আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো কিডনি। এটি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করে দেয়। কিন্তু যখন কিডনির ফিল্টার বা ছাঁকনিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন শরীর থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকেই বলা হয় ‘নেফ্রোটিক সিনড্রোম’। এটি কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং কিডনি সমস্যার একটি সমষ্টিগত লক্ষণ।
নেফ্রোটিক সিনড্রোম আসলে কী?
আমাদের কিডনিতে 'গ্লোমেরুলি' নামক অতি ক্ষুদ্র রক্তনালীর গুচ্ছ থাকে। এগুলোর কাজ হলো রক্ত পরিশোধন করা। সুস্থ অবস্থায় এই ছাঁকনিগুলো শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনকে (বিশেষ করে অ্যালবুমিন) ধরে রাখে। কিন্তু এই ছাঁকনিগুলো কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রোটিন প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়। ফলে রক্তে প্রোটিনের ঘাটতি দেখা দেয় এবং শরীরে নানা সমস্যা তৈরি হয়।
চেনার উপায় বা প্রধান লক্ষণসমূহ
নেফ্রোটিক সিনড্রোম হলে শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়-
শরীরে পানি আসা বা ফোলা ভাব: বিশেষ করে চোখের চারপাশে, পায়ের পাতায় এবং গোড়ালি ফুলে যাওয়া এর প্রধান লক্ষণ।
ফেনা যুক্ত প্রস্রাব: প্রস্রাবের সাথে অতিরিক্ত প্রোটিন যাওয়ার ফলে প্রস্রাবে অস্বাভাবিক ফেনা হতে পারে।
ওজন বৃদ্ধি: শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার কারণে হুট করে ওজন বেড়ে যেতে পারে।
ক্লান্তি ও অবসাদ: রক্তে প্রোটিন কমে যাওয়ায় শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
ক্ষুধামান্দ্য: খাবারের প্রতি অরুচি দেখা দেওয়া।
কেন হয় এই রোগ?
নেফ্রোটিক সিনড্রোমের পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. ডায়াবেটিস: দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস কিডনির ছাঁকনিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২. মিনিমাল চেঞ্জ ডিজিজ: শিশুদের ক্ষেত্রে এটি নেফ্রোটিক সিনড্রোমের প্রধান কারণ।
৩. লুপাস বা অনাক্রম্যতা রোগ: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন ভুলবশত নিজের সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে (যেমন—সিস্টেমিক লুপাস)।
৪. সংক্রমণ: হেপাটাইটিস বি, সি, এইচআইভি বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগের কারণেও এটি হতে পারে।
৫. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ব্যথানাশক ওষুধ বা ইনফেকশন কমানোর কিছু ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এটি হতে পারে।
জটিলতা ও ঝুঁকি
সময়মতো চিকিৎসা না করালে নেফ্রোটিক সিনড্রোম থেকে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে-
রক্ত জমাট বাঁধা: শরীর থেকে প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়ার ফলে রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
উচ্চ কোলেস্টেরল: রক্তে অ্যালবুমিন কমে গেলে লিভার তা পূরণের চেষ্টা করে, ফলে একই সাথে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যায়।
পুষ্টিহীনতা: প্রোটিনের অভাবে রোগী অপুষ্টি ও রক্তাল্পতায় ভুগতে পারেন।
উচ্চ রক্তচাপ: কিডনি নষ্ট হওয়ার সাথে সাথে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়।
কিডনি বিকল: সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না নিলে কিডনি স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যেতে পারে, যার ফলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়।
প্রতিকার ও সচেতনতা
নেফ্রোটিক সিনড্রোম মানেই আতঙ্ক নয়। নিয়মিত চেকআপ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সুস্থ থাকা সম্ভব। খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, প্রোটিন গ্রহণের বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। শরীরে কোনো অস্বাভাবিক ফোলা ভাব দেখা দিলে দেরি না করে কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখবেন, সচেতনতাই কিডনি রোগের সর্বোত্তম চিকিৎসা।


