দিগন্ত বিস্তৃত নীলাভ জল। পৌরাণিক কাহিনিগাথা নদীর ধার। সারি সারি পামগাছের ফাঁক গলে হেঁটে যাওয়া। সড়কপথের কলিজা কাঁপানো বাঁক। এসব মিলিয়ে স্বল্প সময়ে ঘুরে আসার মতো রোমাঞ্চকর স্মৃতি বয়ে আনা প্রকৃতিকন্যা উপজেলা কাপ্তাই। টানা তিন দিন ছুটি। ছুটি মানেই ভ্রমণে বের হওয়ার জন্য মন থাকে পাগলপারা। রাত ১১টায় বাস।
দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের সঙ্গীরা সবাই বাস কাউন্টারে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশটা ছুঁই ছুঁই করলেও, আমার তখনো যাওয়া হয়নি। মাথা পুরাই নষ্ট। পরদিন দলীয় র্যালিতে না গেলেই নয়। রাজনৈতিক কর্মসূচি, কি যে করি? এদিকে ভ্রমণসঙ্গীরা অনবরত ফোন দিয়েই যাচ্ছে। হা-হুতাশ করতে করতে রাত ১১টার সময় পর্যটনবান্ধব ও প্রিয় রাজনৈতিক অভিভাবক হামিদুর রহমান হামিদ ভাইকে বলেই ফেললাম, ঘোরাঘুরির জীবনে এই প্রথম আমি আজ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের সঙ্গী হতে পারলাম না।
তিনি আমার চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট বুঝতে পেরে দ্রুত অনুমতি দিয়ে দিলেন। এবার আমাকে আর পায় কে? একরাশ মুগ্ধতার হাসি হেসে মুহূর্তের মধ্যেই ওয়ারী থেকে জনপথ মোড় পৌঁছে যাই। প্রচণ্ড জ্যামের কারণে বাস একটু দেরিতেই ছাড়ল। স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে সিটে বসলাম বেশ আয়েশ করে। যেতে যেতে ভোরে পৌঁছাই কাপ্তাই।
সরকারি এক বিশ্রামাগারে আগেভাগেই রুম ঠিক করা ছিল। রুমে উঠে সাফসুতর হয়েই সিএনজি করে আসামবস্তির দিকে ছুটে যাই। যেতে যেতে বাঙাল হালিয়া পাহাড়ি বাজারে ব্রেক। কর্ণফুলী নদী ও কাপ্তাই লেকের নানান পদের মাছ আর ফলের পসরা মেলে রেখেছে পাহাড়িরা। পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি হাট-বাজারগুলোর ভিন্নমাত্রার বৈশিষ্ট্য থাকে, যা ভ্রমণপিপাসুদেরও বেশ আকৃষ্ট করে থাকে। তরতাজা মাছ কেনার ইচ্ছে দমিয়ে ছুটলাম মূল গন্তব্যে।
পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলা সড়ক। উঁচু-নিচু ঢালু। একপাশে পাহাড়, আরেক পাশে কাপ্তাই লেকের নীলাভ জলরাশি। বয়ে চলা পানির বুকে ছোট্ট করে মাথা জাগিয়ে রাখা মাটি। সেই মাটি ভেদ করে শিরদাঁড়া উঁচু করে আছে বৃক্ষরাজি। চমৎকার চমৎকার সব প্রাকৃতিক দৃশ্য! এ রকম নৈসর্গিক পরিবেশে মুগ্ধ নয়নে যেতে যেতে, কখনো কখনো গাড়ি থামিয়ে চলল ফটোশুট। কোথাও কোথাও পথের ধারে কৃত্রিম ও প্রকৃতির সম্মিলনে পর্যটকদের জন্য সাজুগুজু করে রাখা হয়েছে নানান স্থাপনা। কোথাও-বা সড়কের পাশে কংক্রিটের বেঞ্চ।
ব্রিজ পর্যন্ত যেতে আরও কয়েকবার থেমেছি। পথের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আমাদের থামতে বাধ্য করেছে। জুমের কলা, পেঁপে, আনারস সেই ছিল স্বাদের! যেতে যেতে কাঙ্ক্ষিত ব্রিজ। সত্যিই অসাধারণ সৌন্দর্যে ঘেরা সর্পিল আসামবস্তি ব্রিজ! মাথার ওপরে নীল আসমান। ডানে-বাঁয়ে কাপ্তাই লেকের টলটলে পানি। সামনে তাকালে এঁকেবেঁকে যাওয়া ব্রিজটি চলে গেছে বহুদূর।
তপ্ত রোদেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমুগ্ধ নয়নে ব্রিজের রেলিং ধরে তাকিয়ে থাকা যাবে লেকের জলে। ১৯৫৬ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এটি একটি কৃত্রিম হ্রদ। বর্তমানে এই হ্রদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
অথচ এর পেছনের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ। বাঁধটি নির্মাণকালে রাঙামাটি জেলার প্রায় ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি পানিতে ডুবে সৃষ্টি হয় হ্রদ। বাদ যায়নি রাঙামাটির রাজার রাজবাড়িটিও। বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট হ্রদ। এর গভীরতা ১০০ ফুট হতে কোথাও কোথাও প্রায় ১৭৫ ফুট পর্যন্ত। সবুজের সঙ্গে মিতালি করা কাপ্তাই লেকের আয়তন ৪,২৯৪ বর্গমাইল। এই লেকের মাছ বেশ সুস্বাদু। ঘুরতে ঘুরতে দুপুরের আহারটা রেস্টুরেন্টে বেশ মজা করে খেয়ে নিই।
ছুটলাম এবার শিলছড়ি। কাপ্তাই বাজার থেকে সড়কের রোমাঞ্চকর বাঁকগুলো পেরিয়ে মাত্র ২৫ মিনিটেই হাজির হই কর্ণফুলী নদীর তীরে। লুসাই পাহাড়ের সন্নিকটে শিলছড়ি ৩৫ আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের মূল ফটকে, জবিয়ান বন্ধু ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সেলিম সশরীরে এসে অভ্যর্থনা জানায়। যারপরনাই আন্দোলিত হই।
গেস্টরুমে গিয়ে তার সঙ্গে চলে ক্যাম্পাসের সোনালি অতীতের স্মৃতিচারণ। সূর্য হেলে পড়তেই সেলিম আমাদেরকে নিয়ে গেল কর্ণফুলীর কূলে। জায়গাটা এত বেশি নয়নাভিরাম ও পরিচ্ছন্ন, প্রথম দেখাতে মনেই হবে না যে এটা আমাদের দেশ! সারি সারি পামগাছসহ নানান প্রজাতির বৃক্ষরাজি। দৃষ্টির সীমায় মাথা উঁচু করে আছে লুসাই পাহাড়। সবুজের গালিচা দিয়ে মোড়ানো। সেই পাহাড়ে বসবাস করে নানান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। পাহাড়ি নদীর বয়ে চলা পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। ঝিরঝির বাতাসের দোল।
জুম ঘরের আদলে তৈরি ছাউনিতে বসে চায়ের আড্ডা, সব মিলিয়ে সুন্দর একটি বিকেলের সাক্ষী হই। সময়ের পরিক্রমায় লাল টকটকে সূর্যটা লুসাইর বুকে থাকা গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ওই দিনের স্মরণীয় একটা ভ্রমণের ইতি টেনে ফেরার পথ ধরি।
যাতায়াত: জেলা রাঙামাটি কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন বাসটার্মিনাল হতে দিনে-রাতে বিভিন্ন পরিবহনের সার্ভিস সরাসরি কাপ্তাই যাতায়াত করে।
থাকা-খাওয়া: সরকারি বিশ্রামাগার, ডাকবাংলোসহ বেসরকারি বিভিন্ন মানের হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। খাবারের জন্য প্রচুর রেস্টুরেন্টও রয়েছে।
/এমটি

.jpg)