ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ হাদি হত্যা মামলার বাদীকে নিয়ে বোনের প্রশ্ন? জয়পুরহাট সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির টহল জোরদার রাজনীতি এক ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২৯,৬৯৪ হাজি নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম চট্টগ্রামে কাফনের কাপড় পরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল হরোস্কোপের গোলকধাঁধায় ভবিষ্যৎ ভাবনা বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা সরকারের নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে পাবনায় ২০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
Nagad desktop

গাজনার বিলে একদিন

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪২ পিএম
আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪৩ পিএম
গাজনার বিলে একদিন

পদ্মাপারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাচীন জনপদ উত্তরের জেলা পাবনা। এখানে আছে রূপসি পদ্মার ঢেউয়ের কলধ্বনি, সবুজের বেষ্টনী ও বিলের উত্তাল হাওয়া। স্মৃতি হয়ে আছে হিন্দু-মুসলিম ও ব্রিটিশদের নানা স্থাপনা। সৌন্দর্য বাড়িয়েছে সবুজ প্রকৃতি। নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে রুশদের নতুন শহর। ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নতুনের সুন্দর সংমিশ্রণ এই জেলায়।কেউ নতুন শহর দেখতে, কেউবা বিলের সৌন্দর্যের খোঁজে এখানে বেড়াতে আসেন। অফিসের কাজে এসেছি পাবনা শহরে, কাজের ফাঁকে কথা হচ্ছিল অফিসের সহকর্মীর সঙ্গে। হোটেল থেকে অফিস আর অফিস থেকে বাসা এভাবেই চলছিল গত দুদিন।

আগামীকাল ফিরে যাব যান্ত্রিক নগরে। ইমরানকে বলছিলাম দুদিন পেরিয়ে আজ তৃতীয় দিন কোথাও ঘুরতে নিয়ে গেলে না। বলতেই ইমরান বলল স্যার চলেন কাছেই গাজনা বিল আছে।আমি বললাম কত সময় লাগবে পৌঁছাতে? প্রত্যুত্তরে ইমরান বলল ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগবে মোটরসাইকেলে যেতে। আমি আর ইমরান দুই চাকার বাহনে করে এগিয়ে চলছি। সময় দিবা দ্বিতীয় প্রহর, সূর্যদেবের মন ভালো নেই তাই কালো করে আছে মুখ। ইমরানকে বলছিলাম ভ্রমণে বের হলাম কিন্তু ছাতা তো সঙ্গে নেই।

ও বলল সমস্যা নেই বৃষ্টি আসবে না কয়েক দিন ধরে আকাশ মেঘলা করে থাকে খুব একটা বৃষ্টি হয় না। সুজানগর উপজেলার আত্রাই ও পদ্মা নদীর সংযোগে সৃষ্ট এ বিল গাজনা বা বিলগন্ডহস্তী নামেও পরিচিত। বর্তমানে গাজনার বিলের পানির প্রধান উৎস এ অঞ্চলের বৃষ্টি ও যমুনা নদী পানি হলেও যুগ যুগ ধরে পদ্মা নদীর পানি গাজনার বিলে প্রবেশ করত। জনশ্রুতি আছে বর্ষা মৌসুমে প্রমত্ত পদ্মার যে গর্জন হতো এবং ওই গর্জনের ফলে উত্থিত পানি দুকূল ছাপিয়ে নিম্নাঞ্চল গাজনায় এসে আটকে থাকত।

যার কারণে প্রমত্ত পদ্মার গর্জন থেকেই গাজনা বা গাজনার বিলের নাম হয়েছে। গাজনার বিল মূলত খয়রান ব্রিজ থেকে পূর্ব দিকে তিন থেকে চার কিলোমিটার কাটাজোলা বিল পর্যন্ত গাজনার বিল নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে পোড়াডাঙ্গা থেকে বাদাই জোলা পর্যন্ত গাজনা বিল নামে পরিচিত। মুজিব বাঁধ হওয়ার পর বাদাই নদী স্লুইসগেট দিয়ে যমুনার পানি গাজনার বিলে প্রবেশ করে। আগের থেকেই পদ্মা নদী থেকে কয়েকটি প্রাকৃতিক ক্যানালের মাধ্যমে গাজনার বিলে পানি প্রবেশ করত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্যানালগুলো হলো চরসুজানগর হয়ে সুজানগর পৌরসভার কোল ঘেঁষে বান্নাই কোল হয়ে নেকের বনগ্রাম পোড়াডাঙ্গা হয়ে গাজনার বিল।

নিশ্চিন্তপুর থেকে কাচুরির কোল হয়ে শাহপুর ও মঠবাড়িয়া পাশ দিয়ে মতির বিল (গাজনা বিল)। শ্যামনগর ভাটপাড়ার মধ্য দিয়ে মানিকহাটের পশ্চিম পাশ দিয়ে উলাট খয়রানের মধ্য দিয়ে গাজনার বিল। মালিফা হয়ে ভিটবিলার পূর্ব পাশ দিয়ে বোনকোলা হাটখালীর মধ্য দিয়ে গাজনার বিল। বরকাপুর নারায়ণপুর সাগতা হয়ে গাজনার বিল। এসব ক্যানাল দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি গাজনার বিলে প্রবেশ করত এবং বিলের পানি জলাবদ্ধতা আকারে প্রায় সারা বছরই পানি থাকত। সে সময় বিলের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় রুই, কাতলা, বাগাড়, ফলি, গজার, বোয়াল, পাঙাশ ইত্যাদিসহ অসংখ্য ছোট ছোট মাছ পাওয়া যেত বলছিল ইমরান।

সময়ের সঙ্গে আমরা এসে উপস্থিত হলাম বোয়ালিয়া বটতলায়। এবার আমরা চেপে বসলাম নৌকায়। আমাদের তরী এগিয়ে চলছে।  দূরদিগন্তে বৃক্ষ সারির মাথায় স্নেহ পরশ বুলিয়ে ফেরারি হয়েছে স্বপ্নের আকাশ। নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো পেঁজা তুলার মতো মেঘের দরজায় এক অদ্ভুত মায়াময় প্রতিচ্ছবি একে দিয়েছে বিলের ক্যানভাসজুড়ে। সজল মেঘের ছায়ায় ভিজে জাল পেতে রেখেছেন স্থানীয় জেলেরা। ১৬টি ছোট-বড় বিলের সমন্বয়ে সৃষ্ট এই গাজনার বিল। তন্মধ্যে মতির বিল, হাতিগারার বিল, সহিবাজের বিল, ডহার বিল, রামার বিল, গমগারার বিল, পশ্চিম চক বিল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 

বিলটি সুজানগর উপজেলার একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। সুজানগর উপজেলার সবগুলো ইউনিয়নে এর বিস্তৃতি। আমাদের তরী বেয়ে চলছেন মাঝি। নদীর নাভিমূলে ততধিক নীলরঙের জালের বিরাট এক কলস যেন ডুবিয়ে রাখা হয়েছে বিলের পানি। হাতে হাতে টেনে ছোট করে আনা হচ্ছে কলসের মুখ। সেই সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে মাছেদের পৃথিবী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে জেলেদের মুখে। টেনে তোলা জালে ছোট পানির খলখলানিতে প্রকাশিত হতে থাকে পানির নিচের জীবন্ত সম্পদ রাশির প্রতিচ্ছবি। আমাদের মাঝি বলছিলেন বিলটি সুজানগর উপজেলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশ এর ওপর নির্ভরশীল। সুজানগর উপজেলার কমবেশি ১০টি ইউনিয়নের সঙ্গেই গাজনার বিল সংযুক্ত রয়েছে।

বিলের চারিধারে আবাদি জমি ও সব বসতি অবস্থিত। এই গাজনার বিলের মাধ্যমেই এই এলাকার কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়। বিলের চারপাশে আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার হেক্টর। এসব জমিতে পাট, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন হয়। বর্তমানে এই বিলের জমি বাংলাদেশের মধ্যে পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। দেশের চাহিদার ৩০-৪০ ভাগ পেঁয়াজ এই বিলের জমিতে উৎপাদন হয়। এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণে পাট ও ধান উৎপাদিত হয়। আশির দশকের শেষ দিক থেকে গাজনা বিলে ইরিগ্রেশন প্রজেক্টের আওতায় ইরি বোরো ধান লাগানো শুরু হয়। এসব কৃষি আবাদের ফলে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের জীবনযাপনে সচ্ছলতা আনয়ন করে।

এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে পাবনা ও সুজানগর উপজেলার বৃষ্টি পানি ও বাদাই স্লুইসগেটের মাধ্যমে যমুনা নদী থেকে এই বিলে পানি আসে। সে কারণে সারা বছর এই বিলে জলের প্রাচুর্য থাকে। দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত গাজনার বিলে ছোট-বড় প্রায় শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছ এ অঞ্চলের মানুষের চাহিদা মিটিয়েও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মৎস্য আড়তে পাঠানো হয়। প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিতে বিলের পানিতে একদল পথিক উচ্চৈঃস্বরে গান গাচ্ছিল।

ভরদুপুরে পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো কোনো মাঝি করছেন রান্নার আয়োজন। আমাদের মাঝি চলছেন এগিয়ে সূর্যরশ্মির আভা গায়ে মেখে চকচক করছিল মাছগুলো।  আমি নৌকা থেকে কিনে নিলাম কিছু মাছ। মাছগুলো তাজা রাখার জন্য জেলেরা মাছের প্যাকেটে বরফ দিচ্ছিলেন। এখানে মাছ ধরার পালা শেষ প্রতিদিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় এই বিলে। সূর্যদেবের পাটে যাওয়ার সময় চলে এসেছে আর ঘড়ির কাঁটা আমাদের তারা দিচ্ছিল আপন নীড়ে ফিরে যাওয়ার জন্য। জলাভূমি বেষ্টিত এই অনিন্দ্য সুন্দর আবাসভূমি ছেড়ে ফিরে যেতে মন চাচ্ছিল না কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন আমাদের বারবার ফিরে যেতে হয় নাগরিক কোলাহলে জীবনের মানে খুঁজে নেওয়ার নিমিত্তে। 

যেভাবে যাবেন
ঢাকার গাবতলী থেকে পাবনার উদ্দেশে পাবনা এক্সপ্রেস, সি-লাইন, সরকার ট্রাভেলস, শ্যামলীসহ বিভিন্ন বাস চলাচল করে। বাসের মান অনুযায়ী জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। পাবনাগামী বাসে বিরাহিমপুর বা চব্বিশ মাইল নামক স্থানে নেমে স্থানীয় যানবাহন (ভ্যান বা অটোরিকশা) নিয়ে দুর্গাপুর বা বোয়ালিয়া বটতলা যেতে পারেন। বটতলা থেকে ঘণ্টাপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা ভাড়ায় কিংবা সারা দিনের জন্য ১৫০০-২০০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে গাজনার বিল ঘুরে দেখতে পারবেন। তা ছাড়া পাবনা জেলা শহর থেকে সুজানগর উপজেলায় পৌঁছে সিএনজি নিয়ে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে খয়রান ব্রিজ সংলগ্ন গাজনার বিল পর্যন্ত সহজেই যেতে পারবেন। 

/রোদসী  

পদ্মার জলের হাতছানি...

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
আপডেট: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
পদ্মার জলের হাতছানি...

রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে একদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। সেখানে গেলে পদ্মার সৌন্দর্য যেমন আপনাকে মোহিত করবে, তেমনি খেতে পাবেন পদ্মার তাজা ইলিশ। আমরা সাধারণত পরিচিত জায়গা ছাড়া ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। নিরাপত্তার কারণেও আমরা অনেক জায়গায় যেতে চাই না। 

যান্ত্রিক নগরী ঢাকার আশপাশে ঘোরার জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেকে ছুটির দিনগুলো ঘুমিয়েই কাটান। অনেকের আবার ঘুরতে যাওয়ার আগে কত কিছু চিন্তা করতে হয়! সময়, পর্যাপ্ত অর্থ এবং ভালো ভ্রমণ সঙ্গী নিয়ে একটা চিন্তা থেকেই যায়।

হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় নেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার, অথচ নিজেকে প্রাণবন্ত করার জন্য একটু নান্দনিক এবং মনোরম পরিবেশের প্রয়োজন। তাই হন্যে হয়ে খুঁজছেন ঢাকার আশপাশেই কোনো মনোরম পরিবেশ।

এমন সবকিছুর সমাধান দিতে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। আমি খুব ঘুমপ্রিয় মানুষ, তাই শুক্রবার এলেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। কয়েক দিন ধরে চিন্টু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছিল ওকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

গত শুক্রবারও ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ার জন্য কোথাও যেতে পারিনি আর সেই ধারাবাহিকতায় আজও দেরি করে উঠেছি ঘুম থেকে। এদিকে চিন্টুর মন খুব খারাপ, আজও যেতে পারল না কোথাও। 

আমি মনে মনে ভাবলাম ছোট মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে, তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া উচিত। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকের কল্যাণে মৈনট ঘাটের নাম শুনছিলাম। তাই ভাবলাম দূরত্ব কম যেহেতু তাই বিকেল বেলাতেই চিন্টুকে নিয়ে বের হব। এখন আর কিছু না বলে চিন্টুকে সারপ্রাইজে দেব। 

কাল বেলা ব্যাংকের কিছু কাজ ছিল তা শেষ করলাম দুপুর হতেই চিন্টুকে বললাম বিকেল ৩টার মধ্যে রেডি থাকিস। ঠিক বিকেল ৩টায় আমরা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে মৈনট ঘাটের উদ্দেশে বাসে রওনা হলাম।

শুক্রবার তাই যান্ত্রিক শহরের কোলাহল কিছুটা হলেও কম আমাদের ফিটনেসবিহীন বাস এগিয়ে চলছে গন্তব্যস্থলে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম মৈনট ঘাটে। চিন্টু তো মৈনট ঘাটে এসে খুব খুশি দোহারের কার্তিকপুরের যে জায়গাটি পদ্মাপাড়ে গিয়ে মিশেছে তার নাম মৈনট ঘাট। এখানে ডানে-বাঁয়ে বালু চিকচিক করা স্থলভূমি থাকলেও সামনে শুধু রুপার মতো চকচকে পানি।

মৈনট পদ্মাপাড়ের একটি খেয়াঘাট। এখান থেকে প্রতিদিন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। খেয়া পারাপারের জন্য জায়গাটির পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। তবে এখন সেটা জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হিসেবেও।

এত দিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনট ঘাট। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মৈনট ঘাটের নতুন নাম হলো–মিনি কক্সবাজার! বিস্তীর্ণ জলরাশির ঢেউ আর সঙ্গে শরতের নির্মল আকাশ–এ এক অনবদ্য কাব্য। ছুটির দিন তাই অনেক মানুষের পদচারণে মুখর মৈনট ঘাট। জন মানবের পদচারণা দেখে মনে হলো নগরবাসীর কাছে নতুন এক নির্মল বিনোদনের স্থান। 

মিনি কক্সবাজারের তীরে আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি। খানিক পরপর মাছ ধরার ট্রলার ছুটে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা দেখে মাছ কেনার জন্য এগোচ্ছেন। দরদাম ঠিক থাকলে অনেক ভ্রমণপিপাসু মাছ কিনে নিচ্ছেন। পুরো নদীর তীর ও তার আশপাশের এলাকা সমুদ্রসৈকতের মতো করে সাজানো। হঠাৎ চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে দেখে খুব খারাপ লাগল, আমরাই আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছি। 

পদ্মা এত বিশাল যে, ওপারের কিছুই দেখা যায় না, দেখা যায় না ডান-বাঁয়ের কোনো বসতি। নদীর পারে ট্রলার ও স্পিডবোটের মহাজনদের মেলা। আপনি চাইলে ট্রলারে চেপে ওপারের চরভদ্রাসন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঘণ্টা চুক্তিতে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন। 

যা-ই করেন এখানে সময়টা কিন্তু বেশ কাটবে। আমরা ট্রলারে চেপে বসলাম ঘুরে বেড়ালাম প্রমত্ত পদ্মায়। আমাদের ট্রলারের মাঝি রহিম মিয়া বললেন এখানে সকালবেলাটা খুব ভালো কাটে, দুপুর কিছুটা মন্থর, তবে বিকেলবেলা অনেক বেশি জমজমাট। 

সোনা রোদের গোধূলিবেলার তো কোনো তুলনাই চলে না। নদীতে পাল তোলা নৌকার ঘুরে বেড়ানো আবার কখন উথাল-পাতাল ঢেউ–এ এক অন্য রকম অনুভূতি। দেখতে দেখতে সূর্য দেবের বিদায়বেলা চলে এল, সূর্য দেবের বিদায়বেলায় প্রকৃতি অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। নদীতে ভ্রমণ শেষে চিন্টু ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার বায়না ধরল। তাই তাকে নিয়ে ঘাটে অবস্থিত একটি হোটেলে গেলাম। সেখানে ইলিশ মাছ ভাজা খেলাম—কী অসাধারণ স্বাদ। এখানে ইলিশ ১৩০ থেকে ১৯০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে আপনাকে। 

কীভাবে আসবেন
ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাস। 
৯০ টাকা ভাড়া আর দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে।
 
সচেতনতা 
মৈনট ঘাটে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যদি আশপাশে ময়লা দেখতে পান তাহলে নিশ্চয় আপনার ভালো লাগবে না। তাই পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেখানে-সেখানে পানির বোতল, চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটসহ কোনো ময়লা ফেলা যাবে না। আপনি নিজে যেমন ফেলবেন না, তেমনি কাউকে ফেলতে দেখলে তাকে নিরুৎসাহিত করাটাও আপনার দায়িত্ব। আরেকটি কথা সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পদ্মার বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো।

/এমটি

ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

বেরিয়ে পড়েছি কেন্টের উদ্দেশে। কেন্ট হাসপাতালের প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. শাহাদত হোসেন ও ভাবির আমন্ত্রণে আমরা ছয়জন ছুটছি লন্ডন ছেড়ে কেন্টের উদ্দেশে। সম্পর্কে চিকিৎসক সাহেব আমার ভাসুর। গাড়ি চালাচ্ছে আমার সহোদর ব্যারিস্টার মুয়ীদ খান, আইন পেশায় সেন্ট্রাল লন্ডনে তার দীর্ঘ প্রবাসজীবনে দুবার নিজের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছেন লন্ডন ও ওয়েলসের ২০ হাজার আইনজীবীর মধ্যে নির্বাচিত ‘বেস্ট হিউম্যান রাইটস ল’ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। আগেই পরিকল্পনা করা হয়, আমরা গ্রিনিচ শহর দেখতে দেখতে কেন্ট শহরে ঢুকব। 

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহরের নাম গ্রিনিচ। এটি লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস জাংকশন থেকে ৫ দশমিক ৫ মাইল পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। কয়েক শ’ বছর ধরে এটি কেন্ট প্রদেশের একটি শহর ছিল এবং প্রদেশটি ভেঙে গেলে পরবর্তী সময়ে গ্রেটার লন্ডনের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল হয়। গ্রিনিচের সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত ইতিহাস, অসংখ্য ‘টিউডর’ রাজবংশের জন্মস্থান এবং গ্রিনিচ মানমন্দিরের জন্য এ শহরটি বিখ্যাত। ১৮ শতকে এটি ভ্রমণকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হওয়ায় এখানে অনেকগুলো ম্যানসনের মতো বড় বড় বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রিনিচের সঙ্গে সম্পর্কিত সমুদ্র সংযোগগুলো বিংশ শতাব্দীতে উদযাপিত হয়। এই স্থানের ওপর দিয়ে মূল মধ্য রেখা অতিক্রম করেছে। এখানে পৃথিবীর স্ট্যান্ডার্ড সময় গণনা করার মান মন্দির অবস্থিত।

আমরা নামলাম হক্সমুরের নকশায় সেন্ট আলফেজ চার্চটি দেখতে। ঐতিহাসিক স্থাপনা এটি। গ্রিনিচের টাউন সেন্টারের পশ্চিমে যা ১৭১৪ সালে নির্মাণ করা শুরু হয়ে ১৭১৮ সালে সম্পন্ন হয়। একটি নারকীয় ও জঘন্যতম হত্যার শিকার হন সেন্ট আলফেজ। জানা যায়, অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিখ্যাত একটি জাতির নাম ভাইকিং যারা দক্ষিণ স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আগত এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, ভিনল্যান্ড পর্যন্ত এরা জলদস্যুতা, লুটতরাজ ও কিছু কিছু সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চালনা করত।

সামরিক শাসনামলে কেন্ট প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এই ভাইকিং বাহিনীর বিশাল শিবির স্থাপিত হয় এবং এ বাহিনী এক সময় কেন্ট আক্রমণ করে। ১০১২ সালে তারা কান্টারবেরি শহর দখল করে এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতের কান্টারবেরির একজন বিখ্যাত বিশপ আলফেজকে বন্দি করে নিয়ে যায় যাকে গ্রিনিচের সেনাশিবিরে প্রায় সাত মাস ধরে বন্দি করে রাখা হয় (সে সময় গ্রিনিচ কেন্ট প্রদেশের অংশ ছিল)। আলফেজের কাছ থেকে তারা মুক্তিপণ হিসেবে বিরাট অঙ্কের পাউন্ড দাবি করে কিন্তু আলফেজ তা দিতে রাজি হননি।

ফলে ইস্টার সানডের যে আট দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় তাদের মধ্যে একটি শনিবারে মৃত্যুদণ্ড হিসেবে আলফেজের গায়ে তারা পশুর হাড় ও মাথা নিক্ষেপ করতে শুরু করে, একপর্যায়ে কুঁড়ালে গাঁথা এরকম একটি হাড় তার মাথার খুলি ফুটো করে ঢুকে যায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করার পরও শেষ হাড়টি তার রক্তে না ভেজা পর্যন্ত তারা তাকে আঘাত করে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর আলফেজকে সেন্ট উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং ১২ শতকে প্যারিশ চার্চ তার নামে উৎসর্গ করা হয়।

গ্রিনিচ ও এর আশপাশের নদীগুলো বেশ গভীর। গ্রিনিচের দক্ষিণ দিকের অঞ্চলটি গ্রিনিচ পার্ক থেকে ব্ল্যাকহেথ পর্যন্ত খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ১০০ ফিট। দেখতে পাচ্ছি এখানকার উচ্চতর এলাকাগুলো এক ধরনের পাথুরে পাললিক মাটির স্তর দিয়ে গঠিত। এই মাটিকে ব্ল্যাকহেথ বেড বলা হয়। আসলে টেমস নদীর অববাহিকার দক্ষিণদিকের একটি প্রশস্ত প্ল্যাটফর্মের ওপর গ্রিনিচ অবস্থিত। গ্রিনিচ মূলত শীতপ্রধান এলাকা।

গ্রিনিচ মানমন্দির (Royal Observatory, Greenwich) ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনিচ পার্কের চূড়ায় অবস্থিত। এটি একটি ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটির দ্রাঘিমাগত মান ০° অর্থাৎ এর ওপর মূলমধ্যরেখা গেছে। দিক নির্ণয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্থান। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। গ্রিনিচের মান মন্দির (রয়্যাল অবজারভেটরি), ন্যাশনাল মেরিটাইম জাদুঘর, রানির বাড়ি ও ক্যাটি সার্ক একত্রে রয়্যাল মিউজিয়াম গ্রিনিচ নামে পরিচিত। 

প্রাইম মেরিডিয়ান ও জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ পৃথিবীর সময় অঞ্চল এবং মানচিত্র তৈরিতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। এটির সময়কে প্রমাণ ধরে অন্যান্য জায়গার সময় নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়। এটির সাহায্যে অন্যান্য স্থানের দ্রাঘিমাগত মান নির্ণয় করা যায়। ১৬৭৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রিনিচ মানমন্দিরটি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সময় গণনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকেই পৃথিবীর সময় অঞ্চলগুলোর জন্য আদর্শ সময় বা গ্রিনিচ মান সময় (Greenwich Mean Time - GMT) নির্ধারণ করা হয়।

এই মানমন্দিরের মধ্যে প্রাইম মেরিডিয়ান অবস্থিত, যা পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করেছে। জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ হিসেবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই স্থানটি বর্তমানে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। গ্রিনিচ মান ০° অবস্থিত ধরে বাংলাদেশের অবস্থান ৯০° পূর্বে অর্থাৎ বাংলাদেশের সময় ৯০×৪ = ৩৬০ মিনিট বা ৬ ঘণ্টা আগে। তাই বলা যায় গ্রিনিচ সময়ের সঙ্গে ছয় ঘণ্টা যোগ করলে বাংলাদেশের সময় হয়।

প্রাইম মেরিডিয়ান পৃথিবীর দ্রাঘিমাংশের (longitude) জন্য জিরো ডিগ্রি রেখা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবীর ভূভাগকে পূর্ব গোলার্ধ ও পশ্চিম গোলার্ধ এই দুই ভাগে ভাগ করে। গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে ১৮৮৪ সালে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। মজার বিষয় হলো, মেরিডিয়ান রেখা একটি সরলরেখা হলেও প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে পাঠানোর সময় কিছুটা ঝিকঝাক রয়েছে। এর মূল কারণ, সময় অঞ্চলের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার (International Date Line) সংযোগ নিশ্চিত করা।

প্রাইম মেরিডিয়ানের বিপরীত দিকে ১৮০° দ্রাঘিমাংশে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অবস্থিত। এটি দিন এবং সময়ের হিসাব নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারিখ রেখা অতিক্রম করলে সময় এক দিন যোগ বা বিয়োগ হয়। পৃথিবী ঘুরতে ২৪ ঘণ্টা সময় নেয় এবং এই ২৪ ঘণ্টা ৩৬০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ডিগ্রি অতিক্রম করতে সময় লাগে চার মিনিট। তাই, পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানে সূর্য ওঠা এবং অস্ত যাওয়ার সময় আলাদা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরে প্রবেশ করতেই দেখতে পাই একটি সুন্দর বাগান। বাগানের কেন্দ্রে দুটো ডলফিনের মূর্তি রয়েছে, যা একটি সূর্য ঘড়ি। এই সূর্য ঘড়ির সাহায্যে প্রাকৃতিক সূর্যালোকের ভিত্তিতে সময় নির্ণয় করা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর টেলিস্কোপ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম। এখানে দুটি প্রাথমিক টেলিস্কোপ রয়েছে, যা ১৭ ও ১৮ শতকে ব্যবহৃত হতো। এই টেলিস্কোপগুলো বসিয়েছিলেন প্রথম জ্যোতির্বিদ জন ফ্ল্যামস্টিড। গ্রিনিচ মানমন্দিরে একটি ক্যামেরা অবস্কিওরা রয়েছে, যা প্রথম দিকের জ্যোতির্বিদ্যার এক অনন্য উদ্ভাবন। এটি সূর্যের প্রতিবিম্ব এবং কুইন্স হাউসের পিলারগুলোর প্রতিফলন পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

প্রাইম মেরিডিয়ানে দাঁড়ানো একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। মাটিতে তামার পাতের মাধ্যমে চিহ্নিত জিরো ডিগ্রি রেখা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। কেউ যদি ডান পা তামার পাতের পূর্ব দিকে এবং বাম পা তামার পাতের পশ্চিম দিকে রাখেন, তাহলে একসঙ্গে দুই গোলার্ধে দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা লাভ করবেন। আমার দুই ছেলে খুব মজা পেল এই অভিজ্ঞতা নিতে গিয়ে। পা পাল্টে পাল্টে তারা মজা নেয় এবং ছবি তুলে স্মৃতিবন্দি করে আনন্দমুহূর্তগুলো। 

এই স্থান ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম উইলিয়ামের সময়কাল থেকে। গ্রিনিচ প্রাসাদ, যেটি বর্তমানে মেরিটাইম জাদুঘর; রাজা অষ্টম হেনরি ও তার কন্যা প্রথম মেরির জন্মস্থান। প্রথম এলিজাবেথ ও ট্যুডররা গ্রিনিচ প্রাসাদ তাদের হান্টিং লজ হিসেবে ব্যবহার  করতেন। গ্রিনিচের এই প্রাসাদ দুর্গটি রাজা অষ্টম হেনরির বিশেষ প্রিয় ছিল। তার উপপত্নীদের আবাসস্থল ছিল এটি। মূল প্রাসাদ থেকে এখানে তিনি সহজেই যাতায়াত করতে পারতেন বলে এটি তার বিশেষ প্রিয় জায়গা ছিল।

১৮৮৪ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে ২৫টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা স্থলে স্থির হয়ে যে লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের ওপর দিয়ে যে দ্রাঘিমা রেখা গেছে সেটাই হবে মূল দ্রাঘিমারেখা মূল মধ্যরেখা। তৎকালীন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বৈশ্বিক প্রভাব ছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ নাবিক এবং মানচিত্র গ্রিনিচকে সময়ের জন্য ব্যবহার করছিল।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নত কেন্দ্র হিসেবে গ্রিনিচের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রিনিচ পরিদর্শনের একটি আকর্ষণীয় উপায় হলো লন্ডনের ক্যাবল কারে চড়া। এটি টেমস নদীর ওপর দিয়ে চলে এবং দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নদী পারাপারের সময় লন্ডনের নানা মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের উপরিভাগ থেকে লন্ডনের স্কাইলাইন অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এখান থেকে ক্যানারি ওয়ার্ফ, লন্ডন আই এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। ভবনটিকে সহসাই ‘ফ্ল্যামস্টিড হাউস’ নামেই ডাকা হতো। বর্তমান সময়ে সায়েন্টিফিক কাজকর্মগুলো অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তাই গ্রিনিচের এই ভবনটি এখন মূলত জাদুঘর হিসেবেই বিবেচ্য হচ্ছে। স্থানটি ভ্রমণপিপাসীদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান বটে। হাজার হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে ও দেখতে আসেন। মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক বিবেচনায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। পর্যটকদের জন্য গ্রিনিচ একটি অনন্য গন্তব্য, যেখানে ঐতিহ্য, বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন ঘটে।

/এস লুপিন

বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম
আপডেট: ০৯ মে ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ
ছবি: সংগৃহীত

সেশেলেস (Seychelles) বিশ্ব ভ্রমণে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আমার ১৫৯তম দেশ। সেশেলস–১১৫টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দেশ। প্রথমে আমি এই দেশের নাম শুনে ভেবেছিলাম, এটা বুঝি কোনো বড় ফ্রেঞ্চ কলোনি। কিন্তু পরে জানতে পারি, এটি ১৯৭৬ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও তার আগে বহু বছর ফরাসিদের শাসনে ছিল। তাই এখানকার প্রধানত ভাষা ফরাসি, পাশাপাশি ইংরেজি ও ক্রেওলও প্রচলিত।

বাংলাদেশ থেকে যখন বের হয়েছিলাম তখনই ইচ্ছা ছিল আলজেরিয়ায় যাব, কিন্তু হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে থাকার সময় ইরান যুদ্ধ বেধে গেল, সেজন্য ইমিরেটস কিংবা কাতার এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করা দুষ্কর হয়ে গেল। 

তখনই মাথায় এল সেশেলেস দেশটি, যা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। যখনই চিন্তা সঙ্গে সঙ্গেই টিকিট কাটব, তারপর হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের বাংলাদেশ থেকে এর আগে কে ভ্রমণ করেছে? ফেসবুক ঘেঁটে দেখলাম, Flyer ট্রাভেল এক্সপ্রেসের সুমন বাহাদুর ভাই বেড়াতে গিয়েছিলেন। তার কাছ ফোন করলেই টিকিট কাটার আগেই তিনি বললেন, ১০ ইউরোতে একটি অন অ্যারাইভাল পারমিট নিতে হয়। 

তারপর আমি অনলাইনে টিকিট কেটে ব্যাংকক থেকে ইন্ডিগোয় চেপে বসলাম এই নতুন দেশের উদ্দেশে। ফ্লাইটে ভাড়া অবশ্য খুব বেশি নয়, আফ্রিকার কোনো দেশে যাওয়ার জন্য। 

তারপর ২৪ মার্চ চলে এলাম এই দেশে। এয়ারপোর্টে নেমেই অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করল। সিকিউরিটির লোকরা হোটেলগুলো একটু যাচাই-বাছাই করে নিল। তারপর সহজেই চলে গেলাম মাহি এয়ারপোর্ট দিয়ে। হোটেল থেকে আগে থেকেই ট্রান্সপোর্ট বলা ছিল ৭৫ ইউরো, যা আমার জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। নীল সমুদ্রের সুন্দর রিসোর্টে চলে গেলাম। থাকা হলো প্রায় ১১ দিন।

এই দেশটি আফ্রিকার অনেক দেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নয়–এটি আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি। এখানকার ট্যুরিজম মন্ত্রণালয় ও লেবার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।

দেশটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য–নীল সমুদ্র, বিশাল পাথরের গঠন, সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সাদা বালুর সৈকত আর সারি সারি পাম গাছ চোখধাঁধিয়ে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কচ্ছপগুলোরও দেখা মেলে এখানে, যা সত্যিই অসাধারণ।

সেশেলসের রাজধানী ভিক্টোরিয়া–বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাজধানীগুলোর একটি। মাহে (Mahé) দ্বীপে এয়ারপোর্টটি অবস্থিত, যদিও এটি আকারে ছোট। আমি যতগুলো আফ্রিকার দেশ ভ্রমণ করেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ধনী বলে মনে হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য যাচাই করেও দেখা যায়, এটি আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে উন্নত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার স্থানীয় এবং বাকিরা প্রবাসী কর্মী।

এখানকার গড় বেতন প্রায় ৬২০ ইউরো, যা ইউরোপের কিছু দেশের সমতুল্য। মজার বিষয় হলো, এখানে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, একটি পুরুষ ও তিনটি নারী এবং তারা আধুনিক, আত্মনির্ভরশীল ও শিক্ষিত। তারা খুবই উদার, আনন্দপ্রিয় ও সহজ-সরল। অনেক সময় মনে হয় না যে আমি আফ্রিকায় আছি—বরং ইউরোপের কোনো দ্বীপে আছি।

এখানকার প্রায় সব পণ্যই আমদানি করা হয়, তাই জীবনযাত্রার খরচ একটু বেশি। যেমন–একটি টমেটোর দামই প্রায় ১৪০ টাকা! শ্রমিকের সংকট থাকায় সবকিছুর দামই তুলনামূলক বেশি। তবু দেশের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা খুব ভালো।

বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে এখানে শ্রমবাজারে ভালো সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর হানিমুনের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি গন্তব্য। অনেকেই মালদ্বীপ ঘুরে ফেলেছেন–তাদের জন্য সেশেলস হতে পারে চমৎকার বিকল্প।

এখানে বেশির ভাগ হোটেলে সেলফ-ক্যাটারিং সুবিধা আছে, অর্থাৎ আপনি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে নিজেই রান্না করতে পারেন। অনেক হোটেলেই হালাল খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা লাগে না–শুধু হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং অনলাইনে আগমনী কার্ড পূরণ করলেই হয়।

তবে বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য এটি সাশ্রয়ী নয়। সেলফ-ক্যাটারিং হোটেলের খরচ প্রতিদিন ১২০ থেকে ২০০ ইউরো (দুজনের জন্য)। আর বিলাসবহুল হোটেলগুলোর দাম ৪৫০ ইউরো থেকে শুরু করে ৪০০০ ইউরোরও বেশি হতে পারে। খাবারে প্রায় ২৫ ইউরো (প্রতি ব্যক্তি) খরচ হয়।

আমি এখানে কয়েকটি দ্বীপে ঘুরেছি–প্রাসলিন আইল্যান্ড ছিল দারুণ সুন্দর। Les Ducs Resort এবং Paradise Sun হোটেলগুলো বেশ ভালো লেগেছে, তুলনামূলক কম খরচে ভালো সেবা দেয়। প্রথমে আমি থেকেছিলাম টাকামাকা বিচে, মাহে দ্বীপে–সেটিও অসাধারণ। বোভালন সৈকত খুবই আকর্ষণীয়, যেখানে বিচ শ্যাক ও বোট হাউস রেস্টুরেন্টে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং সন্ধ্যাটা খুব সুন্দরভাবে কাটানো যায়। এখানে জাতীয় ফল কিংবা জাতীয় প্রতীক কোকো।

যে গাছটি চমৎকার, ছেলে ও মেয়ে দুটি গাছের সমন্বয় এখানে ফল ধারণ করে। মেয়ে গাছটির ফলের গঠন মেয়েদের শরীরের নিম্নাংশের মতো, যা একটি নারী গোপন অংশের মতো দেখতে আর ছেলে গাছটির লিঙ্গটি দেখতে ঠিক পুরুষের লিঙ্গের মতো। এই গাছটির ফল ধরে সবুজ রঙের একটি লেজার আছে, তার মাধ্যমে সে ছেলে গাছটির কাছ থেকে এক ধরনের সাদা পাউডার খেয়ে মেয়ে গাছটির কাছে গিয়ে তার গোপন অংশের চেটে পাউডার ছড়ায়, তারপর সেখানে ফল ধরে। এই গাছটি পৃথিবীতে অনন্য হওয়ায় একে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

এখানে বেশ কিছু ক্যাসিনো রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং পরিবেশও উপভোগ্য–খেলার জন্য নয়, বরং সময় কাটানোর জন্য। তবে অবাক হয়েছি ক্যাসিনোগুলোয় বাংলাদেশি শ্রমিকে ভর্তি, বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার রাতে। তাছাড়া মাছ ধরার বড় বড় ট্যুর রয়েছে, যারা সমুদ্রে বড় মাছ ধরতে চান তাদের জন্য এটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে পারে। সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল ফ্রুট ব্যাট খাওয়া–৪৫ ইউরো দিয়ে খেয়েছিলাম। মাংসের স্বাদটা একটু মিষ্টি, আর রান্নাটাও ছিল চমৎকার। যারা ভিন্নধর্মী খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

এখানে বড় কোনো শপিং মল নেই, তাই শপিংয়ের ঝামেলা ছাড়া নিরিবিলিতে হানিমুন বা পারিবারিক সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ। আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই অসাধারণ যে ছবি তুলতে তুলতে হাতই ব্যথা হয়ে যেতে পারে! সব মিলিয়ে, যারা বাংলাদেশি পাসপোর্টে সহজে ভ্রমণ করতে চান, তাদের জন্য সেশেলস একটি অসাধারণ গন্তব্য হতে পারে। আমার এই দুই সপ্তাহের ভ্রমণ ছিল সত্যিই স্মরণীয়।

/এমটি

প্রশান্তির খোঁজে ক্যামেলিয়া লেক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
প্রশান্তির খোঁজে ক্যামেলিয়া লেক

আমাদের রাহাত ভাইয়ের পঙ্খীরাজে করে এগিয়ে চলছি নতুন গন্তব্য পানে। বাগানের রাস্তা কোথাও পিচঢালা, কোথাও মাটির। চা বাগানের চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। 

তিনি বললেন গেলে পরে দেখবেন। আমরা চলছি নতুন পথে সূর্যদেব গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছেন। কিছু সময় পর আঁকাবাঁকা পথ আমাদের শরীরের কলকব্জা অচল করে দেওয়ার উপক্রম। ও বলাই হলো না আমরা আজ আছি সিলেটের শমসেরনগরে। 

সঙ্গে আছেন সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত আর সিএনজি চালক রাহাত ভাই। যাইহোক অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছালাম অসাধারণ এক লেকের ধারে। দেখে মন জুড়িয়ে গেল। নাম জানতে চাইলে রুহেল ভাই বললেন চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে এই লেকের নাম বিসলার বান। তবে প্রকৃত নাম ক্যামেলিয়া লেক। 

তিনি আরও বললেন, এই জায়গায় আসতে হলে অনেক আগেই নেমে পদব্রজে আসতে হয়। কিন্তু তিনি এই এলাকার লোক তাই এই চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমি মনে মনে ভাবলাম মা আজ ভ্রমণ সঙ্গী থাকলে এই পথ পাড়ি দিতে চাইতেন না। 

তবে এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে যে প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখের সামনে ধরা দেয় তা সব ক্লান্তি দূর করে দেবে যে কারও। চারপাশে যত দূর চোখ যায় ছোট-বড় পাহাড়ি টিলাঢাকা চা বাগান। মাথার ওপরে নীল আকাশ। 

আকাশে আর লেকের পানিতে ঝাঁকবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখি। এরই মধ্যে টলটলে পানির অপরূপ লেক। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি সম্মুখ পানে। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ ছায়া দিচ্ছে। আর ওপরে উদাস আকাশ। পাশেই টিলার মাঝে চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। চা গাছের ছায়া পড়েছে লেকের জলে। 

দেখে মনে হয় লেকের পানির সঙ্গে মিতালি গড়েছে চা গাছগুলো। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখতে পেলাম লেকের পাশে বসার জন্য ছাউনি আছে। 

আমরা গিয়ে কিছু সময় বসলাম। চারপাশে পাখির কলতান আমাদের নিয়ে গিয়েছিল মুগ্ধতার রাজ্যে। আমরা লেকে পা ভেজালাম। 
রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম এই লেকের উৎপত্তিস্থল।

তিনি বললেন, এই বাগানের আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৩২৬ দশমিক ৪৭ একর। আমাদের দেশের চা বাগানগুলোয় সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য বাগানের মধ্যে ছোট-বড় লেক দেখতে পাওয়া যায়। এই লেকগুলো সাধারণত চা বাগানের নিচু জমিতে বা পাহাড়ি টিলার পাদদেশে থাকে। কিন্তু ক্যামেলিয়া লেকের বৈশিষ্ট্য হলো এই লেক বাগানের প্রায় শেষ প্রান্ত টিলার ওপর অংশ জুড়ে। 

ডানকান ব্রাদার্সের মাদার কোম্পানি ক্যামেলিয়া পিএলসির নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়। ক্যামেলিয়া পিএলসি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীজুড়ে তাদের কর্মীর সংখ্যা ৭৩ হাজারের অধিক। আর বাংলাদেশে আছে ১৮ হাজার কর্মী। 
সহধর্মিণী বায়না ধরলেন চা বাগানে ভেতরে গিয়ে ছবি তুলবেন, নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এগিয়ে গেলাম চা বাগানের দিকে। হঠাৎ দেখা পেলাম একদল বানর এই গাছ থেকে অন্য গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সুনছড়া চা বাগান থেকে ক্যামেলিয়া লেকের সৌন্দর্য মুগ্ধতা জাগানিয়া। যদিও চা বাগান কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক এ লেকটিতে কিছুটা কৃত্রিমতা জুড়ে দিয়েছেন। ইট-সিমেন্টের কিছু কৃত্রিম কাজ লেকটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লেকের ওপরে একটি পাটাতন তৈরি করা হয়েছে। 

এখন ‘বিসলার বান’ বা ‘ক্যামেলিয়া লেক’ হয়ে উঠেছে অসাধারণ এক পর্যটন স্পট। লেকটির পাশে রয়েছে একটি ঘর। যেটি স্থানীয় চা শ্রমিকদের কাছে ‘ক্লাব ঘর’ নামে পরিচিত। এ ঘরে বা গাছের ছায়ায় পর্যাপ্ত সময় কাটানো সম্ভব। পাইলট আমাদের দুজনের ছবিও তুলে দিলেন। 

ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে এই জায়গাটি এখনো অজানা, তাই লোকসমাগম নেই বললেই চলে। তাই পরিবেশ তার আপন ধারায় প্রবহমান। এর প্রকৃতির রূপ বিচিত্র যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

কীভাবে যাবেন
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে মৌলভীবাজার যাওয়া যাবে। রেলপথে এলে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে করে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ বা শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে। সব আন্তঃনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও ভানুগাছ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে সব আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। ফলে আগেই জেনে নিতে হবে

কোথায় নামতে হবে 
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নামলে সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। শমসেরনগর পর্যন্ত বাসে যাওয়ার পর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই লেকটিতে পৌঁছানো সম্ভব। যাদের প্রচুর হাঁটার অভ্যাস আছে তারা শমসেরনগর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটেও যেতে পারেন। 

আর ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে আসতে চাইলে মৌলভীবাজারগামী বাসে ওঠে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে একইভাবে লেকটিতে যাওয়া যায়। এছাড়া বিমানে এলে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নেমে বাস বা ট্রেনে আসা যাবে শমসেরনগর।

মানালি থেকে তুষারের রাজ্যে

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
মানালি থেকে তুষারের রাজ্যে

ভ্রমণ মানুষের জীবনে শুধু অবকাশ নয়, বরং আত্ম-আবিষ্কারের এক গভীর মাধ্যম। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর একঘেয়েমির ভিড় থেকে বেরিয়ে যখন কেউ অজানার পথে পা বাড়ায়, তখনই জন্ম নেয় এক নতুন গল্প। সেই গল্প কখনো পাহাড়ের নীরবতায়, কখনো বরফের শুভ্রতায়, আবার কখনো মানুষের সরল জীবনে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়। সম্প্রতি হিমালয়ের কোলে এমনই এক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।

উত্তর ভারতের পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশ প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের আধার। এখানে প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকে নতুন বিস্ময়, প্রতিটি উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকে শান্তির আবেশ। আমার এই সফরের শুরু হয় মানালির পথ ধরে, আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে পাহাড়ের রূপকথার মতো দৃশ্যপট।

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি বলা যায়। চারপাশে হালকা কুয়াশা, ঠাণ্ডা বাতাস আর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যা শহরের জীবনে প্রায় অচেনা। সেই নীরবতার মাঝেই শুরু হয় যাত্রা। পথ যত এগোতে থাকে, পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠানামা করা রাস্তা যেন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। কখনো সহজ, কখনো কঠিন, আবার কখনো চ্যালেঞ্জে ভরা।

প্রথম গন্তব্য ছিল এক শান্ত পাহাড়ি উপত্যকা, সবুজে ঘেরা, নিঃশব্দ অথচ জীবন্ত। ছোট ছোট বাড়ি, পুরোনো গির্জা, আর পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন এখানে এক অন্যরকম আবহ তৈরি করে। স্থানীয় সংস্কৃতির গভীরতা, তাদের উৎসব আর বিশ্বাস সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন এক জীবন্ত ঐতিহ্যের প্রতীক।

এরপর শুরু হয় যাত্রার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় উচ্চতার দিকে অগ্রযাত্রা। বরফে ঢাকা পথ, পাথুরে উত্থান আর শীতল বাতাসের বিরুদ্ধে এগিয়ে চলা সহজ ছিল না। মাঝপথে প্রকৃতির বাধাও এসেছিল। অতিরিক্ত তুষারপাতের কারণে সাময়িকভাবে থেমে যেতে হয়েছিল প্রথমদিন। কিন্তু পরদিন নতুন উদ্যমে আবার শুরু হয় যাত্রা।

উচ্চতায় উঠতে উঠতে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেও মন যেন এক অদ্ভুত শক্তিতে ভরপুর ছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের সীমা পরীক্ষা করতে হচ্ছিল। মাঝে মাঝে থেমে শ্বাস নিতে হয়েছে, আবার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে সামনে। অবশেষে যখন শীর্ষে পৌঁছানো গেল, তখন চোখের সামনে যে দৃশ্য ভেসে উঠল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চারদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়, নিচে বিস্তীর্ণ উপত্যকা আর ওপরে সীমাহীন নীল আকাশ মনে হচ্ছিল, যেন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য এক জায়গায় মিলিত হয়েছে।

এরপরের অভিজ্ঞতা ছিল এক ভিন্ন মাত্রার। পাহাড় কেটে তৈরি এক দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ অতিক্রম করা। এই আধুনিক নির্মাণ যেন প্রকৃতির বুকে মানুষের সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ। সুড়ঙ্গের অন্ধকার পেরিয়ে যখন আলোয় ফিরে আসা যায়, তখন মনে হয় যেন এক নতুন জগতে প্রবেশ করা হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু ভৌগোলিক নয়, মানসিকভাবেও এক নতুন অনুভূতির জন্ম দেয়।

শেষ গন্তব্য ছিল এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম, যেখানে প্রকৃতি তার সবচেয়ে নির্মল রূপে ধরা দেয়। চারপাশে বরফের চাদর, দূরে তুষারাবৃত শৃঙ্গ, আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির ধারা। সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। এখানে মানুষের জীবনযাপন ধীর, শান্ত এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের মুখে নেই কোনো তাড়াহুড়ো, নেই শহুরে ক্লান্তির ছাপ।

এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ককে কাছ থেকে দেখা। পাহাড়ি মানুষের সরলতা, তাদের সংগ্রাম এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এসে এই কয়েকটি দিন যেন জীবনের এক ভিন্ন স্বাদ দিয়েছে।

ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, এই যাত্রা শুধু কিছু দৃশ্য দেখা নয় এটি ছিল নিজের ভেতরের এক নতুন জগৎকে আবিষ্কার করার সুযোগ। পাহাড় শিখিয়েছে ধৈর্য, বরফ শিখিয়েছে স্থিরতা, আর প্রকৃতি শিখিয়েছে বিনম্রতা।

ভ্রমণ শেষ হয়ে গেলেও তার অনুভূতি রয়ে যায় দীর্ঘদিন। সেই স্মৃতিগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয় জীবনের সত্যিকারের সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে সরলতায়, নীরবতায় এবং প্রকৃতির মাঝে। এই সফর তাই শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং এক অন্তর্দর্শনের যাত্রা যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত নতুন করে বাঁচতে শেখায়।

/এমটি