কিশোরী বয়স জীবনের একটি স্পর্শকাতর সময়, যখন শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে কিছু জটিল রোগের ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের একটি বিরল ধরন, ডিসজারমিনোমা, মূলত ডিম্বাণু বা ওভাম থেকে উৎপন্ন হয়। এটি জার্ম সেল টিউমারের অন্তর্ভুক্ত এবং সাধারণত কম বয়সী মেয়েদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।
উৎপত্তির কারণ
এই ক্যানসারের সূচনা মায়ের গর্ভকালেই হতে পারে। ভ্রূণ অবস্থায় ডিএনএতে কোনো পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটলে স্বাভাবিক কোষ ক্যানসার কোষে রূপ নিতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই কোষগুলো ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে কিশোরী বয়সে রোগ হিসেবে প্রকাশ পায়।
বয়সভিত্তিক ঝুঁকি
ডিসজারমিনোমা যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে ২০ বছরের নিচে মেয়েদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
বিশেষ করে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে এই ক্যানসারের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি লক্ষ করা যায়, যা বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
লক্ষণ ও উপসর্গ
এই রোগের কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যেমন তলপেটে ব্যথা, পেটে শক্ত কোনো গাঁট বা চাকা অনুভব করা, শ্বাসকষ্ট এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে অকাল বয়ঃসন্ধির লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
এছাড়া যাদের টার্নার সিনড্রোম বা ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোমের মতো জন্মগত জেনেটিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে।
রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা করেন এবং এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। টিউমার মার্কার পরীক্ষা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেট-সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে রোগের অবস্থান ও বিস্তার নির্ণয় করা হয়।
চিকিৎসা ও করণীয়
ডিসজারমিনোমার চিকিৎসা যথাসময়ে শুরু করলে এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। প্রথমেই রোগী ও তার অভিভাবকদের সঠিকভাবে কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। এরপর সার্জারি বা অপারেশনের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনের পর কেমোথেরাপি (বিশেষ করে BEP রেজিমেন) দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেডিওথেরাপি প্রয়োগ করা হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না।
ফলোআপের গুরুত্ব
চিকিৎসা শেষ হলেও রোগীকে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্তত পাঁচ বছর নিয়মিত ফলোআপে থাকা এবং পরবর্তী সময়ে সারা জীবন পর্যবেক্ষণে থাকলে যেকোনো জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তাই কিশোরী বয়সে শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
লেখিকা: গাইনি, প্রসূতি এবং স্ত্রীরোগ ক্যানসার ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন, চেম্বার- আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর- ১০, ঢাকা।


