ভ্রমণ পাগলদের জন্য শুক্রবার কিংবা ছুটির দিনটা অন্যরকম আনন্দ-বিনোদনের। সপ্তাহজুড়ে যত ঝক্কি-ঝামেলাই থাকুক না কেন, ছুটির দিন ঠিকই পাখি ডাকা ভোর থেকেই দেহ-মন থাকবে একদম ফিট। এই শীতে তেমনি এক শুক্রবার ভোরে, আমি আর জসিম মোটরবাইক নিয়ে বের হয়ে পড়ি।
যেতে যেতে সাভার প্রান্তে মায়াবী সবুজে ঘেরা বংশী নদীর ফোর্ডনগর ব্রিজ পার হয়ে এগোতে থাকি। একটা সময় কুয়াশাভেদ করে সূর্য উঁকি দেয়। হঠাৎ রূপনগর ব্রিজের ওপর থেকে, পূর্বদিগন্তে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে যাই। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো আকাশের অনিন্দ্য রূপ, লিখে বোঝাতে পারব না। মনে হবে পাহাড়ের উঁচু কোনো চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছি।
আপনারাও যারা যাবেন, তারা কাজিয়ালকুন্ড সড়ক ধরে এগোতে থাকুন। সবুজ ঘাসের ওপর শিশির বিন্দু দেখে পুলকিত হবেন। পথের ডানে-বামে যতদূর চোখ যাবে শুধু হলুদে রাঙানো জমিন। সরিষা ফুলের ম-ম ঘ্রাণে মন করবে আনচান। শান্ত বংশীর রূপে হবেন মাতাল। পৌষ ও মাঘ মাসজুড়ে আবহমান বাংলার অধিকাংশ জেলার মাঠ এরকম হলুদ বর্ণ ধারণ করে। প্রকৃতির এই সময়ে গ্রামীণ জনপদ পরিণত হয়েছে হলদে রঙে সাজানো এক রাজ্যে।
তবে এ অঞ্চলটা যেন একটু অন্যরকম আবেশের, ভিন্ন রকম সৌন্দর্যের। দিগন্তজোড়া সরিষা ফুল। এখানকার জমি যেন সরষের জন্যই সৃষ্টি। এরকমটা কেন লিখলাম? তাহলে মন দিয়ে পড়ুন। ফোর্ডনগরটা এমন এক জায়গায়, এর একপাশে ঢাকা জেলার সাভার, আরেক পাশে ধামরাই ও মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার ভাটিরচর। পাশাপাশি এই তিন অঞ্চল জুড়েই ব্যাপকভাবে সরিষা খেতের চাষাবাদ করা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থাটাও দারুণ। ইচ্ছামতো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিন জায়গার সরিষাফুলের সান্নিধ্যে কাটানো যায়। সরিষা মূলত রবি শস্য। এর প্রকার ভেদও রয়েছে তিনটি। চৈতী, তিষী ও মাঘী।
সরিষার তেল এবং শাকও বেশ মজাদার খাবার। সরিষা খেত আর আবহমান বাংলার গ্রামীণ রূপ দেখতে, ঘুরে আসতে পারেন ধামরাই উপজেলার রূপনগর ও বরদাইল গ্রামে। রূপনগর ও বরদাইল গ্রামের প্রকৃতি এখনো তেমন বৈরী হয়ে উঠেনি। মোলায়েম প্রকৃতির নির্যাস মেলবে এ পাশটায়। অনেকটাই কোলাহল মুক্ত নির্জন পরিবেশ।
সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলে পাখির কুহু কুহু ডাক, নানা সবজিখেত আর জমির পর জমিতে ছড়িয়ে থাকা সরিষা ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে—গুটি গুটি পায়ে খেতের আইল ধরে হেঁটে যাবেন অনেক দূর। ঢাকার পাশে হলেও এখনো কৃষাণ-কৃষাণীর মুখের হাসি, দৃষ্টিনন্দন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো নজর কাড়ে। দেখা যাবে কৃত্রিম মধু সংগ্রহের দৃশ্য।
জানা হবে একটি রানি মৌমাছি প্রায় ৫০ হাজার মৌমাছির নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। সরিষা ফুলের মধু মানবদেহের জন্যও বেশ উপকারী। ফোর্ডনগরের আকাশপানে, পড়ন্ত বিকেলে উড়ে বেড়ায় পরিযায়ীর দঙ্গল। অপরূপ সূর্যাস্ত শেষে গরম গরম ডালপুরি আর গাভির দুধের চা—আহ্ সব মিলিয়ে এক অসাধারণ সময় কাটবে। যৌবনহীন বংশী ও ধলেশ্বরী নদীর দুই তীরের সৌন্দর্য এখনো কম যায় না। চাইলেই ডিঙি নৌকায় চড়ে বংশীর বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন।
ধর্মজালে জেলেদের মাছ ধরা দেখতে পারবেন। ঢাকা জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় যে বাজার সেটিও সাভারে অবস্থিত। নাম তার নামাবাজার। ভ্রমণের ঝুলি সমবৃদ্ধ করার জন্য বাজারটা ঘুরেও দেখার আছে অনেক কিছু। সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার বেড়ানো হতে পারে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। হাতে সময় থাকলে সাভারের কমলাপুর গ্রামেও ঢুঁ মারতে পারেন।
আরেকটু এগিয়ে বনগাঁও ইউনিয়নের সাদাপুর গ্রামের আধুনিক কৃষক আমিনের নানান পদের সবজি-সরিষা খেত পরিদর্শনের পাশাপাশি গোলাপ বাগানেও সময় কাটাতে পারবেন। পুরো একটা দিন প্রকৃতির মায়াবী চাদরে ঘেরা সরিষা ফুলের রাজ্য, ধামরাই ও সাভারের আশপাশের নিরিবিলি গ্রামগুলো ঘুরে বেড়ানোর মতো আদর্শ জায়গা। তাহলে আর দেরি কেন ভ্রমণপিপাসু বন্ধুরা, জীবন-মন রাঙাতে চলে যেতে পারেন ধারে-কাছের কোনো রবি শস্যের সরিষা খেতে।
সাভার গেলে আরও কী কী দেখবেন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি ও সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ আরও অনেক কিছু।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার বঙ্গবাজার, মতিঝিল, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এবং সদরঘাট থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে সাভার বাজার স্ট্যান্ড যাওয়ার জন্য। সেখান থেকে অটো বা রিকশায় ফোর্ডনগর।
তথ্য
সরিষা খেতে ঘুরার জন্য সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে গেলে সূর্যের আলোতে সরিষা ফুল দেখতে খুব সুন্দর লাগবে। ভোরের শিশির বিন্দু, ঘন কুয়াশা ও সবজিখেত দেখতে হলে খুব সকালেই ঘর ছাড়তে হবে।
ঢাকার আশপাশ আর কোথায় কোথায় সরিষা খেত দেখা যাবে
নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার চান্দেরপার গ্রাম। চান্দেরপার গ্রামে গেলে বিকেলটা মেঘনা নদীতে কাটানোর মুহূর্তটা হতে পারে অসাধারণ। আর আড়াইহাজার গেলে খেজুর রসের হাঁড়িতে চুমুক দেওয়ার লোভ সামলানো দায় হবে।
/রোদসী

.jpg)