জানুয়ারি মাস বিশ্বব্যাপী থাইরয়েড সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। থাইরয়েড একটি ছোট গ্রন্থি হলেও এর কার্যক্রম মানুষের শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, থাইরয়েডজনিত রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেকেই দীর্ঘদিন উপসর্গ নিয়ে ভুগলেও সমস্যার মূল কারণ বুঝতে পারেন না। সময়মতো শনাক্ত না হলে এই রোগ শরীর ও মনে নানাবিধ জটিলতা তৈরি করতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থি: শরীরের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র
থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনের অংশে, কণ্ঠনালির নিচে অবস্থিত একটি প্রজাপতির মতো আকৃতির হরমোনগ্রন্থি। এটি প্রধানত T3 (ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন) ও T4 (থাইরক্সিন) নামক হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাক ক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হৃৎস্পন্দন, হজম ক্রিয়া, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যায়। যার প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
থাইরয়েড রোগের প্রকারভেদ
◉ হাইপোথাইরয়েডিজম
থাইরয়েড গ্রন্থি যখন প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং নারীদের মধ্যে এর হার তুলনামূলক বেশি।
◉ হাইপারথাইরয়েডিজম
এক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ করে। ফলে শরীরের বিপাক ক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং শরীর দ্রুত শক্তি ক্ষয় করতে থাকে।
◉ গয়টার
থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গলায় দৃশ্যমান ফোলাভাব তৈরি করলে তাকে গয়টার বলা হয়। এটি আয়োডিনের ঘাটতি কিংবা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে হতে পারে।
◉ থাইরয়েড নডিউল
থাইরয়েড গ্রন্থির ভেতরে গুটি বা চাকার মতো অংশ তৈরি হওয়াকে থাইরয়েড নডিউল বলা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
◉ থাইরয়েড ক্যানসার
থাইরয়েড গ্রন্থিতে ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
থাইরয়েড সমস্যার সাধারণ লক্ষণ
থাইরয়েড রোগের উপসর্গগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে দেখা দেয় এবং অন্যান্য সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ—
অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অবসন্নতা
ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পারা
ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হওয়া
চুল পড়ে যাওয়া ও চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
কোষ্ঠ কাঠিন্য
মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
বিষণ্নতা
নারীদের মাসিকে অনিয়ম
হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণ—
দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
বুক ধড়ফড় করা
অতিরিক্ত ঘাম
গরম সহ্য না হওয়া
হাত কাঁপা
অস্থিরতা ও উদ্বেগ
ঘুমের সমস্যা
পায়খানার পরিমাণ ও সংখ্যা বেড়ে যাওয়া
শিশু-কিশোর ও নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের ঝুঁকি
থাইরয়েডের রোগ সব বয়সেই হতে পারে, তবে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হলে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েড সমস্যা বন্ধ্যত্ব, গর্ভধারণে জটিলতা এবং গর্ভকালীন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই নারীস্বাস্থ্যের সঙ্গে থাইরয়েড সচেতনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
থাইরয়েড রোগের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়
থাইরয়েড সমস্যার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে, যেমন-
আয়োডিনের ঘাটতি বা অতিরিক্ত গ্রহণ
বংশগত কারণ
অটোইমিউন রোগ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ
দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার
গর্ভাবস্থা ও প্রসবোত্তর সময়
এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে আগেভাগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব।
থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব ও পদ্ধতি
থাইরয়েড রোগ নির্ণয় বর্তমানে সহজ ও নির্ভরযোগ্য। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা জানা যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে থাইরয়েড পরীক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগেই রোগ শনাক্ত করা যায়।
জটিলতা
চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে থাইরয়েড রোগ থেকে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে-
হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমে সমস্যা
উচ্চ রক্তচাপ
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
হাড় ক্ষয় ও দুর্বলতা
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
কর্মক্ষমতা ও জীবনমান হ্রাস
এসব জটিলতা অনেক সময় ধীরে ধীরে তৈরি হয়, যা পরে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।



