১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক মাসের মধ্যে প্রগতিবাদী যুবকদের উদ্যোগে গঠিত হয় সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস। শুরুতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বাংলার ব্যবহার ওই সংগঠনে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছিল। ভাষার প্রশ্নে গণ-আজাদী লীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগের তুলনায় তমদ্দুন মজলিস অনেক বেশি সক্রিয় ছিল।
ভাষার দাবিকে আন্দোলনে রূপান্তর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক আবুল কাসেম। ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর আবুল কাসেম, আবু জাফর শামসুদ্দীনসহ প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরম খাঁর সঙ্গে ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন। সেই বছর ৬ ডিসেম্বর আবুল কাসেমের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সর্বপ্রথম সাধারণ ছাত্রসভার আয়োজন করা হয়।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে গঠিত হলো প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। পরিষদের আহ্বায়ক নিযুক্ত হন অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়া। সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সময় শামসুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত মুসলিম ছাত্রলীগের অল্প কয়েকজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। সংগ্রাম পরিষদের সদস্য অধ্যাপক আবুল কাসেম, মহম্মদ তোয়াহা, শামসুল আলম, নঈমুদ্দিন আহমদ, ফরিদ আহমদ, শওকত আলী, আবুল খায়েররা এ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সংগ্রাম পরিষদের কাজকর্ম প্রায় সব গোপনেই হতো প্রথম দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রশীদ বিল্ডিংয়ে তমদ্দুন মজলিসের অফিস ছিল ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্র।
‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ ছিল তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র; যার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর। ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি।
সংগ্রাম পরিষদ বহুদলীয় হওয়া সত্ত্বেও তমদ্দুন মজলিস রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন সংঘটনে সফল হয়নি।
ভাষা আন্দোলনের কর্মী প্রাবন্ধিক-গবেষক আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন’ বইটিতে বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্বে তমদ্দুন মজলিসের সক্রিয় ভূমিকা সত্ত্বেও মতাদর্শগত সংকীর্ণতার কারণে আন্দোলনের সম্মিলিত প্রয়াসের ক্ষেত্রে মজলিস পিছিয়ে পড়ে। বামপন্থিদের প্রতি অসহিষ্ণুতাও আরেকটি কারণ।’
ভাষাসংগ্রামীরা নানা সাক্ষাৎকারে সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন। তমদ্দুন মজলিস প্রসঙ্গে তারা বলেছেন, এই সংগঠনের নেতারা সমাজতন্ত্রীদের স্বার্থকে পোষণ করা বা সাহায্য করতে চাননি। তারা ইসলামের বিপ্লবী সম্ভাবনায় বিশ্বাস করতেন।
তারা বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রমাগত বৈষম্য ও নিপীড়নের মুখে ইসলামি আদর্শভিত্তিক সাম্যের সমাজ বা সমাজতন্ত্র ছিল অনেক দূরের চিন্তা। যে কারণেই ভাষা আন্দোলনের স্রোতধারা থেকে ছিটকে পড়ে তমদ্দুন মজলিস। এ কারণে ভাষা আন্দোলনের লাগাম চলে আসে বামপন্থিদের হাতে।