩
শাহবাজ খান ও রুবিনার অন্তরঙ্গ ছবিসহ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। এই ছবি প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেই ভাইরাল হওয়া ছবিই আসে পত্রিকায়। এসব দেশে আমজনতা বলে, এখন আর সাংবাদিকরা সাংবাদিকতা করছে না। তারা তথ্য লুকিয়ে রাখছে। সাধারণ মানুষ তথ্য খুঁজে বের করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছে। পত্রিকাগুলো বাধ্য হচ্ছে সেই ছবি ছাপতে।
সকালে পত্রিকা দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন বৈরম খান। তিনি পত্রিকা ছুড়ে ফেলে শাহবাজকে ফোন করলেন। শাহবাজের ফোন বন্ধ পেয়ে তার মেজাজটা আরও চটে গেল। তিনি ম্যাককে ফোন দিলেন। তাকেও ফোনে পাওয়া গেল না। রাগে তিনি জাতি সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছিলেন। তিনি চিৎকার দিয়ে কাজের লোকদের ডাকলেন। কে কোথায় আছিস!
বৈরম খান ডাকামাত্র কাউকে না কাউকে তার সামনে হাজির থাকতে হয়। তা না হলে বাড়িঘর মাথায় তোলেন তিনি। আজও তিনি তেমন কাণ্ডই করেছেন। কাউকে না দেখে তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলেন। একপর্যায়ে শরীফ নামের একজন দৌড়ে এল বৈরম খানের কাছে। সে থরথর করে কাঁপছে। বৈরম খান তার ওপর চড়াও হলেন। হারামজাদা! কোথায় থাকিস? ডাকলে কাছে পাওয়া যায় না! আজ বাসায় যতগুলো পত্রিকা এসেছে সব আমার কাছে নিয়া আয়! দুই মিনিটের মধ্যে আসবি।
শরীফ দৌড়ে গিয়ে দুই হাতে পত্রিকা নিয়ে ড্রয়িং রুমে ছুটে যায়। বৈরম খানের সামনে টি-টেবিলের ওপর পত্রিকা রেখে কিছুটা দূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এই! শাহবাজ আর ম্যাকরে খবর দে। এই মুহূর্তে যেন আমার সামনে হাজির হয়! দেরি করলে ওদের খবর আছে! আর টেলিফোন অপারেটরকে বল, আমাদের সম্পাদককে ধরতে।
শরীফ জি স্যার বলে ছুটে যায় টেলিফোন অপারেটরের কাছে। তাকে খবরটা দিয়ে সে নিজের মোবাইল থেকে শাহবাজ খানের ব্যক্তিগত সহকারী মোমিনকে ফোন করে। ফোন ধরেই সে বলে, কী হইছে শরীফ ভাই?
হইছে আমার কপাল! হোনেন, ছোড স্যার কই?
স্যার তো... কেন কী হইছে?
আরে ভাই; কী হইছে হেইডা পরে হোনবেন। আগে কন স্যার কই?
মোমিন ফিসফিস করে বলল, স্যার ডুব মারছে। এক্কেরে গভীর জলে ডুব মারছে।
ডুব মারছে!
চলবে...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫