বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানের নাম বললে সর্বপ্রথম যে নামটি ভেসে ওঠে সেটা হচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক এই সমুদ্রসৈকত দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত থাকে সারা বছর। তবে আজ কক্সবাজার নিয়ে লিখব না। আমাদের দেশের মানুষের একটা স্বভাব হচ্ছে যদি কোনো জায়গা বিখ্যাত হয় তাহলে সেখানে সবাই একযোগে ভিড় করে, ফলে জায়গাটি তার স্বকীয়তা ও সৌন্দর্য হারায়। চট্টগ্রাম শহরে কক্সবাজার ছাড়াও আরও কয়েকটি সি বিচ রয়েছে।
তন্মধ্যে পতেঙ্গা, গুলিয়াখালী, নেভাল সি বিচ অন্যতম। তবে সম্প্রতি আরেকটি সি বিচ ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। সেই সি বিচের নাম পারকি সমুদ্রসৈকত। এটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারাসত ইউনিয়নে অবস্থিত। গুগল ম্যাপ আর অন্য কিছু সাইট ঘেঁটেঘুঁটে যাওয়ার রাস্তাটি একটু ঝালাই করে নিলাম। পারকি সাগর সৈকতে বঙ্গোপসাগরের ফেনিল ঢেউ আছড়ে পড়া দেখার পাশাপাশি বাড়তি দুটি ‘বোনাস’ হিসেবে দেখা যাবে- চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে খোলা সাগরের বুকে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ বহর; রাতে বিরাট জাহাজগুলোর আলো ঝলমলে খেলা; অপরূপ দৃশ্যপট।
বাংলাদেশের সবচেয়ে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যেখানে মিলেছে, সেই মোহনায়- বড়, মাঝারি, ছোট; দেশি-বিদেশি জাহাজ, নৌযান, সাম্পান ও ট্রলারের অবিরাম ছোটাছুটি চলে সারাক্ষণ, রাতে ওরা নীরব। মাঝি-মাল্লা ও জেলে ভাইদের ‘বদর, বদর হেঁইও’ দোয়া ও আহ্বানে মাছ শিকার, নৌযান চালানো গরিব এই লোকদের জন্য মনের গভীরে ক্ষত ও ভালোবাসা তৈরি করে। এই অসুখ ও সুখ কক্সবাজার, কুয়াকাটায় আছে। দেশের সম্পদ পারকি সাগর সৈকত- লম্বায় ১৩ কিলোমিটার হবে বা ৮.৭৭ মাইল চওড়া।
পারকি সৈকতের অনন্য প্রাকৃতিক সুবিধা হলো- এটি বালুকাবেলায় গড়া বা বালুর সৈকত। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। চট্টগ্রাম শহরের টাইগার পাস মোড়ে সহকর্মীরা আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার সব সময়ই একটু দেরি হয়। এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আগেই সহকর্মীরা গাড়ি রিজার্ভ করে রেখেছিল। চার চাকার গাড়িও উপস্থিত। সবাই গাড়িতে চেপে বসলাম। গাড়িতে ওঠার আগে এবং পরে সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমিও কয়েকটা সেলফি নিলাম।
এখন গন্তব্য একটাই, পারকির চর চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে পারকি সমুদ্রসৈকত। চট্টগ্রামের দক্ষিণে আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত পারকি। চট্টগ্রামের নেভাল একাডেমি কিংবা বিমানবন্দর এলাকা থেকে কর্ণফুলী নদী পেরোলেই পারকি চর। যেতে সময় লাগবে এক ঘণ্টা। নতুন গন্তব্যে যাচ্ছি তাই আনন্দের পরিমাণ ও বেশি। তবে রাস্তায় কিছুটা জ্যাম ছিল। তাই আমাদের বাড়তি কিছু সময় লেগেছিল। এটি মূলত কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। অর্থাৎ কর্ণফুলী নদীর মোহনার পশ্চিম তীরে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এবং পূর্ব-দক্ষিণ তীরে পারকি সমুদ্রসৈকত। চট্টগ্রাম সার কারখানা ও কাফকো যাওয়ার পথ ধরে এই সৈকতে যেতে হয়। চলতি পথে দেখা মিলল অন্য রকম এক দৃশ্যের।
আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছোট ছোট পাহাড়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিউএফল) এবং কাফকোর দৃশ্য মন জুড়িয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটায় তখন দিবা দ্বিতীয় প্রহর। সূর্যদেবের প্রখরতায় হাঁটা বেশ কষ্টসাধ্য মনে হচ্ছিল। কিন্তু নতুন গন্তব্য পথের আনন্দে সবকিছু ভুলে পদব্রজে এগিয়ে চলছি। সৈকতে ঢোকার পথে সরু রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ, সবুজ প্রান্তর আর মাছের ঘের এর দেখা পেলাম। পারকি বিচে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মতো অসংখ্য ঝাউগাছ আর ঝাউবনও রয়েছে, যা দেখে সত্যি মনে হচ্ছিল আমি কক্সবাজারেই আছি। মানুষের আধিক্য কম তাই প্রকৃতি যেন তার অপরূপ রূপের সুধা মেলে ধরেছে অজানা পথিকের জন্য। সুন্দর সারিবদ্ধ ঝাউ গাছ দিয়ে প্রায় পুরো এলাকাটি বেষ্টিত। তখন ভর দুপুর।
রাম রাবণের লড়াই চলছে। পেট পূজার জন্য ফিরে আসত হলো মূল বিচে। স্থানীয় হোটেলে খাবার ব্যবস্থা হলো। পরোটা, সবজি, ডিম ভাজা ... খাবার নয় সে তো অমৃত। এদিকে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরমও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাই এ সময় ঝাউ বনের শীতল হাওয়ায় চললাম বিশ্রাম নিতে, আড্ডা আর সমুদ্রের মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। সূর্যদেবের পাটে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছেন। আমরা হাঁটা শুরু করলাম বিচের উত্তর দিকে। এদিকেই বিচের মূল সৌন্দর্য। একেবারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর জনমানবহীন। এখানে লোকজন বলতে শুধু আমরা তিনজনই।
কদাচিৎ দুয়েকজনের দেখা মেলে। বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত আমরা হাঁটলাম। হাঁটতে হাঁটতে বিচের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গেলাম। যেখান থেকে দেখা মেলে বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মোহনা আর হাজারো পাখির ঝাঁক। পড়ন্ত বিকেলে আবার ফিরে এলাম মূল বিচে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে জন সমাগম, বেড়েছে কোলাহল। সেই সঙ্গে অশান্ত করে তুলেছে স্পিড-বোট আর সি-বাইকের যান্ত্রিক শব্দ। মাথার ওপর দিগন্তজোড়া নীল আকাশ, একপাশে সুন্দর সারিবদ্ধ ঝাউ গাছ অন্যপাশে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি, দূরে গভীর সমুদ্রে নোঙর করা ছোট-বড় জাহাজ, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য ও তাদের বিচিত্র জীবনযাপন এক কথায় অসাধারণ।
সতর্কতা
সমুদ্রস্নান করার জন্য জোয়ারভাটার সময়গুলো ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। সৈকতে পৌঁছানোর পর স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ খবর করে নেওয়া উচিত। পানিতে সাঁতারের সময় অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। সন্ধ্যার পরই সৈকতে একা না থাকায় ভালো।
কীভাবে যাবেন
চট্টগ্রাম শহরের যেকোনো স্থান থেকেই বাস অথবা টেম্পুতে করে চট্টগ্রাম শাহ আমানত সেতু বা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর কাছে যেতে পারেন। সেখানে গেলেই আপনি বটতলী মহসিন আউলিয়ার মাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন। পারকি বিচে যেতে হলে আপনাকে বটতলী মহসিন আউলিয়া মাজারগামী বাসে উঠতে হবে। বাসে উঠে কন্ডাক্টরকে বলতে হবে যেন আপনাকে ‘সেন্টার’ নামক স্থানে নামিয়ে দেয়। জায়গাটির প্রকৃত নাম মালখান বাজার, তবে এটি সেন্টার নামেই পরিচিত।
এতটুকু পর্যন্ত আসতে বাসে জনপ্রতি ২৫-৩০ টাকা করে নেবে। সেন্টারে নেমে বিচে যাবার জন্য সিএনজি পাবেন। রিজার্ভ করলে ১০০-১৫০ টাকাতেই পৌঁছে দেবে পারকি সমুদ্রসৈকতে। বিচে যাওয়ার আগে খাবার-দাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সেন্টার বাজার কিংবা কিছুটা দূরেই চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার হাউজিং কলোনি-সংলগ্ন বাজার থেকে নিয়ে নিতে পারেন। বিচেও কিছু দোকান-পাট রয়েছে, তবে তাতে সবকিছু নাও পেতে পারেন। আর যেকোনো সমস্যার জন্য সমুদ্রসৈকতের কাছেই রাঙ্গাদিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে যোগাযোগ করতে পারেন।
/রোদসী

.jpg)