বছর ঘুরে আসছে নতুন এক শতক। নতুন বছরকে ভিন্নভাবে বরণ করে নেয় আমাদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা। তেমনি একটি উৎসব হলো বৈসাবি। বৈসাবি এলেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের গানের সুর আর নাচের তালে সবাই মিশে একাকার হয়ে যায়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় গানের সুর আর নূপুরের ছন্দ। চারদিকে বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। সব মিলে বৈসাবির রঙে রঙিন হয়ে ওঠে পাহাড়। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয় এ উৎসব চলে প্রায় অর্ধ মাসব্যাপী।
ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সম্প্রীতির মিলনে পাহাড়ে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। বন্ধু তপতাংশু চাকমার আমন্ত্রণে আমরা এবার যাচ্ছি রাঙামাটি। সকাল বেলা বাসে চেপে আমরা এগিয়ে চলছি রাঙামাটি পানে। অনেক দিন হয় কোথাও ঘুরতে বের হওয়া হয় না। আর বেশি পরিকল্পনা করলে ভ্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনাই ভেস্তে যায় আমার ক্ষেত্রে।
ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরা এসে পৌঁছালাম গন্তব্যস্থলে। ঢাকা থেকে রওনা হয়ে রাঙামাটি শহরে না নেমে তার আগেই ভেদভেদি বাসস্ট্যান্ডে নেমে পড়ি। অদূরেই মনোগড়ের বড়বি আদামে (বড়বিপাড়া) অপেক্ষায় ছিল আমাদের বন্ধু তপতাংশু চাকমা। অনেক দিন পরে বন্ধুর সঙ্গে দেখা, সেই স্কুল জীবন পেরিয়ে আমরা যে যার পথে পাড়ি জমাই।
তপতাংশু বলছিল হ্রদ-পাহাড়ের শহর রাঙামাটিতে এখন বাঁশির সুর ভাসছে। বৈসাবি আসছে। তাই এ আবাহনী গানের সুর তুমুল আলোড়ন তুলছে হ্রদ আর পাহাড়ে। তরুণ-তরুণীরা হাতে হাত ধরে পাড়ায় পাড়ায় বেড়াতে শুরু করেছে। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বর্ণিল সংস্কৃতি আর প্রকৃতি যেন এ শহরে একে অন্যের পরিপূরক। রাঙামাটিতে বসবাস করে চাকমা, মারমা, লুসাই, ত্রিপুরা, পাঙ্খোয়া ও খিয়াং জনগোষ্ঠী। প্রতিটি সম্প্রদায়ের রয়েছে বর্ষবরণের নিজস্ব ঐতিহ্য ও প্রথা।
বর্ষবরণের উৎসবকে চাকমা সম্প্রদায় বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, লুসাইরা বিষু, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক, পাঙ্খোয়া সম্প্রদায় বিহু বা বিষু এবং খিয়াংরা বিষু নামে অভিহিত করে থাকে। আমরা উপস্থিত হলাম তপতাংশুর ডেরায়। আমাদের যাত্রাপথের ক্লান্তি দূর করার জন্য লেবুর শরবত আমাদের মাঝে পরিবেশন করা হলো। কথা হচ্ছিল তপতাংশুর বড় ভাই সুশীল দাদার সঙ্গে।
দাদা বলছিলেন পুরোনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরের আগমন দুটোই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিজু অর্থ বিশেষ সুযোগ। বিশেষ সুযোগের এই উৎসব একাধিক পর্ব বা দিনে বিভক্ত। যথা–ফুলবিজু, মূলবিজু এবং গোজ্যেপোজ্যে। চৈত্রের শেষ অর্থাৎ বছরের শেষ দিন হলো ফুলবিজু। এই দিনে পরিবারের নারী ও শিশুরা জঙ্গল থেকে ফুল তুলে আনে। সেই ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়। তার আগে ঘর এমনকি কাপড়-চোপড় সবকিছু ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিপাটি করার নিয়ম। ফুল দিয়ে কেবল ঘরদোরই নয়, গরু-ছাগল ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীকেও সাজিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া কৃষিকাজে ব্যবহৃত কোদাল, লাঙল এবং অন্যান্য উপকরণকেও ফুল দিয়ে রাঙিয়ে তোলা হয়। মূলত এসব নিয়মবিধি পালনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় ফুলবিজুর দিনটি।
আর মূলবিজু হলো বছরের পহেলা দিন, এই দিনে তারা সর্বাধিক আনন্দ করে থাকে। তখনো ভালো করে আলো ফোটেনি। ফুটে উঠেনি সূর্যের পরিপূর্ণ রূপ। তপতাংশুর ডাকে ঘুম থেকে উঠতে হয় আমাদের। চটজলদি তৈরি হয়ে আমরা চলে যাই নদীর পাড়ে। দেখতে পেলাম এই ভোরে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা সবার মঙ্গল কামনায় কলাপাতায় করে ভক্তি শ্রদ্ধাভরে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসিয়ে পুরোনো বছরের গ্লানি ভুলে নতুন বছরের শুভ কামনায় নিমগ্ন।
কেউবা একাকী আবার অনেকে সারিবদ্ধ হয়ে নদীতে নানা রঙের ফুল ভাসাচ্ছেন। এ সময় রঙিন হয়ে উঠল নদী। সকালবেলা পরিবারের ছোটরা বেতের তৈরি পাত্রে ধান, কুঁড়া ইত্যাদি নিয়ে দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে হাঁস, মুরগিকে খাওয়ানোর জন্য ছিটিয়ে দিচ্ছে। অতঃপর মুরুব্বিদের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেওয়ার পর্ব শেষে এবার নিজেদের খাওয়ার পালা। তার আগে মুরুব্বিদের ভক্তি সহকারে খাওয়ানোর পর্ব সেরে নেওয়ায় রয়েছে বিশেষ কঠোরতা। বেলা যখন মাথার ওপর, ঠিক সেই সময় ঝর্ণা থেকে তুলে আনা পানিতে মুরুব্বিদের পরম শ্রদ্ধায় গোসল করানো হয়।
এরপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে খেয়ে বেড়ানোর পর্ব, চলে দিনব্যাপী। বিশেষ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে তাদের ভাষায় ‘উদিজগর্বা’ শব্দটায় বেশ গুরুত্ব, এর অর্থ হঠাৎ অতিথি। উৎসব চলাকালে যেকোনো বাড়িতে উদিজগর্বা এলে তারা ভীষণ খুশি হয়। আমরা একের পর এক বাড়িতে উদিজগর্বা হয়ে উপস্থিত হই। প্রথমে সুমনের বন্ধু খোকন চাকমার বাড়ি গেলাম; সেখানে বসার কিছুক্ষণ বাদেই পরিবেশনের জন্য একের পর এক আসতে থাকে হরেক পদের খাবার। পাঁজন, বিরিয়ানি (মটরকলাইয়ের সঙ্গে মুরগি অথবা আলুর ছোট ছোট টুকরো সহযোগে রাঁধা), মুরগির মাংস, পিঠা, জিলাপি, রসগোল্লা, আচার, তরমুজ ইত্যাদি। সব খাবারই তাদের ঘরে প্রস্তুত করা। এসবের মাঝে পাঁজন হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী একটা পদ। নানা ধরনের শাকসবজি, যেমন–কচি কাঁঠাল, কাঁচকলা, আলু, শিমুল (স্থানীয় বিশেষ ফুল), তারা (ঘাস বা বাঁশ প্রজাতির উদ্ভিদ), মাশরুম ইত্যাদি দিয়ে তৈরি।
কমপক্ষে পাঁচ থেকে শুরু করে ৪৫ বা আরও অধিক প্রকার সবজি দিয়ে এই খাবার প্রস্তুত করা তাদের ঐতিহ্য, যা উৎসবে সব খাবারের মধ্যে প্রধান আকর্ষণ বলে গণ্য হয়ে থাকে। চাকমাদের ধারণা এই দিনে (মূলবিজু) স্বর্গের দুয়ার খোলা থাকে। তাই তারা বেশি বেশি পুণ্যের আশায় উদিজগর্বা দেখলেই বাড়ি নিয়ে আপ্যায়ন করতে নিমন্ত্রণ জানায়। এসব দেখে আমরা অল্প অল্প খাচ্ছি, কারণ এসে যখন পড়েছি তখন অনেক বাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করতে হবে নিশ্চিত! একে একে ৪-৫ বাড়িতে উদিজগর্বা হই।
ক্রমেই যুক্ত হয়ে যাই স্থানীয় ১৫-২০ জনের এক দলে, যারা ঘুরে ঘুরে একেক বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত। কারও বয়স ১৫, তো কারও ৫০। জুম চাষি, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কোনো ভেদাভেদ নেই, এই দিনের জন্য সবাই সমান। তাদের সঙ্গে একাকার হতে বেশি সময় লাগেনি। জড়তা কাটিয়ে আপন করে নিতে বয়সে সবার বড় রঞ্জদা ও শিমুলদা বলেন, এই দিনের জন্য ছোট-বড় সবাই সমান, অতএব আনন্দ করো। কয়েকটা বাড়িতে হয়ে যায় জম্পেশ গল্পের আসর। খেতে খেতে পরিস্থিতি বেগতিক, রণে ভঙ্গ দিতে চাইলে বলে, এই তো আর এক ঘরে যেতে হবে! এমনি করে এক ঘর দুই ঘর হতে হতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত চলে আসে।
মূলবিজু ও ফুলবিজুর পর তৃতীয় দিন গইজ্জা পইজ্জা, অর্থাৎ কেবলই শুয়ে-বসে দুদিনের বেশুমার খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দের ক্লান্তি ঝেরে ফেলা। তাদের আন্তরিক আতিথেয়তা ও আপন করে নেওয়ার ঘটনা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার মতো। না আছে ভান, না আছে ভণিতা, আদিকাল থেকে পালিত হয়ে আসা ঐতিহ্য আজও তাদের মাঝে বিদ্যমান। পরিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে যতটুকু দরকার ঠিক যেন ততটুকুই হয়েছে।
বছরে একদিন বাধ্যতামূলক ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান ও আহার-বিহারের মতো ভড়ং ধরে ঐতিহ্যের লালন বা পালন কোনোটাই তারা বোঝে না। উৎসবের অনুষঙ্গ হিসেবে আবিষ্কারও করে না ভিত্তিহীন কোনো বিষয়-আসয়, যা কিছুই করে তার সবটুকুই ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে ও তার প্রতি সম্মান রেখে। সবশেষে পরের বছর বিজু উৎসবে পুনরায় উপস্থিত হওয়ার কথা দেওয়ার পর বিদায় নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সতর্কতা
পাহাড়ের এ উৎসব একান্তই সে অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর। ফলে বৈসাবি উৎসব দেখতে গিয়ে সাংস্কৃতিকভাবে অসহনশীল হওয়া যাবে না। স্থানীয় সংস্কৃতি ও সমাজের প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখতে হবে। আগে থেকে হোটেল, মোটেল বা রিসোর্টে রুম বুকিং দিয়ে তারপর যাওয়া ভালো।
যাতায়াত ও থাকা
ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙামাটি যায় শ্যামলী, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ও সেন্টমার্টিন পরিবহনের এসি বাস। এছাড়া ডলফিন পরিবহন, এস আলম, সৌদিয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, ইউনিক সার্ভিসের নন-এসি বাসও রয়েছে। রাঙামাটি শহরে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ। ভাড়া এক হাজার টাকা থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত।

.jpg)