বাংলামোটর এলাকার বাসিন্দা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর ছাত্রী নওশিন তাবাচ্ছুম মুন গত ৪ জুলাই তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি পরীক্ষা দিতে যান। পরীক্ষা দিয়ে আসার পর রাতে তার জ্বর হয়। সেই জ্বর থেকে সেরে উঠতে তার ৮-৯ দিন লেগে গেছে। এখনো শরীর দুর্বল। ব্যথাও আছে হালকা।
জ্বরে আক্রান্ত হলেও মুন চিকিৎসকের কাছে যাননি। তিনি বলেন, ‘ভাইরাস জ্বর। সবারই হচ্ছে। তাই আর ডাক্তার দেখাইনি। জ্বর সারতে যদিও ৮-৯ দিন লাগছে। যখন জ্বর ছিল, তখন বেশ শরীর ব্যথা ছিল। মুখে স্বাদ ছিল না। ওষুধ খেলে ঘাম এসে জ্বর নেমে যেত। প্রচণ্ড দুর্বল লাগত। এখনো শরীর অনেক দুর্বল।’
নতুন বাজার এলাকার তাবাচ্ছুম কবির এশাও বেশ কয়েক দিন জ্বরে ভুগেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্বর এলে প্রচণ্ড মাথাব্যথা হতো। মনে হতো প্রেশার লো হয়ে যাচ্ছে। যদিও জ্বর আসার পর প্রেশার মেপে দেখা হয়নি। তিন দিন পর জ্বর কমে যায়। শরীরের ব্যথাও কমে গেছে। কিন্তু প্রচুর পরিমাণে শুকনো কাশি হচ্ছে।’
নাখালপাড়া এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রথমে হঠাৎ করে ছোট ছেলেটার জ্বর এল। দুই দিন পর ডাক্তারের কাছে নিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করালাম। নেগেটিভ এল। কিন্তু প্লেটলেট কম থাকায় সন্দেহ হলো। ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ খাওয়ালাম। এরই মধ্যে ছেলের মায়েরও জ্বর হলো। তার ডেঙ্গু ধরা পড়ল। তার কমার পর আমার জ্বর। জ্বর আমাকে একেবারেই কাবু করে ফেলেছে। আমার চিকুনগুনিয়া হয়েছে। সেভাবেই ডাক্তার চিকিৎসা দিয়েছেন। অনেক দিন অফিসে যেতে পারিনি। শরীরে এখন প্রচণ্ড ব্যথা। হাতের আঙুলের কড়ে, হাঁটু ও পায়ের গোড়ালির ওপরে প্রচণ্ড ব্যথা। মনে হয় কেউ পিটিয়েছে। জানি না কতদিন লাগবে শরীরের এই ব্যথা কমতে।’
দয়াগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘আমারও চিকুনগুনিয়া হয়েছে। শরীরে এত ব্যথা, মনে হয় যেন হাড়গুলো ভেঙে গেছে। ডাক্তার বলছেন আমার এই ব্যথা কমতে দুই মাসও লাগতে পারে আবার ছয় মাসও লাগতে পারে।’
শুধু নওশিন তাবাচ্ছুম মুন, তাবাচ্ছুম কবির এশা, দেলোয়ার হোসেন বা জুবায়ের হোসেন নয়; এখন রাজধানীসহ সারা দেশেই ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বরে ভুগতে হচ্ছে অনেককে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে প্রধানত ছয় ধরনের জ্বর হচ্ছে। জ্বর হলে অবহেলা নয়। কারণ কোনো কোনো জ্বর প্রাণঘাতীও। ডেঙ্গুতে প্রতিদিনই কারও না কারও প্রাণ যাচ্ছে। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেই অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। শুরুতে কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। সবচেয়ে ভালো হয় শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে নিলে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, সারা দেশেই এখন ব্যাপকভাবে জ্বর হচ্ছে। এই জ্বরের পেছনে প্রধানত ছয়টি কারণ রয়েছে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, করোনা, সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, শ্বাসতন্ত্রীয় সংক্রমণ এবং পানিবাহিত সংক্রমণ যেমন টাইফয়েড-প্যারাটাইফয়েড। বেশির ভাগ মানুষ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় ভুগছেন। যেসব এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টি বা বন্যার কারণে খাওয়ার পানির লাইনের সঙ্গে ময়লা পানির সংযোগ হয়ে গেছে, সেসব জায়গায় পানিবাহিত রোগ বাড়ছে। যদি কারও জ্বর হয় তিনি যেন ঘরে বসে না থাকেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। কারণ জ্বরের ধরনটা নির্ণয় করার পরই চিকিৎসার সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়।
তিনি বলেন, ‘কারও জ্বর হলে আমরা বলব বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি, তরল খাবার, স্যালাইন এবং শুধু প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ খাবে। কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নিজে নিজে খাবে না। কারণ ভুল ওষুধ খাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, মৃত্যুও হতে পারে। অতএব জ্বর হলে কেউ অবহেলা করবেন না। আবার আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। খাওয়ার পানির ক্ষেত্রে বলব- যেসব জায়গায় খাওয়ার পানি নিরাপদ নয়, সেখানকার মানুষ যেন ফুটিয়ে পান করেন।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ গরম পড়ছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন রোগ হচ্ছে। ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া এগুলো তো হচ্ছেই। সঙ্গে ভাইরাস জ্বর হচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যারা বয়স্ক, যাদের ডায়াবেটিস আছে, কিডনি রোগী, হার্টের রোগী, তাদের সমস্যা বেশি হচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা অথবা বাইরে রাস্তাঘাটে যারা কাজ করেন, তারাও আক্রান্ত হচ্ছেন। মূল বিষয় হলো আবহাওয়ার পরিবর্তন।
তিনি এ সময় করণীয় সম্পর্কে বলেন, বাইরের খাবার না পারতে খাবেন না, বাইরে প্রয়োজন ছাড়া ঘোরাফেরা করবেন না। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি এগুলো এখন কম করতে হবে। দু-তিন দিনের মধ্যে জ্বর না কমলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এই সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের প্রভাব বেশি থাকে। এতে বেশি আক্রান্ত হয়। অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগ আছে। কোভিড অনেকটা কমেছে। কিন্তু ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া হচ্ছে। এ বছর গতবারের চেয়ে চিকুনগুনিয়া বেশি হচ্ছে। জ্বর হলে প্রথম তিন দিন বিশ্রাম নিতে হবে। প্যারাসিটামল খেতে হবে। যাদের বয়স বেশি, সন্তানসম্ভবা তারা বেশি কেয়ারে থাকবেন। প্রথমে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রয়োজন নেই। তিন দিনে না কমলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সেই অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। সেই সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।
পুষ্টিবিদ মুনিয়া মৌরিন মুমু বলেন, এই সময় সাইট্রাস ফল বা ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল, বিশেষ করে কমলা, লেবু, মালটা, বাতাবি লেবু, আমড়া ইত্যাদি খাওয়া দরকার। এ জাতীয় খাবার ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত ভিটামিন ‘সি’ গ্রহণ সর্দি-কাশির তীব্রতা কমাতে পারে। আদা ও মধুতে রয়েছে প্রদাহনাশক এবং ভাইরাসবিরোধী গুণ। গরম পানিতে আদা-মধু মিশিয়ে খেলে গলাব্যথা এবং নাক বন্ধ হওয়া কমাতে সাহায্য করে। সর্দি-জ্বরে উপকার পেতে রাতে দুধের সঙ্গে হলুদ মিশিয়েও খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া হারবাল চায়ে তুলসী পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে। তুলসী পাতায় ঔষধি গুণ রয়েছে। এই পাতা সর্দি-কাশিতে, বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং কাশি কমাতে সাহায্য করে।
উল্লেখ্য, চিকুনগুনিয়া প্রাণঘাতী না হলেও মানুষকে খুব ভোগায়। আর ডেঙ্গু প্রাণঘাতী। এ বছর সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ৮৮০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকুনগুনিয়ায় কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।



