পদ্মাপারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাচীন জনপদ উত্তরের জেলা পাবনা। এখানে আছে রূপসি পদ্মার ঢেউয়ের কলধ্বনি, সবুজের বেষ্টনী ও বিলের উত্তাল হাওয়া। স্মৃতি হয়ে আছে হিন্দু-মুসলিম ও ব্রিটিশদের নানা স্থাপনা। সৌন্দর্য বাড়িয়েছে সবুজ প্রকৃতি। নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে রুশদের নতুন শহর। ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নতুনের সুন্দর সংমিশ্রণ এই জেলায়।কেউ নতুন শহর দেখতে, কেউবা বিলের সৌন্দর্যের খোঁজে এখানে বেড়াতে আসেন। অফিসের কাজে এসেছি পাবনা শহরে, কাজের ফাঁকে কথা হচ্ছিল অফিসের সহকর্মীর সঙ্গে। হোটেল থেকে অফিস আর অফিস থেকে বাসা এভাবেই চলছিল গত দুদিন।
আগামীকাল ফিরে যাব যান্ত্রিক নগরে। ইমরানকে বলছিলাম দুদিন পেরিয়ে আজ তৃতীয় দিন কোথাও ঘুরতে নিয়ে গেলে না। বলতেই ইমরান বলল স্যার চলেন কাছেই গাজনা বিল আছে।আমি বললাম কত সময় লাগবে পৌঁছাতে? প্রত্যুত্তরে ইমরান বলল ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগবে মোটরসাইকেলে যেতে। আমি আর ইমরান দুই চাকার বাহনে করে এগিয়ে চলছি। সময় দিবা দ্বিতীয় প্রহর, সূর্যদেবের মন ভালো নেই তাই কালো করে আছে মুখ। ইমরানকে বলছিলাম ভ্রমণে বের হলাম কিন্তু ছাতা তো সঙ্গে নেই।
ও বলল সমস্যা নেই বৃষ্টি আসবে না কয়েক দিন ধরে আকাশ মেঘলা করে থাকে খুব একটা বৃষ্টি হয় না। সুজানগর উপজেলার আত্রাই ও পদ্মা নদীর সংযোগে সৃষ্ট এ বিল গাজনা বা বিলগন্ডহস্তী নামেও পরিচিত। বর্তমানে গাজনার বিলের পানির প্রধান উৎস এ অঞ্চলের বৃষ্টি ও যমুনা নদী পানি হলেও যুগ যুগ ধরে পদ্মা নদীর পানি গাজনার বিলে প্রবেশ করত। জনশ্রুতি আছে বর্ষা মৌসুমে প্রমত্ত পদ্মার যে গর্জন হতো এবং ওই গর্জনের ফলে উত্থিত পানি দুকূল ছাপিয়ে নিম্নাঞ্চল গাজনায় এসে আটকে থাকত।
যার কারণে প্রমত্ত পদ্মার গর্জন থেকেই গাজনা বা গাজনার বিলের নাম হয়েছে। গাজনার বিল মূলত খয়রান ব্রিজ থেকে পূর্ব দিকে তিন থেকে চার কিলোমিটার কাটাজোলা বিল পর্যন্ত গাজনার বিল নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে পোড়াডাঙ্গা থেকে বাদাই জোলা পর্যন্ত গাজনা বিল নামে পরিচিত। মুজিব বাঁধ হওয়ার পর বাদাই নদী স্লুইসগেট দিয়ে যমুনার পানি গাজনার বিলে প্রবেশ করে। আগের থেকেই পদ্মা নদী থেকে কয়েকটি প্রাকৃতিক ক্যানালের মাধ্যমে গাজনার বিলে পানি প্রবেশ করত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্যানালগুলো হলো চরসুজানগর হয়ে সুজানগর পৌরসভার কোল ঘেঁষে বান্নাই কোল হয়ে নেকের বনগ্রাম পোড়াডাঙ্গা হয়ে গাজনার বিল।
নিশ্চিন্তপুর থেকে কাচুরির কোল হয়ে শাহপুর ও মঠবাড়িয়া পাশ দিয়ে মতির বিল (গাজনা বিল)। শ্যামনগর ভাটপাড়ার মধ্য দিয়ে মানিকহাটের পশ্চিম পাশ দিয়ে উলাট খয়রানের মধ্য দিয়ে গাজনার বিল। মালিফা হয়ে ভিটবিলার পূর্ব পাশ দিয়ে বোনকোলা হাটখালীর মধ্য দিয়ে গাজনার বিল। বরকাপুর নারায়ণপুর সাগতা হয়ে গাজনার বিল। এসব ক্যানাল দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি গাজনার বিলে প্রবেশ করত এবং বিলের পানি জলাবদ্ধতা আকারে প্রায় সারা বছরই পানি থাকত। সে সময় বিলের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় রুই, কাতলা, বাগাড়, ফলি, গজার, বোয়াল, পাঙাশ ইত্যাদিসহ অসংখ্য ছোট ছোট মাছ পাওয়া যেত বলছিল ইমরান।
সময়ের সঙ্গে আমরা এসে উপস্থিত হলাম বোয়ালিয়া বটতলায়। এবার আমরা চেপে বসলাম নৌকায়। আমাদের তরী এগিয়ে চলছে। দূরদিগন্তে বৃক্ষ সারির মাথায় স্নেহ পরশ বুলিয়ে ফেরারি হয়েছে স্বপ্নের আকাশ। নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো পেঁজা তুলার মতো মেঘের দরজায় এক অদ্ভুত মায়াময় প্রতিচ্ছবি একে দিয়েছে বিলের ক্যানভাসজুড়ে। সজল মেঘের ছায়ায় ভিজে জাল পেতে রেখেছেন স্থানীয় জেলেরা। ১৬টি ছোট-বড় বিলের সমন্বয়ে সৃষ্ট এই গাজনার বিল। তন্মধ্যে মতির বিল, হাতিগারার বিল, সহিবাজের বিল, ডহার বিল, রামার বিল, গমগারার বিল, পশ্চিম চক বিল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বিলটি সুজানগর উপজেলার একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। সুজানগর উপজেলার সবগুলো ইউনিয়নে এর বিস্তৃতি। আমাদের তরী বেয়ে চলছেন মাঝি। নদীর নাভিমূলে ততধিক নীলরঙের জালের বিরাট এক কলস যেন ডুবিয়ে রাখা হয়েছে বিলের পানি। হাতে হাতে টেনে ছোট করে আনা হচ্ছে কলসের মুখ। সেই সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে মাছেদের পৃথিবী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে জেলেদের মুখে। টেনে তোলা জালে ছোট পানির খলখলানিতে প্রকাশিত হতে থাকে পানির নিচের জীবন্ত সম্পদ রাশির প্রতিচ্ছবি। আমাদের মাঝি বলছিলেন বিলটি সুজানগর উপজেলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশ এর ওপর নির্ভরশীল। সুজানগর উপজেলার কমবেশি ১০টি ইউনিয়নের সঙ্গেই গাজনার বিল সংযুক্ত রয়েছে।
বিলের চারিধারে আবাদি জমি ও সব বসতি অবস্থিত। এই গাজনার বিলের মাধ্যমেই এই এলাকার কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়। বিলের চারপাশে আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার হেক্টর। এসব জমিতে পাট, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন হয়। বর্তমানে এই বিলের জমি বাংলাদেশের মধ্যে পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। দেশের চাহিদার ৩০-৪০ ভাগ পেঁয়াজ এই বিলের জমিতে উৎপাদন হয়। এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণে পাট ও ধান উৎপাদিত হয়। আশির দশকের শেষ দিক থেকে গাজনা বিলে ইরিগ্রেশন প্রজেক্টের আওতায় ইরি বোরো ধান লাগানো শুরু হয়। এসব কৃষি আবাদের ফলে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের জীবনযাপনে সচ্ছলতা আনয়ন করে।
এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে পাবনা ও সুজানগর উপজেলার বৃষ্টি পানি ও বাদাই স্লুইসগেটের মাধ্যমে যমুনা নদী থেকে এই বিলে পানি আসে। সে কারণে সারা বছর এই বিলে জলের প্রাচুর্য থাকে। দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত গাজনার বিলে ছোট-বড় প্রায় শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছ এ অঞ্চলের মানুষের চাহিদা মিটিয়েও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মৎস্য আড়তে পাঠানো হয়। প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিতে বিলের পানিতে একদল পথিক উচ্চৈঃস্বরে গান গাচ্ছিল।
ভরদুপুরে পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো কোনো মাঝি করছেন রান্নার আয়োজন। আমাদের মাঝি চলছেন এগিয়ে সূর্যরশ্মির আভা গায়ে মেখে চকচক করছিল মাছগুলো। আমি নৌকা থেকে কিনে নিলাম কিছু মাছ। মাছগুলো তাজা রাখার জন্য জেলেরা মাছের প্যাকেটে বরফ দিচ্ছিলেন। এখানে মাছ ধরার পালা শেষ প্রতিদিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় এই বিলে। সূর্যদেবের পাটে যাওয়ার সময় চলে এসেছে আর ঘড়ির কাঁটা আমাদের তারা দিচ্ছিল আপন নীড়ে ফিরে যাওয়ার জন্য। জলাভূমি বেষ্টিত এই অনিন্দ্য সুন্দর আবাসভূমি ছেড়ে ফিরে যেতে মন চাচ্ছিল না কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন আমাদের বারবার ফিরে যেতে হয় নাগরিক কোলাহলে জীবনের মানে খুঁজে নেওয়ার নিমিত্তে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার গাবতলী থেকে পাবনার উদ্দেশে পাবনা এক্সপ্রেস, সি-লাইন, সরকার ট্রাভেলস, শ্যামলীসহ বিভিন্ন বাস চলাচল করে। বাসের মান অনুযায়ী জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। পাবনাগামী বাসে বিরাহিমপুর বা চব্বিশ মাইল নামক স্থানে নেমে স্থানীয় যানবাহন (ভ্যান বা অটোরিকশা) নিয়ে দুর্গাপুর বা বোয়ালিয়া বটতলা যেতে পারেন। বটতলা থেকে ঘণ্টাপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা ভাড়ায় কিংবা সারা দিনের জন্য ১৫০০-২০০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে গাজনার বিল ঘুরে দেখতে পারবেন। তা ছাড়া পাবনা জেলা শহর থেকে সুজানগর উপজেলায় পৌঁছে সিএনজি নিয়ে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে খয়রান ব্রিজ সংলগ্ন গাজনার বিল পর্যন্ত সহজেই যেতে পারবেন।
/রোদসী

.jpg)